বিজয়ের মাসে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি তর্পণ

প্রকাশিত :০১.১২.২০১৭, ৫:২০ অপরাহ্ণ
  • মোহাম্মদ সেতাব উদ্দিন

বিজয়ের মাস শুরু হলো। ২৬ মার্চ ১৯৭১ সাল। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান হানাদার পাকিস্তান বাহিনীর আক্রমণের মুখে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে দেশব্যাপী প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু হয়। রাজশাহীও ব্যতিক্রম ছিল না। আমরা ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত রাজশাহী শহরকে হানাদার মুক্ত রাখতে সক্ষম হই।

১৩ এপ্রিল ভোর রাতে অত্যাধুনিক সামরিক অস্ত্রে সুসজ্জিত পাকিস্তানি সেনাবাহিনী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় পৌঁছে আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরক্ষা বুহ্য ভেদ করে রাজশাহী শহরে প্রবেশের চেষ্টা চালায়। অগ্রসরমান শত্রু বাহিনীর উপর আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা ৩ ইঞ্চি মর্টার থেকে গোলাবর্ষণ শুরু করে। কমান্ডার ছিলেন ক্যাপ্টেন গিয়াস উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী। রাজশাহী দখলের উদ্দেশ্যে পাকিস্তানি গোলান্দাজ বাহিনী ঢাকা থেকে নদী পেরিয়ে নগরবাড়ি ঘাট হয়ে ব্যারিকেড অতিক্রম করে রাজশাহী শহরের উপকণ্ঠে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ঘাঁটি গাড়ে।

১৪ এপ্রিল গভীর রাতে রাজশাহী শহর দখলের জন্য বৃষ্টির মত গোলাবর্ষণ শুরু করে। ভোরের দিকে শত্রু সৈন্যের বিরাট এক বাহিনী আমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। প্রচণ্ড আক্রমণের মুখে আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা আত্মরক্ষার জন্য বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়ে। পরদিন পশ্চিম দিকে শহর থেকে দশ মাইল দূরে প্রেমতলি বিওপি ক্যাম্প অর্থাৎ ইপিআর ক্যাম্পে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি অংশ জড়ো হয়। ক্যাপ্টেন গিয়াস উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী খুব ভোরে কিছু মুক্তিযোদ্ধাসহ গোদাগাড়ী ডাকবাংলায় অবস্থান গ্রহণ করেন। ১৪ এপ্রিল রাজশাহী শহর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর দখলে চলে গেলে আমাদের মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা পরবর্তী করণীয় ঠিক করার জন্য বিভক্ত হয়ে অর্ধেক প্রেমতলি ইপিআর ক্যাম্পে এবং অর্ধেক গোদাগাড়ী ডাকবাংলোয় অবস্থান গ্রহণ করে। হানাদার পাকিস্তান বাহিনী চাঁপাইনবাবগঞ্জের দিকে অগ্রসর হলে আমরা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারব কিনা সে বিষয়ে খোঁজ খবর নিতে থাকি। আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তান বাহিনীর সামগ্রিক কর্মকাণ্ড আমরা নজরে রাখি।

