হংকংয়ে তিন হাউ উৎসব

প্রকাশিত :২১.১১.২০১৭, ৩:০২ অপরাহ্ণ

ডেস্ক রিপোর্ট : হংকং বলতে সমুদ্রের জলের প্রান্ত ঘেঁষে আলোকোজ্জ্বল আকাশছোঁয়া ভবনমালার যে অতিপরিচিত দৃশ্য আমাদের চোখে ভেসে ওঠে, তার ভেতর গ্রাম বললে যেন মনে হয় সোনার পাথর বাটি। কাত হিং ওয়াইয়ের (ওয়াই অর্থ দেয়ালঘেরা গ্রাম) উদ্দেশে কাম শেং রোড স্টেশন থেকে বেরিয়ে পেছনের চাতাল পেরোতেই আমাদের দেশের শান্ত তস্য মফস্বল শহরের মতো সরু পায়ে চলা পথ ধরে কালভার্টের ওপারে গাড়ির অপ্রশস্ত রাস্তা। সেই রাস্তা ধরে এগিয়ে যাচ্ছিল দুই সারি মানুষের একটা উৎসবমুখর মিছিল। তিন হাউ উৎসবের কথা হংকং আসার আগে জেনেছিলাম, কিন্তু সেটির সাক্ষাৎ পাওয়া যাবে আশা করিনি। মিছিলটি পার হয়ে গেলে আমি ওদের পিছু নিই।

কাম তিন রোড থেকে হাতের ডানে মাথার ওপর ঝোলানো সারি সারি চীনা লণ্ঠন আর দুপাশের খুঁটিগুলোতে লাল ফুলের ঝালর পেরিয়ে গেলে কাত হিং ওয়াইয়ের সামনের চত্বরের দৃশ্য ভাঙা মেলার মতো দোমড়ানো মনে হয়। গ্রামটিকে ঘিরে রাখা প্রায় বিশ ফুট উঁচু দেয়ালের গায়ে একমাত্র সদর দরজার সামনে উৎসবের পোশাকে নারী-পুরুষ-শিশুরা ঘুরে বেড়াচ্ছে, সামনের সিমেন্টের বেঞ্চিতে বসে খোশগল্পে মশগুল কেউ কেউ। মিকি মাউসের মতো সিংহ আর রঙিন ড্রাগনের বিশালাকার কয়েকটা ঝোলানো মাথা হালকা বাতাসে এদিক-সেদিক দোল খায়। ফটকের দুধারে এবং চাঁদওয়ারিতে উচ্চকিত উজ্জ্বল রঙের ব্যানার আর কাঁচা হাতে আঁকা চীনা ট্র্যাডিশনাল আর্টের সজ্জা। আমি এসবের ভেতর দিয়ে সিংহ দরজাটি দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ি। বাইরে মচ্ছবের আমেজ ভেতরে একেবারেই অনুপস্থিত। অপরিসর গলিগুলো সুনসান। মূল ফটক থেকে সোজা চলে যাওয়া একটা গলি থেকে ডানে-বাঁয়ে একজন মানুষের চলার মতো সরু গলির দুপাশে গায়ে গা লাগানো কয়েক তলা ঘরের পর ঘর। কোনোটির ঝুলবারান্দা থেকে উঁকি দেয় টবের সবুজ গুল্ম, মাথা ঝুঁকিয়ে নিচে তাকানো মানিপ্ল্যান্টের লতা, কোনোটি থেকে বেরিয়ে আছে উইন্ডো টাইপ এয়ারকুলারের খাঁচা। কোথাও বারান্দা থেকে ঝুলছে ধোয়া কাপড়-চোপড়। কোথাও ঝোলানো লাল রঙের চীনা লণ্ঠন বর্ণহীন আবহে জেল্লা ছড়ায়। নতুন করে তৈরি করা বাড়িগুলোর কলি ফেরানো, তাই শতবর্ষী বাড়ি হলেও বোঝার উপায় নেই।

