ভাল-পুলিশ-ও-ভাল-মানুষ-জীবন । ajsarabela.com
তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার বিপ্লব সরকার। ছবি: সোহেল রানা রিপন

‘আজসারাবেলা’র বিশেষ সাক্ষাৎকার
ভালো পুলিশ ও ভালো মানুষ জীবনে দুটোই হতে চেয়েছি: বিপ্লব সরকার

প্রকাশিত :০৯.০১.২০১৮, ৬:৫৩ অপরাহ্ণ
  • বিপ্লব সরকার। মেধাবী, পরিশ্রমী। নিজের ‘সৎ মানুষ, ভাল মানুষ’ ইমেজের মধ্য দিয়ে পুলিশ বিভাগের ইমেজকেই দীপ্তমান করে চলেছেন প্রতিনিয়ত। নৈতিকতা ও পেশাদারিত্বের দারুণ যুগলবন্দি তিনি। পেয়েছেন বিপিএম, পিপিএম পদকও।

কথা বলেছেন পুলিশের ভেতর-বাহির নিয়ে, নিজেকে মেলে ধরতেও বাকি রাখেননি ‘আজ সারাবেলা’র কাছে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জববার হোসেন

আজ সারাবেলা: বাংলাদেশ পুলিশের সবচেয়ে গৌরবোজ্জল দিক কোনটি বলে আপনি মনে করেন?

বিপ্লব সরকার: বাঙালি জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন মুক্তিযুদ্ধ। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর ডাকে ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে পুলিশের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিঃসন্দেহে সবচেয়ে বড় অর্জন। ২৫শে মার্চ কালো রাত্রিতে রাত ১২টার পর পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রথম বুলেটটি ছোড়া হয় এই রাজারবাগ থেকেই। রাজারবাগ পুলিশ লাইনের বীর পুলিশ সদস্যরা সেদিন প্রথম প্রতিরোধটি গড়ে তোলেন। আমাদের অনেক বীর পুলিশ সদস্য সেদিন নিহত হয়ে ছিলেন। এটি আমাদের পুলিশ বাহিনীর জন্য সবচেয়ে গৌরবের জায়গা, আলোকময় দিক।

আজ সারাবেলা: কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত যে বাংলাদেশ পুলিশ, সেই প্রতিষ্ঠান তার ইমেজ ব্র্যান্ডিংয়ের ক্ষেত্রে এই অর্জনকে কতটা কাজে লাগাতে পেরেছে? কিংবা যতটা কাজে লাগানোর কথা ততটা পেরেছি কি?

বিপ্লব সরকার: ইমেজ একটি চলমান প্রক্রিয়া, কর্মের ধারাবাহিকতায় ইমেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে যে পদকটি আমরা পেয়েছি দীর্ঘদিন পরে, এটা এক ধরনের সম্মান, স্বীকৃতি। এগিয়ে চলার জন্য, মনোবল বৃদ্ধির জন্য, আরও অনুপ্রেরণা দেওয়ার জন্য এটা এক ধরনের পুরস্কার। কিন্তু শেষ কথা নয়।

প্রতিদিনের কাজ, সার্বিক কাজের মধ্য দিয়ে যেন মানুষের মনে ইমেজ তৈরি হয় সেভাবে কাজ করতে হবে। আমরা প্রতিনিয়ত সেই চেষ্টাই করছি।

আজ সারাবেলা: ইমেজের জায়গায় আরেকটু যোগ করি। ‘পুলিশের ইমেজ’ কোড আনকোড একটি বিশেষ টার্ম হয়ে গেছে। অনেক ভাল কাজ দৃশ্যমান হওয়ার পরও মনস্তাত্তি¡কভাবে কোথায় যেন লোকের কাছে পুলিশের ইমেজ, একটা ‘প্রশ্নবোধক’ ব্যাপার। প্রথমে জানতে চাইব, এই ধারণাগত বা মনস্তাত্তি¡ক ব্যাপারটি রয়ে গেছে কেন? দ্বিতীয়ত, এই জায়গাটি থেকে পুলিশ নিজেও বেরিয়ে আসতে কখনও কখনও কেন অনেকটাই ব্যর্থ?

