মহিউদ্দিন চৌধুরীরা চিরকাল মানুষের মনে থেকে যায়

প্রকাশিত :১৫.১২.২০১৭, ৪:১৯ অপরাহ্ণ
  • জে. জাহেদ, চট্টগ্রাম থেকে

দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট বর্ণবাদবিরোধী নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা মৃত্যুতে গোটা দক্ষিণ আফ্রিকাজুড়ে ছিলো শোকের ছায়া।

প্রিয় নেতাকে হারানোর পর দেশটির মানুষ এই শোকের প্রকাশ ঘটিয়েছিলো নানাভাবে, কেউ অশ্রু বিসর্জন করে, কেউ মোড়ে মোড়ে মোমবাতি জ্বালিয়ে।

নানা ধরনের অস্থায়ী স্মৃতিফলক ও ফুল দিয়ে এবং শোকবাতি জ্বালিয়ে কোটি কোটি মানুষ তাদের শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করেছিলো।

সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেছেন, একজন মানুষের জীবনে সর্বোচ্চ যেটুকু অর্জন করা সম্ভব, নেলসন ম্যান্ডেলা তাকেও ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন, অন্যদের স্বাধীনতার জন্য তিনি নিজের স্বাধীনতাকে উৎসর্গ করেছিলেন।

ঠিক তার মতই জনপ্রিয় আমাদের চট্টগ্রামের মাটি ও মানুষের প্রিয় নেতা আলহাজ এবিএম মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরী। এই জনপ্রিয়তার একটাই কারণ, বঙ্গবন্ধুর মত গণমানুষের মুখের ভাষাই তার মুখ দিয়ে বের হতো।

কোটি মানুষের অধিকারের সাহসী বাণী তার কন্ঠে আওয়াজ তুলেছে বারবার। যা নগর ও নগরীর মানুষকে সাহস যুগিয়েছে।

হে প্রভু, প্রিয় মানুষ হারানো কত যে কষ্টের তা বুঝাতে পারবো না। গত সপ্তাহে ঢাকার মেয়র আনিসুল হক, আজ চট্টলার সাবেক মেয়র। ভোরে মহিউদ্দিন চৌধুরীর মৃত্যু সংবাদে ভোরের পাখির কন্ঠস্বর ছিলো ভিন্ন।

শহরের সূর্যটা বড় বিষন্ন। চট্টগ্রামের খেটে খাওয়া লাখো মানুষ আজ শোকে পাথর। সকালেই নগরীর বিভিন্ন মোড়ে মানুষের কান্না ছিল দৃশ্যমান। চোখের জল ফেলেনি, এমন একজনও নেই।

চট্টগ্রামে মুক্তিসংগ্রামের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মানুষটির দীর্ঘ জীবনের নানা ইতিহাস এখন মুখে মুখে মানুষের। যুগ যুগ ধরে এমন মহান মানুষ নগরীতে একবারেই আসে।

জগতে আর তাদের মতো মানুষ বারবার জন্মায় কিনা জানি না। নগরীর চশমা হিলের বাড়িতে থাকতেন, আজ সবই স্মৃতি। লাখো সাধারণ মানুষ আর নেতাদের ঢল। নীরবে গণমানুষের কান্নায় শহর আজ শোকে ম্রিয়মান।

জীবিত থাকাকালে অসংখ্যবার কারাবাসের পর যখন নগরীর লালদীঘি মাঠে দাঁড়িয়ে জনতার উদ্দেশ্যে বক্তব্য শুরু করতেন, কি আর্শ্চয মন্ত্রে বিমোহিত মানুষ, যেন এক বাঁশিওয়ালা।
আর শহরটি যেন হ্যামিলিন।

লন্ডন থেকে চট্টলার বর্ষিয়ান নেতা সর্বোইউরোপিয়ন আ.লীগের সম্পাদক এমএগণি বলেছেন, ‘এই পৃথিবীতে আমরা যত মানুষের সঙ্গে সময় কাটিয়েছি, তার মধ্যে সবচেয়ে সংগ্রামী, সবচেয়েও সাহসী এবং সবচেয়ে মানবিক চট্টগ্রাম গণমানুষের অসাধারণ জনপ্রিয় মহান মানুষটি হলেন আলহাজ্ এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী।

তীব্র মর্যাদাবোধ এবং মানুষের স্বাধীনতার জন্য নিজের স্বাধীনতা বিসর্জন দেয়ার যে অনমনীয় মনোবল তিনি দেখিয়েছেন, সেটা শুধু চট্টগ্রামকে বদলে দেয়নি, আমাদের সবাইকে সামনে এগিয়ে দিয়ে, বাংলাদেশকে বদলে দিয়েছে।

৭৪ বছরের জীবনে মহিউদ্দিন চৌধুরী চট্টগ্রামের মেয়র ছিলেন ১৬ বছর। একাত্তরের এই মুক্তিযোদ্ধা মৃত্যু পর্যন্ত ছিলেন চট্টগ্রাম নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি।

১৯৪৪ সালের ১ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার গহিরা গ্রামে হোসেন আহমেদ চৌধুরী ও বেদুরা বেগমের ঘরে জন্ম নেন মহিউদ্দিন। ছাত্র জীবনেই রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়া মহিউদ্দিন ছিলেন বঙ্গবন্ধুর স্নেহধন্য; মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন, যুদ্ধের পর জড়িয়ে পড়েন শ্রমিক লীগের রাজনীতিতে।

পঁচাত্তরের ১৫ অগাস্ট জাতির জনককে হত্যার পর প্রতিশোধ নিতে পালিয়ে ভারতে গিয়ে প্রশিক্ষণ নেন মহিউদ্দিন চৌধুরী। এরপর ১৯৭৮ সালে দেশে ফেরেন বলে আত্মজীবনীতে উল্লেখ করেছেন তিনি।

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে মহিউদ্দিন চট্টগ্রামে ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও শ্রমিক লীগের শীর্ষ পদে ছিলেন। চট্টগ্রামে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, বন্দর রক্ষা আন্দোলন ও অসহযোগ আন্দোলনেও তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন।

সারাদেশে পরিচিতি পেলেও রাজনীতিতে চট্টগ্রামের গণ্ডিতেই নিজেকে ধরে রেখেছেন সব সময়। ১৯৯১ সালে চট্টগ্রাম নগরীর কোতোয়ালি আসনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কারচুপি করে তাকে পরাজিত করা হলেও ১৯৯৪ সাল থেকে টানা তিনবার চট্টগ্রাম সিটির মেয়র নির্বাচিত হয়ে ১৬ বছর দায়িত্ব পালন করেন মহিউদ্দিন। তার মেয়াদে পরিচ্ছন্নতা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সেবায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ‘অনন্য দৃষ্টান্ত’ স্থাপন করেছিল বলে দেশবাসী মনে করেন। বন্দরনগরীর ষোলশহর এলাকায় তার বাসার গলিটি চট্টগ্রামবাসীর কাছে ‘মেয়র গলি’ হিসেবেই পরিচিত হয়ে যায়।
নেতা আসে, নেতা যায়, মহিউদ্দিন চৌধুরীরা চিরকাল মানুষের মনে থেকে যায়।

লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক