আপনার সন্তানকে জিপিএ-৫ই পেতে হবে? - Aj SaraBela (আজ সারাবেলা)
আহমাদ মোস্তফা কামাল

আপনার সন্তানকে জিপিএ-৫ই পেতে হবে?

প্রকাশিত :৩১.১২.২০১৭, ১২:২৬ অপরাহ্ণ
  • আহমাদ মোস্তফা কামাল

পিইসি এবং জেএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে। যারা পাশ করেছ – রেজাল্ট যেমনই হোক না কেন, তাদেরকে ভালোবাসা ও অভিনন্দন। সত্যি কথা বলতে কি, একজন শিক্ষার্থীর জীবনে এ দুটো পরীক্ষার কোনো গুরুত্বই নেই, যতটা আছে এসএসসি এবং এইচএসসির। অথচ শৈশব-কৈশোরেই দু-দুটো পাবলিক পরীক্ষায় বসতে বাধ্য করা হচ্ছে বাচ্চাদের। কী লাভ হচ্ছে এতে, কে জানে!

আমরা, অভিভাবকরাও, এ নিয়ে অতিশয় মাতামাতি করছি। বাচ্চাদের জিপিএ ফাইভ পাওয়ার খবর দিচ্ছি সোল্লাসে, আর তা না পেলে ওদেরকে ভয়ংকর এক মানসিক চাপের মধ্যে রাখছি।

হ্যাঁ, লক্ষ লক্ষ জিপিএ-৫ প্রাপ্ত বাচ্চাদের ভিড়ে নিজের সন্তানের মুখটি দেখতে না পেলে মন খারাপ হয় বৈকি, কিন্তু ভেবে কি দেখেছেন এই ফলাফলের মানে কী? আপনি যখন এসএসসি/এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছিলেন তখন ফার্স্ট ডিভিশন দেয়া হতো ৬০% নম্বর পেলেই, এবং সেটা কী ভয়াবহ মূল্যবান ছিল সমাজে! এমনকি ৪৫%-৫৯% পাওয়া সেকেন্ড ডিভিশনের ছাত্র-ছাত্রীরাও ভালো কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পেতো। আর এখন?

জিপিএ-৫ মানে ৮০%, এবং আপনি অন্যায়ভাবে আশা করছেন – আপনার সন্তানটিকে জিপিএ-৫ই পেতে হবে, এরচেয়ে কম পেলে চলবেই না, মুখই দেখানো যাবে না কাউকে। অথচ জিপিএ-৪ মানে কিন্তু ৭০% নম্বর, আপনার সন্তানটি হয়তো তা পেয়েছে, আপনি যা পাননি আপনার ছাত্রজীবনে, তবু আপনি সন্তুষ্ট নন। আপনার দোষ আর কীভাবে দিই? এই অবস্থাটা তৈরি করা হয়েছে রাষ্ট্রীয়ভাবেই।

কতিপয় মহামানব বুদ্ধিজীবীর পরামর্শে আমাদের মহান শিক্ষামন্ত্রণালয় শিক্ষকদের কোনোরকম প্রশিক্ষণ দেয়া ছাড়াই ‘সৃজনশীল পদ্ধতি’ নামক এক উদ্ভট ব্যবস্থা চালু করেছে, যেটা না বোঝে শিক্ষার্থীরা, না বোঝেন শিক্ষকরা। চালু করা হয়েছে পিইসি এবং জেএসসি নামক দু-দুটো পাবলিক পরীক্ষা যার প্রয়োজনীয়তা এবং উপকারিতা আজ পর্যন্ত বোঝা যায়নি। সৃষ্টি করা হয়েছে এমন পরিস্থিতি যেন জিপিএ-৫ ছাড়া আর সব ফলাফলই অগ্রহণযোগ্য! মানে ফেইল! ফলে প্রশ্ন ফাঁসের ‘মহোৎসব’ চলছে, সরকারই সেই সুযোগ করে দিয়েছে, কোনো-কোনো অভিভাবক সেই ফাঁসকৃত প্রশ্নপত্র সন্তানদের জন্য অনুমোদন করছেন, ভেঙে দেয়া হচ্ছে শিশুদের নৈতিক মেরুদণ্ড।

নানা তরফ থেকে এই পরীক্ষাগুলো বাতিলের দাবি উঠলেও সরকারপ্রধানের একক জেদে তা বহালই থেকে যাচ্ছে। ভাবা যায় যে, আমাদের সন্তানদের নিয়ে কী ভয়ংকর খেলায় মেতেছে এই রাজনীতিক আর বুদ্ধিজীবীরা?

যদি রুখে দাঁড়াতে না-ও পারেন অন্তত এই কদর্য খেলা থেকে নিজে দূরে থাকা এবং সন্তানদেরকে দূরে রাখার চেষ্টা তো করা যায়! আপনার সন্তানটি যে ফলাফলই করুক, ওর মন ভেঙে দেবেন না। ওর সামনে দীর্ঘ-জীবন পড়ে আছে, অনেক কিছু করতে পারবে ও, নিশ্চিত থাকুন। এবং চেষ্টা করুন যেন সে নৈতিক মেরুদন্ডসম্পন্ন মানুষ হয়ে ওঠে।

ওর হাতে বই তুলে দিন, খেলাধুলা আর সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করার জন্য উৎসাহ দিন। দেখবেন, আপনার সন্তানটি আগামী দিনের নায়ক হয়ে উঠবে।

লেখক: কথাসাহিত্যিক ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক।

(লেখাটি লেখকের ফেসবুক থেকে নেয়া)