বিপ্লব সরকার: আপনি যে কোড আনকোড ‘পুলিশের ইমেজ’ শব্দটি ব্যবহার করলেন, লক্ষ্য করলে দেখবেন, শুধুমাত্র ব্রিটেন ছাড়া উন্নত বিশ্ব, উন্নয়নশীল বিশ্ব এবং এলডিসিভুক্ত দেশের কোথাও মানুষের প্রত্যাশার সঙ্গে একেবারেই সাযুজ্যপূর্ণ অবস্থায় পুলিশ রয়েছে বলে আমি মনে করি না।

প্রত্যেক দেশে ভিন্ন ভিন্ন কারণে পুলিশকে মানুষ এক ধরনের সন্দেহের চোখে দেখে। কিন্তু এই দেখাটা সবসময় পুরোপুরি সঠিক বা সত্য নয়। এমন কি যারা পুলিশের সংস্পর্শে কোন দিন আসেনি, তারাও পুলিশকে নেতিবাচক জানে। আপনি নিজেও ‘ধারণাগত’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। আমি সবসময় বলি এটা একটা পারসেপশন।

আজ সারাবেলা: ‘পারসেপশন’- এই বাস্তবটা মেনে নিয়েও কখনও কখনও দেখা যায়, পুলিশ নানাভাবে হয়রানি করে। মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো, অর্থের বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়া, চেকপোস্টে হয়রানি, কোথাও কোথাও পকেটে ইয়াবা ঢুকিয়ে দেওয়া- এই চিত্রগুলো তো এক ধরনের বাস্তবতা বহন করে।

বিপ্লব সরকার: যে নেতিবাচক বিষয়গুলো আপনি বললেন, আমি সেগুলো অস্বীকার করব না। এই ধরনের অভিযোগ আমাদের কাছে প্রায় সময় আসে। এবং আমরা যখনই অভিযোগ পাই তার বিরুদ্ধে চ‚ড়ান্ত আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এ ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা। কোন সামগ্রিক চিত্র নয়। কোন পুুলিশ যখন অপরাধ করে বা মানুষকে ভোগান্তির শিকার করে, নৈতিকভাবে সে তখন আর ‘পুলিশ’ থাকে না।

বিগত ১০ বছর যাবত পুলিশ বাহিনীকে অফিসার বেইজড করার জন্য প্রাণন্তকর প্রচেষ্টা সরকার ও পুলিশ বাহিনীর মধ্যে চলমান রয়েছে। যার ধারাবাহিকতায় এখন ক্যাডার সংখ্যা প্রায় দ্বিগুন হয়েছে। ১০ বছর আগে ক্যাডার ছিল ১২শ থেকে ১৩শ, এখন ২৯শ প্লাস। পুলিশ বাহিনীতে আরও বেশি স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা আনার জন্য একটি অফিসার বেইজড বাহিনীতে পরিণত করার ধারাবাহিক প্রচেষ্টা চলছে। যার কারণে পুলিশ সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা আগের চেয়ে কিছুটা হলেও আমরা উন্নত করতে পেরেছি।

আজ সারাবেলা: আরেকটি বিষয় লক্ষ্যযোগ্য, বেতন ভাতা- সুযোগ সুবিধা বাড়ানোর পরও কখনও কখনও পুলিশ সদস্য বা কর্মকর্তা নিজেই সরাসরি অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ছেন। আপনার কাছে এর দর্শনগত জায়গাটির বিশ্লেষণ জানতে চাইব?

বিপ্লব সরকার: আমার কাছে দর্শনগত জায়গাটি হলো, ব্যক্তির দুর্নিবার লোভ ও ভোগবাদিতা। নৈতিকতার প্রশ্ন এটি। লোভের চোরাবালিতে সমাজ নিমজ্জমান। শুধু পুলিশ কেন, যে কোন চাকরিতে ঢুকেই একজন মনে করে কালই সে একটি ফ্লাটের মালিক হবে। তার দুইটি গাড়ি থাকতে হবে। তাকে অনেক বেশি বিলাশবহুল জীবনযাপন করতে হবে। সে তখন ভোগ ও লোভের মোহে পড়ে যায়। ন্যায় অন্যায় শব্দ দুটোর মধ্যে আর পার্থক্য করতে পারে না।