মূল ফটক থেকে গলিটি গিয়ে মিশেছে ছোট এক প্রার্থনাগৃহে। বুকসমান উঁচু বেদির গায়ে ড্রাগনের ছবি আঁকা টকটকে লাল সিল্কের ঢাকনা দেওয়া। বেদির ওপর পিতলের ঘটসহ নানান উপাচার, দরজার একপাশে ছোট নিচু টেবিলের ওপর একটা লাল রঙের হারিকেন, তার পাশে পিতলের বাটির মধ্যে গোঁজা ধূপকাঠি থেকে ঝরে পড়া ধূসর ছাইয়ের স্তূপ।

একাদশ শতাব্দীতে চীন থেকে প্রথম অভিবাসী হয়ে আসা তাং গোত্রের মানুষেরা হংকংয়ের কাম তিন এলাকায় বন্য প্রাণী, প্রতিদ্বন্দ্বী গোত্রের ঠ্যাঙাড়ে বাহিনী, চোর আর জলদস্যুদের হাত থেকে বাঁচার জন্য কয়েকটা ‘ওয়াই’ পত্তন করেছিল। সীমানার চার কোনায় পাহারা দেওয়ার জন্য তোলা হয়েছিল দেয়ালের ওপর চারটা চৌকি ছাউনি। দেয়ালের বাইরে চারপাশ ঘিরে একসময় নাকি গভীর পরিখা ছিল, এখন অবশ্য তার কোনো চিহ্ন নেই। এ রকম পাঁচটা দেয়ালঘেরা গ্রাম তৈরি হলেও ১৪৬৫ থেকে ১৪৮৭ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে তৈরি কাত হিং ওয়াই-ই সবচেয়ে পুরোনো। ব্রিটিশ রাজশক্তির কাছে পরাভূত গ্রামগুলোর মধ্যে এটির পতন হয়েছিল সবার শেষে। প্রায় তিন বছর ধরে চলা প্রথম আফিম যুদ্ধ শেষ হয় ১৮৪২ সালে। তার আগের বছর ইংরেজরা হংকং দ্বীপ দখল করে নেয়। চীনের পরাজয়ের পর নানকিং চুক্তির মাধ্যমে ব্রিটেন হংকংয়ের ওপর বৈধ ঔপনিবেশিক কর্তৃত্ব লাভ করে।

honkong

মাও সে-তুংয়ের নেতৃত্বে চীনে কমিউনিস্ট বিপ্লবের পর কুওমিনটাং নেতাদের পালিয়ে যেতে হয় তাইওয়ান, অন্যদিকে পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত হাজার হাজার ধনাঢ্য ও ভূস্বামী ‘বুর্জোয়া’ শরণার্থী আশ্রয় নেয় হংকংয়ে। ১৯৪৫ সালে হংকংয়ের জনসংখ্যা ছিল ৬ লাখ, দশ বছরের মাথায় এই সংখ্যা ২৫ লাখে পৌঁছে। এই দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়া জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ আসে ১৯৪৯ সালের বিপ্লবের পর। কমিউনিস্ট শাসনের বিপরীতে হংকং পরিণত হয় মুক্তবাজারের অভয়ারণ্যে। বিপ্লব সংঘটিত হওয়ার বছরখানেকের মধ্যে চীনা কমিউনিস্ট সরকার ভিনদেশি নাগরিকদের চীন ভ্রমণ এবং চীনাদের বিদেশযাত্রার ওপর কড়াকড়ি আরোপ করে। ফলে হংকংয়ে বহু অভিবাসী চীনা নাগরিক দেশে ফেলে আসা তাদের পরিজনের সঙ্গে ইহজনমে আর মিলিত হতে পারেনি।

যে সদর দরজা দিয়ে ওয়াইটিতে ঢুকি, সেই ফটকটার একটা ইতিহাস আছে। হংকং করায়ত্ত হওয়ার পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় পর ব্রিটিশ বাহিনী মূল দ্বীপে তাদের অবস্থান পাকাপোক্ত করে অন্যান্য দ্বীপে দখলদারি বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়, তখন এই কাত হিং ওয়াইয়ের অধিবাসীরা প্রতিরোধ গড়ে তোলে। কয়েক দফা সংঘর্ষের পর গ্রামবাসী ফটকের পেছনে অবস্থান নিয়ে ব্রিটিশ সেনাদের ভেতরে ঢোকা ঠেকিয়ে রাখে। কিন্তু সশস্ত্র বাহিনীর সামনে নিরস্ত্রের এই প্রতিরোধ দীর্ঘদিন টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয় না। ব্রিটিশ সেনাবাহিনী গেট ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়ে। বিজয়ের চিহ্ন হিসেবে লোহার দরজাটা লুটের মাল হিসেবে আয়ারল্যান্ড পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এই ঘটনার ২৫ বছর পর তাং গোত্রের এক মুরব্বি হংকংয়ের ব্রিটিশ শাসকদের কাছে আবেদন করেন যাতে তাঁদের ঐতিহাসিক ফটকটি ফিরিয়ে দেওয়া হয়। পরের বছর ব্রিটিশ সরকারের অনুমোদন পেয়ে হংকংয়ের গভর্নরের উপস্থিতিতে এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে লোহার গেটটি গ্রামবাসীদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

