খালেদা জিয়া নির্বাচনে অযোগ্য হলে আন্দোলন ছাড়া কোন পথ নেই -আবুল কালাম আজাদ সিদ্দিকী, সাবেক সাংসদ | Aj SaraBela (আজ সারাবেলা)
আবুল কালাম আজাদ সিদ্দিকী। ছবি: আজ সারাবেলা

খালেদা জিয়া নির্বাচনে অযোগ্য হলে আন্দোলন ছাড়া কোন পথ নেই -আবুল কালাম আজাদ সিদ্দিকী, সাবেক সাংসদ

প্রকাশিত :৩১.০১.২০১৮, ৭:৫৩ অপরাহ্ণ

আবুল কালাম আজাদ সিদ্দিকী। টাঙ্গাইল (মির্জাপুর-৭) আসনের বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য। বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির শিশুবিষয়ক সম্পাদক। মির্জাপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি। মির্জাপুর বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের সাবেক ভিপি।

মাঠপর্যায়ের রাজনীতি করে জনগণের ভালবাসায় নির্বাচিত হয়েছেন সংসদ সদস্য। রাজনীতির হাতেখড়ি ছাত্রজীবনে। জীবনে সাধনাই ছিল সফল রাজনীতিবিদ হওয়া। ছিলেন সফল ও ত্যাগী ছাত্রনেতা। নেতৃত্ব গুণে উঠে এসেছেন কেন্দ্রীয় রাজনীতির বলয়ে। দেশের রাজনীতির প্রেক্ষাপট, খালেদার জিয়ার রায়, একাদশ জাতীয় নির্বাচন ও দেশের সার্বিক গণতান্ত্রিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনায় মুখোমুখি হয়েছিলেন আজ সারাবেলা’র। কথা বলেছেন অতীত-বর্তমান রাজনীতি নিয়ে। স্বপ্নের কথা বলেছেন ভবিষ্যতের রাজনীতি নিয়ে, আগামীর গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ নিয়ে।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সামিউল তারেক জুলকারনাইন জ্যাকি

আজ সারাবেলা: কেমন আছেন?

আবুল কালাম আজাদ সিদ্দিকী : আল-হামদুলিল্লাহ ভালো আছি। শারীরিকভাবে ভালো আছি, সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে ভালো নেই। কারণ দেশ ভালো অবস্থায় নেই। তাই আমরাও ভালো নেই।

আজ সারাবেলা: একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বৃহৎ রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি কি চিন্তা-ভাবনা করছে?

আবুল কালাম আজাদ সিদ্দিকী: দেখুন আমাদের পরিকল্পনা খুবই পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্ন। আমরা চাই সকল দলের অংশগ্রহণে একটা নিরপেক্ষ নির্বাচন হোক। জনগণ স্বতঃস্ফুর্তভাবে ভোট দিবে এবং ভোট দিতে স্বাচ্ছন্দবোধ করবে। পরিপূর্ণ গণতন্ত্র ফিরে পেতে চাই, পরিপূর্ণ গণতন্ত্র বলতে যা বোঝায়, এখন দেশে তা নেই। গণতন্ত্র এখন আইনের হাতে বন্দি। একদলীয় শাসনব্যবস্থা যেমন ঠিক তেমনই একটি শাসনব্যবস্থা দেশে চলছে। কোন মিছিল-মিটিং করতে চাই তাহলে আমাদের অনুমতি নিতে হয়। সরকারি দলের কোন অনুমতি লাগে না। আমাদের নেত্রী বারবার বলেছেন যে, দেশের স্বার্থে, জনগণের স্বার্থে, গণতন্ত্রের স্বার্থে সংলাপের মাধ্যমে জাতির এই ক্রান্তিলগ্নে রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছাতে চাই। সমঝোতা ছাড়া, গণতন্ত্র ছাড়া একটা জাতি কখনো এগিয়ে যেতে পারে না। একতরফাভাবে গণতন্ত্র এগিয়ে যেতে পারে না। কিছুদিন ভাল মনে হতে পারে। কিন্তু এর কোন স্থায়িত্ব নেই। আমরা চাই রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে রাজনৈতিক পরিবেশ সৃষ্টি করে একটি নিরপেক্ষ সরকারের অধিনে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন যেন অনুষ্ঠিত হয়। এটা নির্বাচন সম্পর্কে আমাদের একটি পরিষ্কার সিদ্ধান্ত, পরিকল্পনা বা ধারণা বলতে পারেন।

সরকার খুব একগুঁয়েমি করছে। কোন দল বা মতকে প্রাধান্য দিচ্ছে না। সরকার শুধু আজ্ঞাবহ কিছু রাজনৈতিক দলগুলো নিয়ে কাজ করছে। সরকার বিরোধী দল বিএনপিকে রাজনীতির সুযোগ দিচ্ছে না। বিরোধী দল ছাড়া সংসদ অকার্যকর, গণতন্ত্র অকার্যকর। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আমরা বলি ভোটারবিহীন নির্বাচনের প্রধানমন্ত্রী। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এরশাদ সাহেব সরকারের বিশেষ দূত। আবার এরশাদের দলের কয়জন মন্ত্রী সরকারের রয়েছেন। বিরোধী দল বলে আবার সরকারের সঙ্গেও আছে। এমন বিরোধী দল আমরা জীবনে দেখিনি।

আজ সারাবেলা: আওয়ামী লীগ বারবার বলছে ক্ষমতাসীন সরকারের অধীনে নির্বাচন হবে এবং সকল দল অংশগ্রহণ করবে। বিএনপি, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে কি?

আবুল কালাম আজাদ সিদ্দিকী : প্রশাসনের শক্তি প্রয়োগ করে, নিজেরাই ভোট দেখিয়ে নির্বাচিত সরকারের তকমা ব্যবহার করেছে আওয়ামী লীগ। যেমন আমার যে সংসদীয় এলাকা সেখানে যিনি বর্তমানে এমপি তিনি কিন্তু সরাসরি নির্বাচিত হননি। নির্বাচনে তার কোন প্রতিদ্ব›দ্বী ছিল না। একতরফা নির্বাচন হয়েছে। গণতন্ত্রের স্বার্থে আমরা বলতে চাচ্ছি যা হবার তা হয়ে গেছে। এবার আসুন সকল দলের অংশগ্রহণে নিরপেক্ষ নির্বাচনের দিকে আমরা এগিয়ে যাই। নির্বাচনী খেলায় শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকবেন, হেলিকপ্টারে চড়ে ভোট চেয়ে বেড়াবেন আর বেগম খালেদা জিয়া কোর্টের বারান্দায় গিয়ে ঘুরবেন সেটা তো হয় না। এই পার্থক্য দূর করতে হবে। নির্বাচনকে সামনে রেখে আমরা রাজনীতির সমঅধিকারটুকু চাচ্ছি।

আপনারা খেয়াল করেছেন যে এর আগে সপ্তাহে দুদিন বেগম জিয়াকে আদালতে হাজিরা দিতে হত। এখন তিন দিন করা হয়েছে। তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, বিএনপির মত একটা বৃহৎ রাজনৈতিক দলের প্রধান, সাবেক রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমানের সহধর্মীনি, মুক্তিযুদ্ধের একজন অমর সেনানীর স্ত্রীকে মিথ্যা মামলা দিয়ে বিচারের নামে হয়রানি করা হচ্ছে। এটা খুব দুঃখজনক এবং রাজনীতির জন্য অশুভ ইঙ্গিত। খালেদা জিয়া যখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তখন কিন্তু বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনাকে মিথ্যা মামলা দিয়ে কোর্টের বারান্দায় ঘুরানো হয়নি। এই কালচারটা আমাদের সময় ছিল না। এই কালচার চালু করেছেন শেখ হাসিনা। আমরা এই কালচার থেকে বের হতে চাই। আমরা প্রতিশোধ নিতে চাই না। আমরা পরিষ্কার রাজনীতি করতে চাই। আমরাও আগামীতে পরিষ্কার রাজনীতির চর্চা করতে চাই। আমাদের নেত্রী বলেছেন ক্ষমতায় গেলে আমরা এই রাজনীতি করব না। আমরা প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে বের হয়ে আসতে চাই। আমরা প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক রাজনীতি করতে চাই।