১৭ এপ্রিল খোঁজ নিয়ে জানতে পারি পাকিস্তানি বাহিনী চাঁপাইনবাবগঞ্জ দখলের জন্য সড়ক পথে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে। রাতে প্রেমতলি ইপিআর ক্যাম্পে এসে পৌঁছতে পারে। প্রেমতলি ইপিআর ক্যাম্পের সামনে নদীর ঘাটে আমাদের বিরাট দুটি নৌকা প্রস্তুত ছিল। ক্যাম্পে রক্ষিত চাল ডাল নৌকায় উঠানো হলো। পদ্মা নদীর ওপারে নির্মল চর গ্রামে আপাতত আমরা ক্যাম্প করব। এদিকে মেশিন গানের গুলিতে আহত ইপিআর ল্যান্স নায়েক কম্পাউনডার কামরুজ্জামান প্রেমতলি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। আমার বড় ভাই হাবিবুর রহমান (পরবর্তীতে শহিদ) ঘোড়াগাড়ি করে আহত কামরুজ্জামানকে নিয়ে এলো। কামরুজ্জামান অনেকটা সুস্থ। ঘা কিছুটা শুকিয়েছে। হাত ধরে ঘোড়াগাড়ি থেকে নামিয়ে হাঁটিয়ে নিয়ে গিয়ে নৌকায় উঠানো হলো। আমার বড় ভাই আমাকে বললেন, ‘তুই ওদের সাথে যা। যদি বাঁচি রাজশাহী রেডিও সেন্টার বন্ধ করে দিয়ে আমিও ক’দিন পর আসছি।’ কাকতালীয়ভাবে দিনটি ছিল ১৭ এপ্রিল। এদিন কুষ্টিয়ার মেহেরপুর আম্রকাননে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলামকে উপ-রাষ্ট্রপতি এবং তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী করে গঠিত মুজিবনগর সরকার শপথ গ্রহণ করেছিল। তার আগে ১০ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠিত হবার প্রাক্কালে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পঠিত হয়। অধ্যাপক ইউসুফ আলি এমএনএ স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটি পাঠ করেন। এই ঘোষণাপত্রে পরিষ্কার করে বলা হয়, ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান বাংলার গণমানুষের পক্ষে ২৬ মার্চ ১৯৭১ ইং প্রথম প্রহরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।’ সিদ্ধান্ত হয় বঙ্গবন্ধু প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপতি হবেন। বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে উপ-রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। প্রজাতন্ত্রের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর তাজউদ্দীন আহামেদকে নির্বাচিত করা হয়। কর্নেল (অব.) এম এ জি ওসমানী এম.এন.এ কে জেনারেল পদে পদোন্নতি প্রদান করে মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি পদে নিয়োগ দেয়া হয়। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ, মুক্তিযোদ্ধাদের সমন্বয়ে গঠিত মুক্তি বাহিনীর এক চৌকস কুচকাওয়াজ পরিদর্শন করেন এবং সালাম গ্রহণ করেন। প্রধান সেনাপতি জেনারেল এম.এ.জি ওসমানী কুচকাওয়াজে নেতৃত্ব দেন।
২৫ শে মার্চ গভীর রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী অত্যাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে ট্যাঙ্ক নিয়ে ঢাকার ঘুমন্ত মানুষের উপর অতর্কিতে হামলে পড়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ইপিআর সদর দপ্তর (পিলখানা) এবং রাজারবাগ পুলিশ লাইন ছিল হায়েনা বাহিনীর প্রধান লক্ষ্যস্থল। কারণ ছাত্র-শিক্ষক, শতভাগ পুলিশ এবং পচানব্বই ভাগ ইপিআর সৈনিক ছিল বাঙালি (অফিসার ছাড়া)। গুলাগুলির শব্দ আর আক্রান্ত মানুষের আর্তচিৎকারে রাতের ঢাকা মৃত্যু নগরীতে পরিণত হয়। করুণ কান্নায় আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠে। পাকিস্তানিরা অতর্কিতে আক্রমণ করতে পারে, বঙ্গবন্ধু আগেই আঁচ করতে পেরেছিলেন। তাই তার বিশ্বস্ত সহকর্মী সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও তাজউদ্দীন আহমদকে সঙ্গোপনে পরিকল্পনা মত করণীয় বলে দিয়ে তাদের সন্ধ্যার আগেই ৩২ নম্বর থেকে বিদায় করে দেন। গভীর রাতে ঢাকা পাকিস্তানি হায়েনা বাহিনী দ্বারা আক্রান্ত হলে জাতির পিতা ধানমন্ডির ৩২ নম্বর (বঙ্গবন্ধু ভবন) থেকে ৭১-এর ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে ইংরেজিতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন- This may the my last massage. From now Bangladesh is independence———fight till the last soldier of the occupation Army is there in the sacred soil of Bangladesh.  