গ্রাম নামের ছোট মহল্লাটি ঘুরে আবার বাইরে এসে ঘুরে দাঁড়ালে চোখে পড়ে দেয়ালের ভেতরের বাড়িগুলোর ছাদের ওপর টেলিভিশন অ্যানটেনা লাগানো, হংকংয়ের কেন্দ্র থেকে খুব দূরে নয়, অথচ কেব্‌ল টিভি এখনো আসেনি এই গ্রামে, তাজ্জব বটে! গেটের বাইরের পরিবেশ ততক্ষণে আরও এলিয়ে পড়েছে। কিছুক্ষণ আগে এখানে যে ব্যস্ততা ছিল তা পুরোপুরি থিতিয়ে পড়া। চত্বরের এক পাশে টেবিলের ওপর কলার স্তূপ দেখে গিয়েছিলাম, সেই স্তূপ ছোট হয়ে এসেছে। সেখানে গলায় ব্যাজ ঝোলানো নারী-পুরুষের মধ্যে ক্লান্ত হাঁপ ছাড়া ভাব। টেবিলের কিছুটা পেছনে হিন্দি ছবির ভিলেনের মতো দেখতে কালো পোশাকে মুণ্ডিত মস্তকের একজন বেশ আয়েশ করে সিগারেট ধরায়, তার গলায়ও ঝুলছে ব্যাজ, স্বেচ্ছাসেবকদের নেতাগোছের কেউ হবে। লোকটির কোমরে লুঙ্গির মতো জড়ানো কালো বস্ত্রখণ্ড, সাদা গেঞ্জির ওপর চড়ানো কালো জ্যাকেটের সবগুলো বোতাম খোলা, পায়ে বুটজুতো, চোখে চশমা। লোকটির নাম ওয়াং, জ্যাকসন ওয়াং। পরিচয়পর্বের পর ওয়াং আজকের জুলুস বিষয়ে জানায়, প্রত্যেক বছরের তৃতীয় চাঁদ মাসের ২৩ তারিখে তিন হাউ উৎসব উদ্‌যাপন করার জন্য সবগুলো ওয়াইর লোকজন মিলে জুলুস বের করে। ওয়াং বলে, তিন হাউ হচ্ছেন আমাদের সমুদ্র দেবী। তাঁর জন্মতিথিতে এখানকার মানুষের নিরাপদ জীবন, ভালো আবহাওয়া আর মাছের ভরা মৌসুমের জন্য মানুষ তিন হাউ দেবীর কাছে প্রার্থনা করে।

এমন একটা মিছিলের লেজের দিকটা ছাড়া পুরো অংশ দেখতে পাইনি বলে আমি আফসোস করে বলি, সামনের মাথার দিকে নিশ্চয়ই অনেক কালারফুল ছিল? ওয়াং বলে, আরে কী কাণ্ড! মিছিলটা অনেক রাস্তা ঘুরে যেখানে পৌঁছাবে, এখান থেকে শর্টকাট মেরে চলে গেলে ওদের আগেই ওখানে পৌঁছে যেতে পারবেন। তারপর ভালোভাবে শর্টকাট রাস্তাটা বাতলে দিয়ে বলে, ওখানে গেলে দেখতে পাবেন, বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাঁশের তৈরি কাঠামো। সেই কাঠামোর ওপর প্যান্ডেল টানিয়ে চলছে গ্র্যান্ড গালা প্রোগ্রাম, চায়নিজ অপেরা।