আজ সারাবেলা: বিএনপি যে সহায়ক সরকার চাচ্ছে আসলে সেটার কাঠামোটা কেমন হবে?

আবুল কালাম আজাদ সিদ্দিকী : দেশে রাজনৈতিক ক্রান্তিকাল চলছে। দেশে গণতন্ত্র নেই বললেই চলে। এই রকম অবস্থায় আমরা সহায়ক সরকার বলতে যা বুঝাচ্ছি তা হলে নির্বাচনের জন্য সহায়ক হবে, জনগণ যার উপর আস্থা ফিরে পাবে। সেই সরকার নিরপেক্ষ থাকবে। সহায়ক সরকারের কাঠামো কেমন হবে তা দলীয় ফোরাম নির্ধারণ করবে। সেটা আমাদের নেত্রী নির্ধারণ করবেন। সহায়ক সরকারের কাঠামো তৈরি করার জন্য নেত্রী কয়েকজন নেতাকে দায়িত্ব দিয়েছেন। তারা কাজ করছেন। এই সহায়ক সরকারকে দেখার জন্য ক্ষমতাসীন সরকারের দেখার দায়িত্ব রয়েছে। সরকারের মনোভাব লক্ষ্য করা হচ্ছে। এগুলোকে সামনে নিয়ে নির্বাচনের জন্য সহায়ক হবে, সকল দলের জন্য সহায়ক হবে এমন একটি সরকারের রূপরেখা তৈরি করার জন্য কাজ চলছে।

আজ সারাবেলা: বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে বিদ্যমান যে সব মামলা রয়েছে এই মামলাগুলোর রায় যদি খালেদা জিয়ার বিপক্ষে চলে যায়, তাহলে তিনি নির্বাচনের মাঠে থাকতে পারবেন না। এক্ষেত্রে আপনাদের বিকল্প কোন চিন্তা রয়েছে কিনা?

আবুল কালাম আজাদ সিদ্দিকী: মিথ্যা মামলা দিয়ে বিএনপির মত বড় একটি রাজনৈতিক দলের নেত্রীকে নির্বাচন থেকে বিরত রাখা হবে, সেটা কেমন পরিস্থিতি তৈরি করবে সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। তখন আমরা রাজনৈতিকভাবে মাঠে নেমে এর মোকাবেলা করব। তখন নির্বাচন করব, না আন্দোলন করব সেটা পরিস্থিতির উপর নির্ভর করবে। বেগম খালেদা জিয়াকে মিথ্যা মামলা রায় দিয়ে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করা হবে আর আমরা নির্বাচন নির্বাচন খেলা খেলব সেটা হয় না। বিষয়টাকে আমরা রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করব। খালেদা জিয়া নির্বাচনে অযোগ্য হলে আন্দোলন ছাড়া কোন পথ নেই। এখন তো নির্বাচনী বিধিমালা রয়েছে যে কারো দুবছরের জেল হলে তিনি নির্বাচনে অযোগ্য হয়ে যাবেন। আমার ধারণা সরকার এমন কোন কাজ করতে সাহস পাবে না। রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি করে নির্বাচন কমিশন বলেন আর আওয়ামী লীগের কথাই বলেন তারা হয়ত নির্বাচন করবে না। এর পরেও সরকার যদি এরকম কোন কাজ করে তাহলে আমরা রাজনৈতিকভাবেই বিষয়টিকে সামাল দিব।

আজ সারাবেলা: এবার একটু আসা যাক বিএনপির তৃণমূল রাজনীতি প্রসঙ্গে। তৃণমূল বিএনপি বলুন আর কেন্দ্রীয় বিএনপি বলুন আপনাদের রাজনীতি দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এর সংবাদ সম্মেলনে সীমাবদ্ধ কেন?