Joy Bangla’. অর্থাৎ ‘এটাই হয়ত আমার শেষ বার্তা। আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। দখলদার বাহিনীর শেষ সৈনিকটি বাংলাদেশের পবিত্র ভূমিতে যতক্ষণ থাকবে, যুদ্ধ চালিয়ে যাও। ‘জয় বাংলা’ ইংরেজিতে স্বাধীনতা ঘোষণার উদ্দেশ্য বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ। স্বাধীনতা ঘোষণা প্রচার হওয়ার পরপরই পাকিস্তান সেনাবাহিনী আমাদের জাতির পিতাকে তার ৩২ নম্বর বাসভবন থেকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়।
এদিকে ওয়ারলেসে বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠে স্বাধীনতার ‘ঘোষণা প্রচার’ সম্পর্কিত খবর ২৬ মার্চ সকালে বিদেশি বিভিন্ন দৈনিক, আকাশ বাণী এবং এবিসিসহ বিদেশি প্রচার মাধ্যমগুলো তুলে ধরে। প্রত্যক্ষ সাক্ষী সর্বজনাব এম এ হান্নান এমএনএ, বেতারকর্মী বেলাল মোহাম্মদ এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব বেগম মুস্তারি শফি’র বক্তব্য অনুযায়ী আওয়ামী লীগ নেতা জহুর আহামেদ চৌধুরীর তত্ত¡াবধানে ২৬ মার্চ খুব সকালে (ভোর ৬টা নাগাদ) চট্টগ্রামে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার বাংলা তর্জমা বিলি করা হয়। বেতারকর্মী বেলাল মোহাম্মদ এর সহায়তায় জনাব এমএ হান্নান এই ঘোষণা ২৬ মার্চ চট্টগ্রাম বেতার থেকে সর্ব প্রথম পাঠ করেন। সেই দিন দুপুরেই হানাদার পাকিস্তানি সেনারা চট্টগ্রাম বেতার নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে যায়। জনাব বেলাল মোহাম্মদ ২৬ তারিখ গভীর রাতে কালুরঘাট প্রেরণকেন্দ্রে পৌঁছে পরদিন অর্থাৎ ২৭ তারিখ সকাল থেকেই ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার’ সম্প্রচার শুরু করেন। বেলাল মোহাম্মদের সঙ্গী হন বেতার প্রকৌশলী সৈয়দ আব্দুস শাকের, অনুষ্ঠান প্রযোজক মোস্তফা আনোয়ার, অনুষ্ঠান প্রযোজক তাহের সুলতান, টেকনিক্যাল অ্যাসিসটেনট রাসেদুল হক, টেকনিক্যাল অপেরেটর সরফুজ্জামান প্রমুখ।
এদিকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী রাজশাহী দখলের পর চাঁপাইনবাবগঞ্জ অভিমুখে তাদের অগ্রযাত্রা বহাল রাখে। ১৭ এপ্রিল গভীর রাতে প্রেমতলি ইপিআর ক্যাম্পে পৌঁছে তাদের অবস্থান পাকাপোক্ত করে। অন্যদিকে গোদাগাড়ীতে আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা ক্যাপ্টেন গিয়াস উদ্দিন আহমেদ চৌধুরীর নেতৃত্বে কঠিন এক প্রতিরক্ষা বুহ্য রচনা করে সার্বিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সচেষ্ট হয়। কিন্তু পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ১৮ এপ্রিল থেকে জঙ্গি বিমানের সহায়তায় রকেট এবং মেশিনগানের সাহায্যে প্রচণ্ড আক্রমণ শুরু করে। দুই দিন লড়াইয়ের পর আমাদের প্রতিরক্ষা বুহ্য ভেদ করে ২০ এপ্রিল গভীর রাতে শত্রু সেনারা গোদাগাড়ী দখল করে ভোর রাতে এবং ২১ এপ্রিল সকালে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌঁছে যায়। ক্যাপ্টেন গিয়াস ইতিমধ্যেই তার সহযোগী মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে অস্ত্র শস্ত্র, গোলাবারুদ স্পিড বোটে নদীর ওপারে বাংলাদেশের চরে পার হয়ে আসেন। আগেই বলেছি আমরা ১৭ এপ্রিল রাতে নদী পেরিয়ে চরে পৌঁছে ছিলাম। গেরিলা যুদ্ধ চালিয়ে যেতে খাদ্য সামগ্রী প্রয়োজন বিধায় গোদাগাড়ি খদ্যগুদাম থেকে প্রায় এক’শ মণ চাল নৌকায় করে চরে আনা হয়।
জাতির পিতার আদেশে আমাদের রাজশাহীর মুক্তিযুদ্ধের প্রাথমিক বাস্তব চিত্র মোটামটি বর্ণনা করা হলো।
লেখক: মুক্তিযোদ্ধা এবং অবসরপ্রাপ্ত পরিচালক, বাংলাদেশ বেতার।