তারপর পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া এক তরুণীকে ডাক দেয় ওয়াং। মেয়েটির পরনে ফেডেড জিনস, গোলাপি শার্ট, বুকের বিভাজিকার কাছে লকেটের মতো ঝোলানো সানগ্লাস। আমার দিকে তাকিয়ে ওয়াং বলে, আমাদের স্বেচ্ছাসেবক ইউকি। ও ওখানেই যাচ্ছিল, আপনি ওর সঙ্গে চলে যান। মেয়েটি আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে ‘হাই’ বলার পর ওয়াংকে ধন্যবাদ জানানোর ভদ্রতা না করেই হঠাৎ পাওয়া গাইডের সঙ্গে রওনা হই।

কাম তিন রোডের চলন্ত গাড়ি থেকে গা বাঁচিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ইউকি বলে, শুনলাম আপনি ভ্রমণলেখক। কোন দেশ আপনার সবচেয়ে ভালো লেগেছে? ওর শরীর থেকে পারফিউমের ঘ্রাণ মেশা হালকা ঘামের গন্ধ উপেক্ষা করে বলি, নির্দিষ্ট করে বলা মুশকিল, একেকটা দেশ একেক কারণে ভালো লাগে। ধরুন, চীন এক কারণে ভালো লাগলে আফ্রিকার কোনো দেশ কিংবা ইতালি অন্য কারণে ভালো লাগে। তারপর একটু তোষামোদ করার জন্য ওর ইংরেজিটা বেশ ভালো বললে সে জানায়, হংকং না হয়ে চীনে থাকলে ওর অবস্থাও সে রকম হতো। আমার ইংরেজি যেমনই হোক বাপদাদাদের মুখে শুনেছি, ব্রিটিশরা নিজেদের উচ্চবর্ণ কুলীন মনে করত, আর আমরা ছিলাম তাদের চোখে অন্ত্যজ, তাই এখানকার ভূমিপুত্রদের সঙ্গে ব্রিটিশদের বিরাট বৈষম্য ছিল। চীনাদের তারা বলত ‘নোংরা চায়নিজ’।

তারপর আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করে, আমাদের স্টার ফেরি দেখেছেন? সে সময় ফেরির সামনে ছিল রিকশা স্ট্যান্ড। গরিব মিনারা রিকশা চালাত। ফেরি থেকে নামলে দেখা যেত ভিক্ষুকের ঝাঁক। হংকংয়ের তরক্কীর সঙ্গে সঙ্গে বিদায় হয়েছে তারা। এখানকার ঝুপড়িগুলোতে ছিল হাজার হাজার গরিব মানুষ। কুড়িয়ে আনা কাঠ দিয়ে ঘর বানিয়ে থাকত তারা। কোনো কারণে একবার আগুন লাগলে আর রক্ষা ছিল না। এ রকম একটা মারাত্মক অগ্নিকাণ্ডের পর সরকার স্বল্প খরচের কিছু দালান তৈরি করে দেয়। উঁচু এসব দালানে লিফট থাকার কোনো প্রশ্নই ওঠে না, প্রত্যেক তলায় কয়েকটা পরিবারের জন্য একটা মাত্রœ স্নানঘর নিয়ে এক কামরার ফ্ল্যাটে থাকত একটা গোটা পরিবার। জায়গার অভাবে কোনো বাড়ির ছাদে বসত স্কুল।

ইউকির কথার মাঝখানে এক জায়গায় থেমে পড়তে হয়। রংচটা পলেস্তারা খসা একটা বাড়ির পেছনে বড়সড় মানকচুর ঝোপ দেখে আমার মুখে কথা সরে না। অবিকল আমাদের দেশের গ্রামদেশের কোনো বাড়ির পাকা পায়খানার পেছনের দৃশ্যের মতো। আমাকে ঝপাঝপ ছবি তুলতে দেখে ইউকি বলে, আদি হংকং এ রকমই ছিল, এখনো বদলায়নি এই অঞ্চল। আমাদের প্রাচ্যের দেশগুলো আসলে এ রকমই তো ছিল। ব্রিটিশরা আসার পর বহু কিছু বদলে গিয়েছে। আর হংকং হচ্ছে পুঁজিবাদী অর্থনীতির শোকেস। কমিউনিজমের বিপরীতে ক্যাপিটালিজম কত দ্রুত উন্নতি করতে পারে, সেটা দেখাতে গিয়ে নিজস্ব বহু কিছু হারাতে হয়েছে আমাদের।

