সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদ লিফলেট আকারে বিতরণের সময় এসে গেছে : ড. কামাল হোসেন - Aj SaraBela (আজ সারাবেলা)

সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদ লিফলেট আকারে বিতরণের সময় এসে গেছে : ড. কামাল হোসেন

প্রকাশিত :২২.১২.২০১৭, ৫:৪১ অপরাহ্ণ
  • ড. কামাল হোসেন। সংবিধান প্রণেতা, রাজনীতির বিদগ্ধজন। গণফোরাম প্রধান। আসন্ন নির্বাচন, নির্বাচনের পরিবেশ, সামাজিক-রাজনৈতিক অস্থিরতা, গুম-খুন- কথা বলেছেন এমন অনেক প্রসঙ্গে। আশার আলো দেখিয়েছেন বঙ্গবন্ধুর স্বাক্ষরিত সাংবিধানকে ধারণার মধ্যে দিয়ে। ‘আজ সারাবেলা’র পক্ষ থেকে সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জববার হোসেনরবিউল ইসলাম রবি

আজ সারাবেলা : খুব সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে, বিভিন্নজন গুম হচ্ছেন এবং গুমের মাত্রাও বেড়ে যাচ্ছে। আগে এ ধরনের ঘটনায় অনেক বেশি প্রতিবাদ দেখা যেত, এখন প্রতিবাদ করার প্রবণতাটাও কমে যাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর কারণ আপনি কি মনে করেন?

ড. কামাল হোসেন : সংবিধান এখনও আছে। আমরা কে কি বললাম বা না বললাম তাতে কোন যায় আসে না। সংবিধানে এ ব্যাপারে স্পষ্ট বলা আছে। কিন্তু কাউকে গুম বলে তো কোন জিনিস নাই। প্যানাল কোডেও নাই। দ্বন্ডবিধিতেও নাই। কোন আইনে নাই। এটা সম্পূর্ণ বেআইনি।

সংবিধানে স্পষ্ট বলা আছে যে, ‘গ্রেপ্তারকৃত কোন ব্যক্তিকে যথা সম্ভব শীঘ্রই গ্রেপ্তারের কারণ জ্ঞাপন না করিয়া প্রহরায় আটক রাখা যাইবে না।’ জানাতে হবে তাকে। আমার পরিষ্কার কথা, ৩৩টা দেখে নিন। আমার দুঃখ লাগে যে, ৪৬ বছরের সংবিধান রয়েছে। তারপরও কেন আমাকে প্রশ্ন করা হয়? কেন আমরা সংবিধানকে অনুসরণ করি না। জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করি না। সংবিধানের বাইরে গিয়ে আইন ও বিচার পরিচালনা করতে চাই। এসব আমার দীর্ঘদিনের প্রশ্ন। আমি তো মনে করি সংবিধান সব জায়গায় থাকা দরকার। বিশেষ করে এইসব ব্যাপারে। প্রত্যেক থানায় থানায় সংবিধান পড়ানো দরকার।

আজ সারাবেলা : নির্বাচনের আর বছর খানেক বাকি। নির্বাচনের কতটা পরিবেশ দেখছেন। আবার বলা হচ্ছে, অনেকের আশঙ্কা, আরেকটা ৫ জানুয়ারির পুনরাবৃত্তি ঘটবে না তো?

ড. কামাল হোসেন : কথা হচ্ছে নির্বাচনের পরিবেশ বলতে আমরা কি বুঝি? যদি সংবিধান মেনে চলি তাহলে তো সব সময়ই নির্বাচনের পরিবেশ থাকার কথা। নির্বাচনের পরিবেশ বলে তো আলাদা কোন পরিবেশ নেই। স্বাভাবিক পরিবেশই নির্বাচনের পরিবেশ। মানুষ অন্যায়ভাবে দলীয় কোন্দলে জড়িয়ে গুম, খুন হবে না। মিথ্যা মামলা হবে না। আইনের শাসন থাকবে। কালো টাকার বিনিময়ে মনোনয়ন কেনাবেচা হবে না। নির্বাচন কমিশন সম্পূর্ণভাবে পক্ষপাতহীন আচরণ করবে। এটা যদি না হয় তবে বুঝতে হবে দেশ সংবিধান অনুযায়ী চলছে না।সংবিধানের কথাগুলো সবাই অমান্য করছে। সমাজ ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির দিকে ধাবিত হচ্ছে।

