ধর্মান্ধতার রাজনীতি ও বর্তমান প্রেক্ষাপট

প্রকাশিত :১৯.১১.২০১৭, ১:২১ অপরাহ্ণ

মোহাম্মদ সেতাব উদ্দিন

ইতিহাস বলে Religion has brought out the best in mankind… and the worst. What has been called man’s inhumanity to Mans’ has threaded its way through the centuries. অর্থাৎ ‘ধর্ম মানুষের অশেষ কল্যাণ বয়ে এনেছে আবার ক্ষতিও সাধন করেছে যারপর নাই । মানুষের প্রতি মানুষের এই কথিত অমানবিক নিষ্ঠুরতা যুগ যুগ ধরে পথ বুনে চলেছে।’
প্রাথমিকভাবে মনে হতে পারে ধর্ম মানুষের ক্ষতি করেছে। কিন্তু ধর্ম নয় প্রকৃতপক্ষে ধর্মাশ্রয়ী ধূর্ত মানুষগুলো তাদের রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির জন্য সরল সহজ ধর্মপ্রাণ মানুষকে স্বর্গীয় সুখ (বেহেস্ত) লাভের প্রলোভন দেখিয়ে, লোভের বশবর্তী করে বিপদ্গ্রস্ত করেছে। এদের সহায়তায় বিরোধী মতের বিজ্ঞানমনস্ক শিক্ষিত, সচেতন, সৃজনশীল সৎ মানুষকে সমাজ থেকে নির্মূল করতে ছুরি-চাকু, চাপাতি দিয়ে পেছন থেকে অতর্কিতে আক্রমণ করে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করছে। বিরোধী মতকে নিশ্চিহৃ করতে গুলি, গোপন হত্যা, খুন, রাহাজানি, বোমাবাজি, অগ্নিসংযোগের মত নিষ্ঠুর থেকে নিষ্ঠুরতম পথ বেছে নিচ্ছে। বিশ্বব্যপী ইসলামের নামে মসজিদে মসজিদে আত্মঘাতী বোমা মেরে নামাজরত অবস্থায় মুসলমান মুসলমানকে হত্যা করছে।

এতদিন পাকিস্তানে, ইরাকে মসজিদে বোমাবাজি হচ্ছিল এখন আবার সৌদি আরবে শুরু হয়েছে। সুন্নি মুসলমান হত্যা করছে শিয়া মুসলমানদের আর শিয়া মুসলমান মারছে সুন্নি মুসলমানদের। অবাক ব্যাপার। এরা সবাই দাবি করে নিজেরা নবীজি (স.) এর উম্মত। এবং সবাই আরও দাবি করে যে, ওরা কোরআন-হাদিস নির্দেশিত পথেই সঠিকভাবে ইসলাম পালন করে থাকে।