আবুল কালাম আজাদ সিদ্দিকী: বিএনপি মাঠে আছে। রাজনীতির কর্মকাণ্ডগুলো কিন্তু এখন অনুমতিভিত্তিক হয়ে গেছে। আমি আজকে চাইলেই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মিটিং করতে পারব না। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড দেখাতে পারব না। ইচ্ছা করলেই মিছিল করা যাচ্ছে না। সরকারের অনুমতি লাগে। আপনারা দেখেছেন ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠন কিন্তু প্রায় প্রতিদিনই কিছু না কিছু করছে। তাদের অনুমতি প্রয়োজন হয় না। আমাদের ক্ষেত্রে চিত্রটা সম্পূর্ণ আলাদা। অনুমতি নিয়ে ঘরের ভিতর আমাদের মিটিং করতে হচ্ছে। জনগণে বেশি দেখে সরকার ভয় পাচ্ছে। বাহিরে মিছিল-মিটিং করলে যদি পরিস্থিতি নাগালের বাহিরে চলে যায়। জনগণের স্রোত কোন দিকে যায়, কি অঘটন ঘটে ইত্যাদি সার্বিক বিষয় চিন্তা করেই সরকার ভীত।

আজ সারাবেলা: ২০০১ সালে বিএনপিও ক্ষমতায় ছিল, তখন দেখেছি বিরোধী দল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের করা হয়েছিল। তারাও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এরপরও আওয়ামী লীগের ত্যাগী নেতারা মাঠে ছিলেন, আন্দোলন করেছেন। এক্ষেত্রে আপনারা ব্যতিক্রম কেন?

আবুল কালাম আজাদ সিদ্দিকী: আমাদের সময়ের রাজনীতির পরিবেশ ভিন্ন ছিল। এখনকার মত রাজনীতি তখন হিংস্র ছিল না। আমরা রাজনীতি করব, মাঠে নেমে আন্দোলন করব, পুলিশ পেটাবে, মামলা হবে, জেলে যাব এবং আবার রাজনীতির মাঠে ফিরে আসব, এগুলো হলো স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া। গুম-খুনের রাজনীতি আওয়ামী লীগ সরকারকে শিখিয়েছে। আওয়ামী লীগ রাজনীতির প্রতি মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করেছে।

আমি দেশের জন্য রাজনীতি করি, জনগণের জন্য রাজনীতি করে, দলের জন্য রাজনীতি করি। কিন্তু গুম-খুন হয়ে গেলে আমি কিভাবে রাজনীতি করব? একজন রাজনৈতিক নেতা গুম-খুন হয়ে যাবেন আর পরিবার তার লাশটুকু দেখতে পারবে না, এটি মেনে নেওয়া যায় না। আপনি জীবিত না মৃত সেটাও পরিবার-পরিজন জানতে পারবে না। সন্তানরা তার পিতার কবর খুঁজে পাবেন না, শেষ দেখা দেখতে পারবেন না। এটা কখনই রাজনীতি চিত্র হতে পারে না।

দলের আন্দোলন কর্মসূচিতে আবুল কালাম আজাদ সিদ্দিকী

আজ সারাবেলা: আপনি মাঠপর্যায়ের রাজনীতি করে আজকে বিএনপির জনপ্রিয় সাবেক সংসদ সদস্য। আপনার নির্বাচনী এলাকা টাঙ্গাইল (মির্জাপুর-৭) আসন। এই আসনে আপনার বর্তমান অবস্থানটা যদি বলেন?