আমি তো মনে করি একথাগুলো এখন ইতিবাচকভাবে বলা দরকার। আমরা তো বঙ্গবন্ধুর ছবি সব জায়গায় লাগিয়েছি। বঙ্গবন্ধুর কথা বলে শ্লোগান দিচ্ছি। স্বাক্ষরিত দলিলে তো উনার নিজের হাতের স্বাক্ষর রয়েছে। একদম সংরক্ষিত আছে। ভাবছি কোন আন্দোলনের প্রয়োজন নেই। মানুষকে কেবল বলবো যে চলেন, বঙ্গবন্ধুর স্বাক্ষরিত দলিলটা একটু দেখে আসি। তরুণদের নিয়ে যাবো, পেশাজীবীদের নিয়ে যাবো, সবাইকে নিয়ে গিয়ে দেখাবো যে বঙ্গবন্ধু কথায় স্বাক্ষর দিয়েছেন। সেখানে কি বলা আছে। যদি বঙ্গবন্ধুকে বুকে ধারণ করি তবে তো তার স্বাক্ষরিত সংবিধান মানতে হবে। অবশ্যই মানতে হবে। আর না হলে বুঝতে হবে মুখে আদর্শের কথা বলি ভিতরে বঙ্গবন্ধু নেই।

আজ সারাবেলা : কিছুদিন আগে বিএনপি একটি বড় সমাবেশ করেছে। সেখানে বেগম খালেদা জিয়া বলেছেন, তিনি শেখ হাসিনার অধিনে নির্বাচনে যাবেন না। আবার প্রধানমন্ত্রী বলছেন যে, তার দলীয় সরকারের অধিনেই নির্বাচন হবে। অনেকেই একটা সংঘাতময় পরিস্থিতির আশঙ্কা করছে। এমন সম্ভাব্য সংঘাত এড়াতে আপনার পরামর্শ কি?

ড. কামাল হোসেন : আমি চাইবো, সংবিধান মেনে সবাই দায়িত্ব পালন করুক। সবাই সংবিধান মেনে চললে তো সেই সুন্দর পরিবেশ আমরা পাই। সাংবিধানিক শাসন মানেটা কি এটা বুঝতে হবে। কিছু মানুষ তো এমনি এমনি জীবন দেয়নি। এতগুলো জীবনের বিনিময়ে আমরা সংবিধান পেয়েছি। এটা তো খুব সহজে আমরা পাইনি। এখানে কি লেখা আছে- জানমালের নিরাপত্তার কথা লেখা আছে। তাদের অধিকারের উপরে হস্তক্ষেপ করা যাবে না এটাও লেখা আছে। একদম মানে এক, দুই করে লেখা আছে। এটাকে ব্যাখ্যা করা উচিত। সরকারে যারা আছেন তাদের যেমন পড়া উচিত, বোঝা উচিত, তেমনি সরকারের বাইরে যারা আছেন তাদেরও জানা-বোঝা উচিত।

আমি তো মনে করি এখন সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদ লিফলেট আকারে বিতরণের সময় এসে গেছে। গ্রামে, শহরে, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে, অফিস, আদালতে মানুষকে সচেতন করার সময় এসেছে। মানুষকে সংবিধান সর্ম্পকে সচেতন করা। যেন সকলে বুঝতে পারে। জানতে পারে। সংবিধান হলো সেই দলিল যেটা রাষ্ট্র কিভাবে পরিচালিত হবে, শাসকের দায়িত্ব কর্তব্য কি হবে সব বলা আছে। জনগণের অধিকার, এটাও বলা আছে। মৌলিক অধিকার, এটাও বলা আছে। সরকার যদি সংবিধান মেনে না চলে তবে সে গুরুত্বর অপরাধের অপরাধী। সংবিধান অমান্য করার অপরাধ সবচেয়ে বড় অপরাধ। আশা করবো সংবিধান অমান্য করে রাষ্ট্র ও সরকার যেন অপরাধী না হয়। আমি খুব ইতিবাচকভাবেই কথাগুলো বলছি। কেউ যেন আমাকে ভুল ব্যাখ্যা না করেন। এটা বলছি একারণে যে, সরকার ও রাষ্ট্রের সংবিধান অমান্য করার ফল শেষ পর্যন্ত জনগণকেই ভোগ করতে হয়।

