দিল্লির মতো ঢাকার বাতাসও দূষিত

প্রকাশিত :২৩.১১.২০১৭, ৪:৫৭ অপরাহ্ণ

ডেস্ক রিপোর্ট : ঢাকার বাতাসের প্রতিদিনকার চিত্র পাওয়া যায় পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে। সরকারের এই সংস্থা রাজধানীর তিনটি স্থানে বায়ুদূষণ পরিমাপের যন্ত্র বসিয়েছে। সেখান থেকে পাওয়া উপাত্তে দেখা যাচ্ছে, গতকাল বুধবার ঢাকার বায়ুমানের সূচক ছিল ২৬৯। পরিবেশ অধিদপ্তরের মান অনুযায়ী, এটি এখন লাল ক্যাটাগরির। অর্থাৎ স্বাস্থ্যের জন্য তা ‘মারাত্মক ক্ষতিকর’।

বায়ুতে ক্ষুদ্র বস্তুকণা ও চার ধরনের গ্যাসীয় পদার্থ পরিমাপ করে এ সূচক তৈরি করা হয়।

গতকাল বিশ্বের অন্যতম দুই দূষিত শহর ভারতের দিল্লি ও চীনের বেইজিং শহরের বায়ুমান সূচক ছিল যথাক্রমে ২২৮ ও ৩০। এই দুটি শহরের বায়ুমানের এ সূচক পাওয়া গেছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ওয়েবসাইট থেকে। সারা বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসগুলোয় রাখা যন্ত্রে এ বায়ুমান প্রতিদিন মাপা হয়। তবে ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসে রাখা যন্ত্রে গতকাল বায়ুমান দেখানো হয়েছে ১৯৭। সেখানেও তা লাল ক্যাটাগরির।

চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির বায়ুদূষণ নিয়ে তোলপাড় হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানমাত্রার চেয়ে ওই শহরের বায়ুতে দূষিত পদার্থের পরিমাণ ৩০ গুণ বেড়ে যায়। ভারতের মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন শহরটির বায়ুদূষণের কারণে লাল সতর্কবার্তা জারি করে। শহরের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়।

পরিবেশ অধিদপ্তরের পর্যবেক্ষণ বলছে, ঢাকার বাতাসে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর বস্তুকণা, ক্ষুদ্র বস্তুকণা ও ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বস্তুকণা দিন দিন বাড়ছে। বিশেষ করে, নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত শহরের বাতাসে ক্ষতিকর ওই তিন উপাদানের পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে তিন থেকে চার গুণ বেশি থাকে।

পরিবেশ আইন অনুযায়ী, রাজধানীর বাতাসে ক্ষুদ্র বস্তুকণা বা ‘পিএম ২.৫’-এর মানমাত্রা হচ্ছে প্রতি কিউবিক মিটারে ১৫ মাইক্রোগ্রাম। এ ছাড়া ‘পিএম ১০’ বা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বস্তুকণার মানমাত্রা ৫০ মাইক্রোগ্রাম। ২০১৫ সালে পিএম ২.৫-এর সারা বছরের গড় ছিল ৮১ মাইক্রোগ্রাম ও ২০১৬ সালে ৭৬ মাইক্রোগ্রাম। পিএম ১০-এর গড় পাওয়া গেছে ২০১৫ সালে ১৪৮ মাইক্রোগ্রাম ও ২০১৬ সালে আরও বেড়ে হয়েছে ১৫৮ মাইক্রোগ্রাম।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব হেলথ সায়েন্সের পেশা ও পরিবেশ স্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান মাহমুদ হোসেন ফারুরি বলেন, রাজধানীর চারপাশের ইটভাটা, নির্মাণকাজ থেকে আসা ধুলা এবং পরিবহন থেকে বের হওয়া ধোঁয়া মিলে বাতাসের মধ্যে একধরনের দূষিত মিশ্রণ তৈরি করে, যা নিশ্বাসের সঙ্গে মানুষের শরীরে গিয়ে মারাত্মক সব রোগবালাই তৈরি করছে। নিশ্বাসজনিত সমস্যা, হৃদ্‌রোগ ও নানা ধরনের স্নায়বিক রোগ তৈরি করছে, যা একটি কম বুদ্ধিসম্পন্ন, রোগাক্রান্ত ও দুর্বল নতুন প্রজন্ম তৈরি করছে। এভাবে চলতে থাকলে এই শহরে সুস্থ মানুষ পাওয়া কঠিন হয়ে যাবে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা হেলথ ইফেক্টস ইনস্টিটিউট এবং ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিকস অ্যান্ড ইভালুয়েশনের ‘বৈশ্বিক বায়ু পরিস্থিতি-২০১৭’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বায়ুদূষণের কারণে বাংলাদেশে বছরে ১ লাখ ২২ হাজার ৪০০ মানুষের মৃত্যু হচ্ছে বলে বলা হয়েছে। আর বায়ুদূষণের কারণে শিশুমৃত্যুর হারের দিক থেকে পাকিস্তানের পরই বাংলাদেশের অবস্থান।