আমরা যখন একটা পাড় বাঁধানো খালের ওপরের কালভার্টের মাঝামাঝি পৌঁছি, তখন দূর থেকে শোনা যায় ঢাকের শব্দ। জিরিয়ে নেওয়ার জন্য কালভার্টের রেলিংয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়াই আমরা, জোর কদমে হেঁটে আসার কারণে ইউকির অনুচ্চ বুকের মৃদু ওঠানামার সঙ্গে ঢাকের তাল মেলে না। ওর সরে যাওয়া শার্টের কাঁধের পাশ থেকে উঁকি দেয় উপবীতের মতো সাদা স্ট্র্যাপ, সারা দিনের ঘোরাঘুরির কারণেই বোধকরি কিছুটা ময়লাটে। যাত্রী উজিয়ে নিতে আসা মানুষেরা প্ল্যাটফর্ম থেকে মাথা বাড়িয়ে যে রকম বহু দূরে ট্রেনের ইঞ্জিনের মাথা দেখতে পায়, কালভার্টের ওপর থেকে খালের পাড় ধরে আসা মিছিলটার মাথা সে রকম আবছাভাবে দেখা গেলে আমরা একটা খোলা মাঠ কোনাকুনি পেরিয়ে বিশাল উঁচু প্যান্ডেলটার দিকে এগিয়ে যাই। এক প্রস্থ হাত মিলিয়ে বিদায় নেয় ইউকি।

সার্কাসের তাঁবুর চেয়ে কয়েক গুণ বড় প্যান্ডেলটার বিশালত্বের ভেতর ঢুকে পড়ি। আর্ট ফটোগ্রাফির ফ্রেমের মতো হাজারখানেক ফাঁকা চেয়ারের ওপর অগুনতি বাঁশের জ্যামিতিক কাঠামোর পিরামিডের ভেতর হালকা অন্ধকার জমাট বেঁধে আছে।

প্যান্ডেল থেকে বের হয়ে সামনে এগিয়ে গেলে মিছিলের মাথাটা চোখে পড়ে। ঢাক, করতাল আর কয়েক সাইজের ঘণ্টা নিয়ে প্রথমে আসে বাদকদল, তারপর তাজিয়ার মতো বয়ে আনা টকটকে লাল নকশাদার রেশমি কাপড়ে ঢাকা বেদির ওপর তিন হাউ দেবীর মূর্তি, তাদের পেছনে আসে সমাবর্তনের পোশাকের মতো লাল গাউন আর টুপি পরা সারিবদ্ধ গম্ভীর যাজকের দল। পেছনের দলের গাউন কালো, সামনের জনের হাতে গায়েহলুদের তত্ত্বের মতো রঙিন ঝালর দেওয়া রেকাব, বাকিদের হাতে জ্বলন্ত ধূপবাতিসহ ধূপদানি, এঁদের মুখের গাম্ভীর্য আরেক পরত গাঢ়। এবার আসে প্ল্যাকার্ডবাহীর দল, তাদের পেছনে টকটকে লাল পোশাকের ড্রাগনবাহী মানুষের মিছিলটি দীর্ঘতম। সবশেষে হলুদ পোশাকে বিশাল ত্রিকোণ ধ্বজাবাহীদের মিছিল। সবার পেছনে বলে এই দলটি কিছুটা অবিন্যস্ত, গা ছাড়াভাবে হেঁটে যায়, চেহারায় অগ্রবর্তীদের মতো ভাবগাম্ভীর্য নেই।

মিছিলটি প্যান্ডেলের দিকে চলে গেলে আমি গোধূলির ম্লান আলোয় ফেরার পথে হাঁটতে হাঁটতে ভাবি, প্রাচ্য তো এ রকমই, পশ্চিমের উপনিবেশ হওয়ার পর আমাদের অনেক কিছু ছাড়তে হয়েছে, কিন্তু ছাড়া যায়নি অনেক জিনিস।

সূত্র: প্রথম আলো
আজসারাবেলা/মুয়াজ/শিল্প-সাহিত্য