আজ সারাবেলা : আপনি গণফোরামের প্রধান। সামনের নির্বাচনকে ঘিরে গণফোরামের পরিকল্পনা কি?

ড. কামাল হোসেন : নির্বাচনের অধিকার জনগণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধিকার। কেননা জনগণই ক্ষমতার মালিক। এই কথাটা আমাদের সংবিধানে ভেঙে লেখা আছে। এই প্রজাতন্ত্রের সাধারণ লোক ক্ষমতার মালিক। জনগণের অধিকার যাতে নিশ্চিত হয়, সুরক্ষিত হয় সেটাই নির্বাচনের বড় চাওয়া।

আজ সারাবেলা : জোটের কথা শোনা যাচ্ছিল। বি চৌধুরি, কাদের সিদ্দিকি, আ স ম রব, মাহমুদুর রহমান মান্না তারা ক’জন মিলে একটি রাজনৈতিক জোট গড়ে তুলেছেন। কিন্তু শেষপর্যন্ত সেখানে আপনাকে দেখা যায়নি।

ড. কামাল হোসেন : আমার কাছে থেকে তো নিশ্চয়ই এমন কিছু শোনেননি। সবচেয়ে বড় ঐক্য হলো জনগণের ঐক্য। মৌলিক বিষয়ে যেমন জানমালের নিরাপত্তা, আইনের শাসন, গণতান্ত্রিক অধিকার এসব বিষয়ে মানুষের মধ্যে মৌলিক ঐক্য আছে। জনগণ সবসময় জানে কিভাবে নিজেদের অধিকার আদায় করতে হয়। আমার কথা হলো, জাতীয় ঐক্য, জনগণের ঐক্যর জন্য কাজ করে যাওয়া। আমরা যারা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি, যারা সাংবিধানিক শাসনে বিশ্বাস করি, আমাদের কাজ হলো জনগণের মাঝে গিয়ে তাদের একত্রিত করা, যাদের মধ্যে ঐক্য ইতিমধ্যে হয়ে আছে।

আমি কোন রাজনৈতিক স্ট্যান্টবাজিতে বিশ্বাস করি না। এটা কখনই আমার স্বভাবে নেই। আমার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে আমি কোন ছলচাতুরির আশ্রয় নেইনি। জনগণ কোন না কোন এক সময় ছলচাতুরিকে প্রত্যাখ্যান করে, ছুড়ে মারে। অতীতেও তাই ঘটেছে।

আজ সারাবেলা : আপনি স্বাধীন বিচার বিভাগের কথা বলছিলেন। এখানে প্রধান বিচারপতির পদত্যাগ, তারপর সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ লোকজনের বিভিন্ন ধরনের মন্তব্য করা, এই সবকিছু মিলিয়ে আদালত তাহলে কতটা স্বাধীন থাকলো এমন প্রশ্ন অনেকের।

ড. কামাল হোসেন : প্রত্যেক বিচারপতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তারা শপথ নিয়েছেন। কোন ঘটনাই তাদের প্রভাবিত করতে পারে না এই বিষয়ে তারা শপথবদ্ধ। কোন বিচারপতির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া যেতেই পারে কিন্তু সেটি কতটা পদ্ধতিগতভাবে হলো, আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করলো কিনা সেটা বিবেচ্য বিষয়। কতটা আইনি প্রক্রিয়া, কতটা বিচারিক কাঠামোর আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়েছে, আদৌ হয়েছে কিনা সেটা জনগণই দেখেছে।

আজ সারাবেলা : উচ্চ আদালতে বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে কখনও কখনও প্রশ্ন উঠতে দেখা যায়। বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট আইনপ্রণয়ন হওয়া কতটা জরুরি বলে মনে করেন?