আবুল কালাম আজাদ সিদ্দিকী: আমার অবস্থান আমার মুখ দিয়ে বলাটা অনেকটাই নিজের ঢোল নিজে পিটানোর মত হয়ে যায়। কিছু কথা না বললেই নয়। আমি ছোটবেলা থেকেই মিছিল মিটিং খুব পছন্দ করতাম। কোনো মিছিলের শব্দ কানে বাজলেই দৌড়ে গিয়ে যোগ দিতাম। এটা একদম ছেলেবেলার কথা বলছি। হাইস্কুল থেকেই মিছিল-মিটিং করতাম। মিছিলে স্লোগান দিতাম। বিএনপির যেকোন অনুষ্ঠানের জন্য আমি এলাকায় ঘুরে ঘুরে মাইকিং করতাম। দেওয়ালে পোস্টার মারতাম, দেওয়াল লিখনে অংশগ্রহণ করতাম। এভাবেই স্থানীয় নেতাদের নজরে চলে আসলাম। এরপরে যখন বড় হতে লাগলাম। জ্ঞানের পরিধি বাড়তে লাগল। তখন সিদ্ধান্ত নিলাম আমি মানুষের জন্য কাজ করব। জনগণের সেবা করব। মানুষ ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হতে চায়। আমি কিন্তু মনে-প্রাণে রাজনীতির মানুষই হতে চেয়েছিলাম। ছোটবেলা থেকেই জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল যে আমি গণমানুষের নেতা হব।

কলেজে পড়ার সময় মনে হল আমি ভিপি হব। একজন ভিপি দেখতে কেমন হন, তার আচার-আচরণ কেমন হয়, তার কথা কেমন হয়, তা নিজ চোখে দেখার জন্য আমি সা’দাত বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে গেলাম। ভিপির কথা শুনলাম, তার বক্তব্য শুনলাম। দেখলাম শতশত ছাত্র-ছাত্রীরা তার সঙ্গে। তিনি তাদের সমস্যাগুলো শুনছেন। সমাধানের চেষ্টা করছেন। আমি এসব দেখে খুবই অনুপ্রাণিত হলাম। আমার বিষয়টা অনেক ভাল লাগল। তখনই সিদ্ধান্ত নিলাম আমি ভিপি হব। যখন ভিপি হওয়ার জন্য কলেজে কাজকর্ম শুরু করলাম এরই মাঝে ১৯৮২ সালের সম্ভবত ২৪ মার্চ দেশে সামরিক আইন জারি করলেন এরশাদ। সব ধরনের রাজনীতি বন্ধ করে দেওয়া হলো। ডিগ্রি পাস করলে তো কলেজ থেকে বের হয়ে যাব। ছাত্রসংসদ নির্বাচন করা সম্ভব হবে না। তাই শুধুমাত্র ভিপি নির্বাচন করার জন্য আমি কলেজে থেকে গেলাম। প্রতিবছর রিএডমিশন নেই, ফর্ম ফিলাপ করি কিন্তু পরীক্ষা দেই না। দীর্ঘ সাত বছর অপেক্ষা করার পর আমি কলেজের ভিপি হলাম। আমি কলেজের ছাত্রদলের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলাম।