মুক্তিযুদ্ধকালীন আমাদের দেশের সকল হত্যাকাণ্ড সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক হলেও, দেশের ধর্মাশ্রয়ী রাজনৈতিক দল এবং ধর্মান্ধ মুসলমান ইসলামের নামে এদেশের প্রগতিশীল এবং মানবিক কবি, সাহিত্যিক, লেখক, সাংবাদিক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, অধ্যাপক, বুদ্ধিজীবীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করেছে। প্রচার করেছে, এরা ইসলামবিরোধী, তাই এদের হত্যা করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে এইসব মানুষ ধর্মবিরোধী ছিলেন না। এরা ছিলেন প্রকৃতই দেশ প্রেমিক এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি।
স্বাধীন সার্বভৌম দেশে আজও এরা অব্যাহতভাবে নির্মম হত্যাকাণ্ড করে চলেছে। ধর্মান্ধ জঙ্গিদের চাপাতির কোপে আহত এবং পরে মৃত্যু মুখে পতিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হুমায়ন আজাদ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নিহত অধ্যাপক ইউনুস, অধ্যাপক তাহের এবং অতি সম্প্রতিকালে নিহত অধ্যাপক সফিউল ইসলাম ঘোর জামায়াত-শিবিরবিরোধী ছিলেন। এরা ইসলামবিরোধী বা কোন ধর্মবিরোধী নয়। এরা সকলেই দেশপ্রেমিক প্রগতিশীল ব্যক্তিত্ব ছিলেন। জানা যায়, জামায়াত-শিবিরের ক্যাডাররাই এদের হত্যা করেছে। মানবতাবিরোধী এবং স্বাধীনতাবিরোধী অপরাধের জন্য স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়। কিন্তু পাকিস্তানের চররা ৭৫-এর ১৫ই আগস্ট জাতির পিতাকে স্বপরিবারে হত্যা করে সামরিক শাসন জারি করে এই খুনি জামায়াতকে রাজনীতিতে পুনর্বাসিত করেছিল। এই সুযোগে পবিত্র ইসলাম ধর্মের নামে খুনিরা পুনরায় রাজনৈতিক বিরুদ্ধবাদীদের নির্মূল করতে হত্যাকাণ্ড শুরু করে। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময় এই বকধার্মিকরা ভিন্ন ভিন্ন নামে নিজেদের পরিচয় জাহির করে। কিন্তু খোঁজখবর নিয়ে জানা যায়, নাম যাই হোক ওদের গোড়া জামায়াত। পরে অবশ্য গণতন্ত্র হত্যাকারী, সামরিক শাসকদের গর্ভে জন্ম নেয়া রাজনৈতিক দলগুলো ধর্মীয় উগ্রবাদীদের সঙ্গে মিলে মুক্তিযুদ্ধের অর্জন, প্রগতিশীল রাজনীতিকে নির্বাসনে পাঠাতে সচেষ্ট হয়। একজন সামরিক শাসক মসনদে বসেই ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম বলে- ১. বাঙালি জাতীয়তাবাদ এবং ২. অসাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে নির্বাসনে পাঠায়। আর একজন সুযোগ বুঝে ধর্মান্ধদের সহায়তায় ইসলামকে রাষ্ট্র ধর্ম ঘোষণা করে।

আজ দেশের বহুধাবিভক্ত, শক্তিহীন, জনবিচ্ছিন্ন, দুর্বল বাম দলগুলো বিভিন্ন সভা-সমাবেশে কিংবা টিভি টকশোতে বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারকে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত করার জন্য। ইংল্যান্ডের মত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য আবদার করে। কিন্তু একবারও গণতন্ত্র হত্যাকারীদের কঠোর ভাষায় তো দূরে থাক সাধারণভাবেও বলে না গণতন্ত্রের এই দুর্দশার জন্য দায়ী কারা। বরং টেনে আনে বঙ্গবন্ধুর বাকশাল প্রতিষ্ঠার কথা। এই সব অন্ধ এবং খোঁড়া যুক্তিই যে বাম দলগুলোর অস্তিত্বের সঙ্কট তৈরি করেছে তা তাদের বোধগম্য নয়। শেখ হাসিনার ভাল কাজ এদের চোখে পড়ে না। এরা কখনও বলে না শেখ হাসিনা গণতন্ত্র রক্ষার জন্য ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত প্রথমবারের মত সফল রাষ্ট্র পরিচালনার পর শান্তিপূর্র ক্ষমতা হস্তান্তরের কথা। এরা একবারও উচ্চারণ করে না, বিএনপি ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত দেশব্যাপী যে হত্যাকাণ্ড চালিয়েছিল সে কথা। বলে না, বিএনপি’র খুন-খারাবি, লুঠপাট এবং রাহাজানির কথা। শুধু রাজনৈতিক নেতাকর্মী হত্যা নয়, সাধারণ মানুষের বাড়ি ঘরে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেবার কথা এই বাম নেতাকর্মীরা কখনই উচ্চারণ করে না। এরা বলে না, বিএনপি তাদের রাষ্ট্রপতিকে প্রধান উপদেষ্টা করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে নষ্ট করেছে, সে কথা। এই বাম দলগুলো আমাদের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হবার আগ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর বিরোধিতা করেছিল। নিরুপায় হয়ে মুক্তি যুদ্ধে গিয়েছিল কিন্তু আমরা এদের একটি অংশের উগ্রমুর্তি দেখেছি স্বাধীনতার পর সিরাজ শিকদারের রাষ্ট্রবিরোধী অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে।

