বছরে ক্ষতি ৪২ হাজার কোটি টাকা: বিশ্বব্যাংক

প্রকাশিত :১১.১২.২০১৭, ৪:৫৩ অপরাহ্ণ

ডেস্ক রিপোর্ট : বায়ু, পানি ও কাজের পরিবেশের দূষণ এবং শিশুদের ওপর ভারী ধাতু সিসার প্রভাবে বছরে ক্ষতি হচ্ছে প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকা।অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও শিল্পায়নের ফলে বাংলাদেশের পরিবেশ মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়ছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার শহরের গরিব মানুষ ও শিশুরা।  এর পরিমাণ দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ২ দশমিক ৭ শতাংশ।

বিশ্বব্যাংকের ‘বাংলাদেশ পরিবেশ সমীক্ষা-২০১৭’ শীর্ষক প্রতিবেদনে তথ্যগুলো তুলে ধরা হয়। এর আগে ২০০৬ সালেও বিশ্বব্যাংক এমন একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছিল। রোববার প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয় রাজধানীর একটি হোটেলে বিশ্বব্যাংকের পক্ষ থেকে আয়োজিত এক কর্মশালায়। এতে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় এবং বিশ্বব্যাংকের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা ও দেশের পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন।

কর্মশালায় প্রতিবেদনের প্রাথমিক তথ্য তুলে ধরে বলা হয়, বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করতে হলে পরিবেশ সুরক্ষা করেই এগোতে হবে। নইলে উন্নয়ন টেকসই হবে না। এ জন্য কর্মশালায় পরিবেশ অধিদপ্তরের জনবল, দক্ষতা ও ক্ষমতা বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়। বক্তারা পরিবেশ অধিদপ্তরের কাজে স্বচ্ছতা বজায় রাখার এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করার ওপর জোর দেন।

কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তৃতায় পরিবেশ ও বনমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘রাজধানীর দূষণের যে চিত্র আমরা আজ দেখলাম, তা এত পূর্ণাঙ্গভাবে কখনো চোখে পড়েনি। তবে এত দূষণ মোকাবিলা করার মতো জনবল ও দক্ষতা পরিবেশ অধিদপ্তরের নেই।’ তিনি মন্তব্য করেন, দেশের পরিবেশ রক্ষিত না থাকার জন্য মানুষ রাজনৈতিক নেতৃত্বকে দোষারোপ করে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে প্রশাসনেরও দায় আছে।

কর্মশালায় বিশ্বব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত এদেশীয় পরিচালক জাহিদ হোসেন বলেন, পরিবেশ ধ্বংসের বিনিময়ে যে প্রবৃদ্ধি আসে, তা টেকসই হয় না। প্রবৃদ্ধির গতি ধীর না করেও পরিবেশ রক্ষা করা যায়—এ মন্তব্য করে তিনি বলেন, পরিবেশের এত ক্ষতি বাংলাদেশ বহন করতে পারবে না। তাই পরিবেশ রক্ষা করেই অর্থনৈতিক উন্নতি করতে হবে।

পানিদূষণ

‘বাংলাদেশ পরিবেশ সমীক্ষা-২০১৭’ শীর্ষক এ প্রতিবেদনে বলা হয়, শিল্পকারখানাগুলো অপরিকল্পিতভাবে ঢাকার ভূগর্ভস্থ পানি তুলে ফেলায় পানির স্তর আশঙ্কাজনক হারে নিচে নেমে যাচ্ছে। আবার মাটির ওপরের, অর্থাৎ খাল ও নদীসহ অন্যান্য জলাশয়ের পানিও মারাত্মকভাবে দূষিত হয়ে পড়ছে। বিশ্বব্যাংকের ২০০০ সালের জরিপে দেখা গিয়েছিল, রাজধানীর মিরপুর, হাজারীবাগ, কামরাঙ্গীরচর, চাঁদনীঘাট, সদরঘাট, ফরাশগঞ্জ, ধোলাইখাল ও পাগলা এলাকার খালে পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের (ডিও) পরিমাণ ছিল প্রতি লিটারে ৫ মিলিগ্রাম। পরিমাণটি ছিল মানমাত্রার চেয়ে বেশি। শুধু ধোলাইখাল ও হাজারীবাগের পানিতে এর পরিমাণ নেমে এসেছিল ৪ মিলিগ্রামে। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী, মৎস্য ও জলজ প্রাণীর জীবনধারণের জন্য পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন প্রতি লিটারে ন্যূনতম ৫ মিলিগ্রাম থাকা প্রয়োজন।

বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, ওই এলাকাগুলোর পানিতে ডিওর পরিমাণ ২০১১ সাল থেকে শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। সেখানকার পানিতে কোনো অক্সিজেন নেই। এ পানিতে কোনো প্রাণী বেঁচে থাকতে পারে না। সর্বশেষ এই প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, রাজধানী ঘিরে থাকা নদীগুলোতেও পানিদূষণের পরিস্থিতি একই রকম।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ৭১৯টি তৈরি পোশাকশিল্পের ওয়াশিং ও ডাইং কারখানা থেকে প্রতিদিন রাজধানীর চারপাশের নদীগুলোতে বর্জ্য এসে পড়ছে। এটি দূষণের অন্যতম উৎস। এক টন কাপড় উৎপাদন করার বিনিময়ে নদীতে ২০০ টন বর্জ্য পানি তৈরি করা হচ্ছে।

এ ছাড়া আরও ছয় ধরনের শিল্পকারখানাকে দূষণের জন্য দায়ী করা হয়। ২০১৩-১৪ সালে বস্ত্র কারখানাগুলো ২৭০ হাজার কোটি লিটার দূষিত বর্জ্য পানি নির্গত করেছে। একই সময়ে ইস্পাত কারখানাগুলো থেকে ১ লাখ কোটি লিটার এবং কাগজ কারখানাগুলো থেকে ৪৫ হাজার কোটি লিটার দূষিত বর্জ্য পানি নির্গত হয়।

জলাভূমি ভরাট ও জলাবদ্ধতা

প্রতিবেদনে রাজধানীর জলাভূমি ভরাট করা ও জলাবদ্ধতার যোগসূত্র তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়, ২০১৭ সালের বর্ষা মৌসুমে রাজধানীতে কোনোমতে টিকে থাকা ১৩টি খালের মধ্যে মাত্র দুটি সচল পাওয়া গেছে। বাকি খালগুলো দিয়ে কোনো পানি প্রবাহিত হয়নি। সে কারণে এবারের বর্ষায় সামান্য বৃষ্টিতেই রাজধানীর বিশাল এলাকা ডুবে গেছে। গত ২২ অক্টোবর রাজধানীতে ২৩৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতের দিনটির উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, সেদিন শহরের বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) এলাকার ৬০ শতাংশ এবং সিটি করপোরেশন এলাকার ২৫ শতাংশ এলাকা ডুবে গিয়েছিল।

রাজধানীর পাশাপাশি ছোট জেলা শহরগুলোতে জলাশয় ভরাট, দখল ও দূষণ চলছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পাবনা জেলা শহরের উদাহরণ দিয়ে বলা হয়েছে, ১৯৯০ সালে ওই শহরের জলাভূমি ছিল ৫৬৮ হেক্টর। ২০১৭ সালে তা ২৬৪ হেক্টরে নেমে এসেছে। শহরের সবুজ বা বৃক্ষ আচ্ছাদিত এলাকা ১২৩ হেক্টর থেকে কমে ৮২ হেক্টরে দাঁড়িয়েছে। ফলে সেখানেও কয়েক বছর ধরে জলাবদ্ধতা দেখা দিচ্ছে। দেখা দিয়েছে রাজধানীর মতো বিপর্যয়।

গরিব ও শিশুরা দূষণের শিকার

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজধানীর পানি ও বায়ুদূষণের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে গরিব মানুষ ও শিশুরা। রাজধানীর গরিব মানুষেরা নদী ও খালের পারে বাস করে থাকে। আর এসব এলাকাতেই গড়ে উঠেছে সবচেয়ে বেশি শিল্পকারখানা, ইটের ভাটা ও বিচিত্র কলকারখানা। রাজধানীর এমন ৫৯টি এলাকা চিহ্নিত হয়েছে, যা তীব্র মাত্রায় সিসা-আক্রান্ত বা হট স্পট। এসব এলাকার পানি ও মাটিতে আরও পাওয়া গেছে আর্সেনিক, ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়াম, ক্ষুদ্র বস্তুকণা (পিএম ২.৫), কীটনাশক ও সালফার ডাই-অক্সাইডের মতো মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর বস্তু।

প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজধানীতে শুধু সিসা-দূষণের শিকার ছয় লাখ মানুষ। আর তার বেশির ভাগই শিশু। রক্তের নমুনা পরীক্ষা করে সিসার অস্তিত্ব পাওয়া গেছে মানমাত্রার চেয়েও বেশি। এ দূষণের কারণে এসব এলাকার শিশুরা স্নায়বিক ও মানসিক সমস্যার শিকার হচ্ছে। শিশুদের মেধার বিকাশ ও উন্নয়নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দূষণজনিত সমস্যা।

কর্মশালায় পরিবেশ সমীক্ষার খসড়া প্রতিবেদনের এসব তথ্য তুলে ধরেন বিশ্বব্যাংকের পরিবেশ বিভাগের প্র্যাকটিস ম্যানেজার কেসেনিয়া এলভোভস্কি। পরামর্শকদের পক্ষে পরিবেশ সমীক্ষা দলের নেতা মোখলেসুর রহমান প্রশ্নোত্তর পর্ব সঞ্চালনা করেন। আরও বক্তব্য দেন পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের সচিব ইসতিয়াক আহমেদ ও পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক রইছউল আলম মণ্ডল।

আজসারাবেলা/সংবাদ/রবি/পরিবেশ/জাতীয়