পরবর্তীতে স্থানীয় বিআরডিবি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হলাম দু’বার। এর পর রাজনীতির কালপরিক্রমায় বিএনপি থেকে সংসদ নির্বাচন করার মনোনয়ন পেলাম। খুব অল্প বয়সেই সংসদ নির্বাচনের মনোনয়ন পেয়েছিলাম। আমাকে স্বয়ং বেগম খালেদা জিয়া চিনতেন না। আমি ভাবতেও পারিনি যে আমাকে মনোনয়ন দেওয়া হবে। সিটিং এমপি খন্দকার বদরউদ্দিনকে বাদ দিয়ে আমাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। সত্যি বলছি বিএনপির কেন্দ্রীয় অফিসে লবিং করার কেউ ছিল না আমার। আমার কাজের জন্য, জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ততার জন্য, মাঠের রাজনীতি করে জনপ্রিয় হয়ে ওঠার জন্য আমি মূলত মনোনয়ন পেয়েছিলাম। আমি এখনও নিয়মিত এলাকাতে যাওয়া আসা করি। এখনো নিয়মিত জনগণের সঙ্গে মেলামেশা করি। আমার কাজই কিন্তু রাজনীতি করা। কেউ ব্যবসা-বাণিজ্য করে, কেউ চাকুরি করে পাশাপাশি রাজনীতি করে কিন্তু আমি পুরোদমে রাজনীতি করি। বলতে পারেন আমি একজন পেশাদার রাজনীতিবিদ। রাজনীতির মানুষ। আমি নিজেকে বিএনপির একজন কর্মী মনে করি। আমি জিয়ার আদর্শের কর্মী, বেগম খালেদা জিয়ার কর্মী, তারেক রহমানের আদর্শের কর্মী। আমার মাথায় রাজনীতি, আমার মাথায় অন্য কিছু আসবে না। আমি জায়গা-জমি বিক্রি করে নির্বাচন করেছি। আমার একমাত্র সম্পদ হলো জনগণের ভালবাসা। জনগণের ভালবাসা, তৃণমূল নেতা-কর্মীদের সমর্থন আছে বলেই আমি রাজনীতি করতে পারছি। সমর্থন যেদিন হারিয়ে যাবে সেদিন কিন্তু আমি আর রাজনীতি করতে পারব না।

আজ সারাবেলা: যদি বিএনপি নির্বাচনে আসে আর আপনি যদি মনোনয়ন পান তাহলে জয়ের ব্যাপারে কতটা আশাবাদী?

আবুল কালাম আজাদ সিদ্দিকী: সুষ্ঠু নির্বাচন হলে জয়ের ব্যাপারে আমি শতভাগ আশাবাদী। জনগণ এমপিদের কাছে যা চায় সেটা আমার কাছে পায়। যেকোন মানুষ যেকোন সময় আমার কাছে আসতে পারে। মন খুলে কথা বলতে পারে। আমার বিছানার পাশে বসে কথা বলতে পারে। আমার কাছে আসার জন্য কারো সহযোগিতা নিতে হয় না। লোক ধরতে হয় না। আমি শতভাগ জনবান্ধব নেতা। যাদের জন্য রাজনীতি করি তাদের জন্য আমার বাড়ির দরজা সব সময় খোলা। দলের সাংসদ হলেও আমি ছিলাম সকলেরই। নির্বাচনী এলাকায় সেবার ক্ষেত্রে আমি বিএনপি, আওয়ামী লীগ ইত্যাদি পার্থক্যে বিশ্বাসী না।

আজ সারাবেলা: আপনি নির্বাচিত হলে কিভাবে জনগণের সেবা করবেন?

আবুল কালাম আজাদ সিদ্দিকী: সেবা করার শেষ নেই। প্রতিটা এলাকার প্রধান প্রধান কিছু সমস্যা থাকে। যে সমস্যাগুলো সার্বজনীন সেই কাজগুলোকে গুরুত্ব দিব বেশি। আমার এলাকায় অনেকাংশে পাহাড়। পাহাড়ি এলাকায় আমি একটি হাসপাতাল তৈরি করতে চাই। সেখান থেকে সদর হাসপাতালে আসতে সময় লাগে। এলাকায় কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা আছে। বেকারত্ব দূর করার জন্য চেষ্টা করব। এলাকার বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ইচ্ছা করলেই পাঁচ হাজার মানুষের কাজের ব্যবস্থা করা যাবে। শিল্প কারখানায় কাজের সুযোগ তৈরি করার চেষ্টা করা যেতে পারে। যুব সমাজকে সঠিক পথে পরিচালনার জন্য একাধিক কর্মসূচিও গ্রহণ করা যেতে পারে।

আজ সারাবেলা: নির্বাচনকালীন নেতা আর নির্বাচন পরবর্তীতে নেতাদের প্রায় কার্যক্রম উল্টো হয়। এক্ষেত্রে আপনার মতামত কি?