এবার রোহিঙ্গা প্রসঙ্গে দুচারটি কথা বলা প্রয়োজন। কিছুদিন যাবত সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় বার্মার উগ্র ধর্মীয় জনগোষ্ঠী এবং নেতাদের দ্বারা আরাকান রাজ্যের রোহিঙ্গারা হত্যা, খুন, ধর্ষণ এবং অগ্নিসংযোগের মুখে অত্যাচারিত হয়ে, নির্যাতিত হয়ে, জীবন বাঁচাতে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। আগস্ট ২০১৭ মাঝামাঝি থেকে অক্টোবর ২০১৭ পর্যন্ত প্রায় সাত লক্ষ (৭০০০০০) রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে। এই বিপুল জনগোষ্ঠী আমাদের পরিবেশ এবং অর্থনীতিতে ইতিমধ্যেই বিরূপ প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। পাহাড় কেটে, গাছপালা ধ্বংস করে স্থানীয় নাগরিকদের বিপুল আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন করেছে। এই ক্ষতি স্থানীয় জনগণের পক্ষে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে কি?
ভুলে গেলে চলবে না আমাদের দেশের ধর্মান্ধরা একই কায়দায় পাকিস্তানী দখলদার বাহিনীর সহযোগিতায় এদেশের ভিন্ন মত এবং ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের হত্যা, খুন, অগ্নিসংযোগ করে দেশ ত্যাগে বাধ্য করেছে। স্বাধীনতার ৪৫ বছরেও এই উগ্র ধর্মব্যবসায়ীদের তাণ্ডব থামেনি। সেদিনও এরা রংপুরের গঙ্গাচরায় হিন্দু জনগোষ্ঠীর বাড়িতে আগুন দিয়েছে।

এদিকে বার্মার সেনাবাহিনী প্রধান এবং ধর্মীয় নেতারা নাকি বলছে এরা বাঙালি। হতে পারে এদের ভাষা আমাদের কক্সবাজার টেকনাফ এবং উখিয়ার ভাষার সাথে কিছু মিল আছে, তাই বলে এরা বাঙালি বা বাংলাদেশি কোনভাবেই হতে পারে না। যদি তাই হয় তাহলে চীন সীমান্তের কাছাকাছি বার্মার অধিকাংশ মানুষ চীনের স্থানীয় ভাষায় কথা বলে, তাহলে ওরা কি চায়নীজ? ভারতের একটি প্রদেশের ৯০% ভাগ মানুষ ধর্ম নির্বিশেষে বাংলায় কথা বলে, ওরা বাংলাদেশি? ওরা ভারতীয়।
শেখ হাসিনার শান্তিপূর্ণ অবস্থান এবং সফল নেতৃত্বের কারণেই ইতিমধ্যেই বার্মিজ মগ সেনাবাহিনীর গণহত্যা, অগ্নিসংযোগ এবং নৃশংস নারী নির্যাতনের বিষয়গুলো আন্তর্জাতিক মহলে আলোড়নের সৃষ্টি করেছে। নিরাপত্তা পরিষদে বিষয়টি নিয়ে বার বার প্রশ্ন তোলা হয়েছে। রাশিয়া এবং চীনের আপত্তির কারণে এই মুহুর্তে হয়ত বার্মার বিরুদ্ধে অবরোধ বা নিষেধাজ্ঞা আরোপ সম্ভব হয়নি, তাই বলে এই আপত্তি অনন্তকাল ধরে চলবে এটা ভাবা ঠিক হবে না। কারণ চীনও আমাদের প্রতিবেশী বন্ধু রাষ্ট্র। রাশিয়াও বন্ধু রাষ্ট্র । কাজেই সেদিন বেশী দূরে নয়, যেদিন বার্মার উপরে এমন আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি হবে, যা উপেক্ষা করা তাদের পক্ষে কোনক্রমেই সম্ভব হবে না। সমস্যা বার্মা সৃষ্টি করেছে বার্মাকেই সমাধান করতে হবে।

 

লেখক: মুক্তিযোদ্ধা এবং অবসরপ্রাপ্ত পরিচালক, বাংলাদেশ বেতার।