রাজধানীর বায়ুতে দূষণকারী ও ক্ষতিকর উপাদান বেড়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে আজ বৃহস্পতিবার পরিবেশ অধিদপ্তর রাজধানীর বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে একটি সভার আয়োজন করেছে। এতে এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট ১৬টি বিভাগ ও প্রকল্পের প্রতিনিধিদের ডাকা হয়েছে। এতে রাজধানীর ইটভাটাগুলোর দূষণ নিয়ন্ত্রণ, রাজধানীজুড়ে চলা নির্মাণকাজের ধুলা তদারক, পরিবহন খাত থেকে সৃষ্ট ধোঁয়া নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে। পরিবেশ অধিদপ্তর, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ, রাজউক, ঢাকা ওয়াসা, বিআরটিএ, ঢাকা মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষসহ বিভিন্ন সংস্থাকে উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কাজী সারওয়ার ইমতিয়াজ হাসমী বলেন, ‘নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত রাজধানীতে বায়ুদূষণ বেড়ে যায়। তাই এই সময়ের মধ্যে দূষণ যাতে কমানো যায়, সে জন্য আমরা অন্য সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের জন্য ওই সভার আয়োজন করেছি।’

গত বছর পরিবেশ অধিদপ্তরের নির্মল বায়ু ও টেকসই পরিবেশ প্রকল্পের আওতায় ঢাকার বায়ুদূষণের উৎস ও ধরন নিয়ে একটি জরিপ হয়েছে। নরওয়ের ইনস্টিটিউট অব এয়ার রিসার্চের (নিলু) মাধ্যমে করা ওই জরিপে দেখা গেছে, ঢাকার চারপাশে প্রায় এক হাজার ইটভাটা নভেম্বর থেকে চালু হয়। সেগুলো ওই বায়ুদূষণের জন্য ৫৮ শতাংশ দায়ী। এ ছাড়া শীতকাল বা শুষ্ক মৌসুম শুরু হলেও বেশির ভাগ অবকাঠামোর নির্মাণ ও মেরামতকাজ শুরু হয়।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন বলেন, ‘আমরা সীমিতসংখ্যক জনবল দিয়ে ধুলা নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রতিদিন দুই বেলা করে আমার এলাকার ৫০ কিলোমিটার সড়কে পানি ছিটাই। তবে তা কিছুক্ষণের মধ্যে শুকিয়ে যায়। অন্য সরকারি সংস্থাগুলোও দূষণ নিয়ন্ত্রণে এগিয়ে না এলে নির্মল বায়ু পাওয়া যাবে না।’

সূত্র: প্রথম আলো
আজসারাবেলা/কিশন/জাতীয়/স্বাস্থ্য