ড. কামাল হোসেন : সংবিধানের ৯৫ (২) ধারায় এ বিষয়ে উল্লেখ রয়েছে। এর মধ্যে কিন্তু তার যোগ্যতার সম্পর্কে একটা মাপকাঠি আইনানুগভাবে প্রণয়ন হবার কথা। সেই আইনটা এখনও হয়নি। আমাদের অভিজ্ঞতা রয়েছে, এই আইনটা না থাকাতে কখনও কখনও নিয়োগ প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ হয়। যেটা কঠোরভাবে মেনে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা উচিত।
শুধু আইন বা বিচার ব্যবস্থা কেন রাষ্ট্রীয় যে কোন নিয়োগ, নির্বাচন সংবিধান মেনে যোগ্যতার ভিত্তিতে হবে, সততার ভিত্তিতে হবে এটাইতো স্বাভাবিক। এই ব্যবস্থার ব্যত্যয় ঘটলে বুঝতে হবে আমরা অস্বাভাবিক পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি।

আজ সারাবেলা : গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচন কিন্তু সংবিধানের কথা বলেই সম্পন্ন করা হয়েছিল, সংবিধানকে সমুন্নত রাখতেই ৫ জানুয়ারি নির্বাচন। সব শেষে এই বিষয়েই আপনার কাছে জানতে চাইবো।

ড. কামাল হোসেন : আমাকে তো অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে ডাকা হয়েছিল ৫ জানুয়ারি ইলেকশনের ব্যাপারে। আমি বলেছিলাম, দেখেন এটা তো ঘটে গেছে, আর সরকার বলেছে এটা সাময়িকভাবে পরিস্থিতি মোকাবেলা করার জন্য করেছে। এটা আমার কথা না সরকারের কথা।

আমি মনে করি এই বিষয়ে সবাইকে সব জায়গায় জিজ্ঞাস করা উচিত। যেমন আমি আপনাদের জিজ্ঞাস করবো আপনারা, সাংবাদিকরা এই ব্যাপারে নিরব থাকলেন কেন? বাংলাদেশে কেউ এটা নিয়ে প্রশ্ন করবে না, আমি ভাবতেও পারি না। আজকেও ভাবতে পারি না। ২০০৭ সালে তো বিএনপি ২২ জানুয়ারি একটা নির্বাচন দিয়ে দিয়েছিল কিন্তু আমরা কি করেছি সবাই দেখেছে। অতীতেও এদেশের ইতিহাসে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য লড়াই করেছি। সংগ্রাম করেছি। অনেক সময় ঝুঁকি নিতে হয়েছে ঝুঁকিও নিয়েছি।

আজ সারাবেলা : কোন প্রক্রিয়ায় বা কিভাবে জাতীয় নির্বাচন হলে ভালো বলে আপনি মনে করেন?

ড. কামাল হোসেন : দেখুন মানুষকে সচেতন করা জরুরি। সুস্থ নির্বাচন, সুষ্ঠু নির্বাচন বলতে কি বুঝি, কি বোঝা উচিত তা ঘরে ঘরে প্রচার করা জরুরি। এটা কোন সরকার বিরোধিতা নয়। গণতন্ত্রের স্বার্থে, সুস্থ নির্বাচনের স্বার্থে সকল দলেরই এই প্রচারণা করা উচিত। গণতন্ত্রের বিশ্বাস থেকে যে আওয়ামী লীগের জন্ম সেই আওয়ামী লীগও তার সরকার নিজের স্বার্থে সংবিধানকে সত্যিকারভাবে শ্রদ্ধা করে, সাংবিধানিকভাবে নির্বাচন প্রক্রিয়া অবশ্যই সম্পন্ন করবে সেই প্রত্যাশা করছি।

আজ সারাবেলা : ধন্যবাদ আপনাকে।

ড. কামাল হোসেন : আপনাদেরও ধন্যবাদ।

আজসারাবেলা/সংবাদ/তারেক/জাতীয়/সাক্ষাৎকার