আবুল কালাম আজাদ সিদ্দিকী: আমি তৃণমূলের রাজনীতি করেই সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছি। মনোনয়ন দেওয়ার আগ পর্যন্ত আমাকে আমার নেত্রী চিনতেন না। আমি মির্জাপুরের স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। নির্বাচনকালীন সময়ে স্থানীয়ভাবে কিছু তথ্য নেত্রীর কানে গিয়েছিল যে আবুল কালাম আজাদ তরুণ নেতা, জনগণের প্রিয় নেতা, মনোনয়ন পেলে নির্বাচনে জয়ী হবেন ইত্যাদি ইত্যাদি। আমার জন্য সুপারিশ করার মত কেউ ছিল না। মনোনয়ন পাওয়ার একটি মাত্র কারণ ছিল যে আমি এলাকায় রাজনীতি করি। স্থানীয় জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ততা ভাল ছিল। মানুষ আমাকে ভাল জানে। আমাকে চেনে। সেকারণেই কিন্তু আমাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল। আমি কালাম, নির্বাচনের পূর্বে যেমন আছি নির্বাচন করে যদি সংসদ সদস্য হই, আমি একই থাকব। কারণ আমার স্বভাবটাই এভাবে তৈরি হয়েছে। আমি নিজেকে এভাবেই গড়ে তুলেছি। আমি নিজেকে পাল্টাতে পারব না তো। মন্ত্রী হলেও আমি নিজেকে পাল্টাতে পারব না। মন্ত্রী হলে কি হবে যে প্রোটোকল থাকবে তার বাহিরে কিন্তু আমি কালাম জনগণেরই নেতা হয়ে থাকব। আমি এখনও নিজ এলাকায় বাজারে যাই। জনগণের সঙ্গে কথা বলি, তাদের খোঁজ-খবর নেই। এলাকাতে থাকতে বেশি স্বাচ্ছন্দবোধ করি। এলাকার বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকি।

আমি সাধারণ জীবন যাপনে অভ্যস্থ। মাটিতে বসে খেতে ভালবাসি। আমার নেতা-কর্মীরা যেখানে বসে খাবে আমিও সেখানে বসতে চাই। আমি জনগণকে সঙ্গে নিয়ে এক কাতারে বসতে চাই। আমার বাপ-দাদা রাজনীতি করতেন না। আমি উত্তরাধিকার সূত্রে রাজনীতিতে আসিনি। কঠোর পরিশ্রম ও সাধনা করে মাঠ পর্যায়ের রাজনীতি করে আজকের কালাম আজাদ হয়েছে। জনগণের প্রিয় সাংসদ হতে পেরেছি। কাজেই এই রাজনীতির জন্য আমার রয়েছে অগাধ ভালবাসা ও নিবেদন। আমার রাজনৈতিক চরিত্রের সঙ্গে অনেক রাজনীতিকের চরিত্রের মিল পাবেন না। দেখুন, সাংসদ হলেও সকলের মন রক্ষা করে চলাটা সব সময় সম্ভব হয় না। কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকে। সব মিলিয়েই রাজনীতি এগিয়ে যায়। রাজনীতি করতে যেসব মৌলিক গুণাবলী থাকা দরকার সেগুলো আমি বজায় রাখার চেষ্টা করি।

আজ সারাবেলা: আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ আবুল কালাম আজাদ সিদ্দিকী।

আবুল কালাম আজাদ সিদ্দিকী: আজ সারাবেলা’কেও ধন্যবাদ।