চাকরির বেতন ভাতা, সুযোগ সুবিধা জেনেই লোকে চাকরিতে আসে। প্রত্যেকেই তার নিজের যোগ্যতা সম্পর্কে জানে। সরকারি চাকরিতে আগের চেয়ে বেতন কাঠামো অনেক উন্নত হয়েছে। অসততার সঙ্গে নৈতিকতার-অনৈতিকতার সম্পর্ক। বেতন কম তাই দুর্নীতি করব, এটা কোন যুক্তি নয়। অনেক উচ্চবিত্ত লোকের মধ্যেও অসততার চর্চা দেখা যায়। এটি তার চারিত্রিক দুর্বলতা।

ভোগবাদি সমাজ ব্যক্তিকে আরও আরও বেশি লোভী হতে উৎসাহী করে, ভোগবাদি করে। এখানে মানুষের চেয়ে তার গাড়ি অনেক বড়। ব্যক্তির চেয়ে তার চেয়ার অনেক বড়। সে একটা লোভের জগতে, ভোগের জগতে বাস করতে চায়।

আজ সারাবেলা: এমন সব বাস্তবতার মধ্যে থেকেও আপনি ‘বিপ্লব সরকার’ নিজেকে আলাদা করেছেন কিভাবে? কিভাবে স্বতন্ত্র করেছেন নিজের ‘ব্র্যান্ড পুলিশ’ ইমেজ দ্বার করাতে? আপনাকে বলা হচ্ছে ‘হিরো’, যা অনেকের কাছে ঈর্ষণীয়।

বিপ্লব সরকার: এখানে হিরো হওয়ার কোন বিষয় নেই, বিষয় হলো দায়িত্ববোধ। ইতিবাচক চরিত্র কখন দাঁড়ায়? মানুষ যখন তার উপর অর্পিত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করে তখন এক ধরনের ছবি দাঁড়িয়ে যায়। আর যদি তা যথাযথভাবে পালন না করে তাহলে অন্য এক চিত্র এসে দাঁড়ায়।

আমি খুব সাধারণ মানুষ। ব্যক্তিগতভাবে যে বিশেষ কিছু করেছি তা নয়। দেশ, সমাজ, জনগণের সেবার প্রতি যে শপথ নিয়ে এই বাহিনীতে আমি যোগদান করেছি, তা বরাবরই রক্ষা করার শতভাগ চেষ্টা করেছি।

তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার বিপ্লব সরকার। ছবি: সোহেল রানা রিপন

অসংখ্য লোক আসে, যাদের আমি কোন ধরনের সমস্যার সমাধান দিতে পারি না। কিন্তু যেটা করতে পারি, তার সমস্যাটা অন্তত আন্তরিকতা নিয়ে শুনতে পারি। মানুষ যখন পুলিশের কাছে আসে, তখন আমাকে ধরে নিতে হবে তার আসলে যাওয়ার মত আর কোন জায়গা নেই। তার সেই বেদনার জায়গা, দুঃখের জায়গা, ক্ষতের জায়গাতে আমি কিছু না পারি, অন্তত সহমর্মিতাটুকুতো প্রকাশ করতে পারি।

আজ সারাবেলা: ভালো পুলিশ আর মন্দ পুলিশ দুই-ই আছে। ভাল পুলিশ হওয়ার জন্য কোনটি বেশি প্রয়োজনীয়?

বিপ্লব সরকার: ভাল পুলিশ হওয়ার জন্য অবশ্যই ভাল কাজ করতে হবে। নৈতিকভাবে সৎ মানুষ হতে হবে। বঙ্গবন্ধু একটা কথা বলেছিলেন, সোনার বাংলা গড়তে হলে, সোনার মানুষ চাই।

ভাল পুলিশ ও ভাল মানুষ হওয়ার মধ্যে কোন বিরোধ নেই। জীবনে ভাল মানুষ হওয়াটা বেশি জরুরি। ভাল পুলিশ ও ভাল মানুষ জীবনে দুটোই হতে চেয়েছি। একজন ভাল মানুষ সে পুলিশেই থাকুক অথবা অন্য যে কোন পেশায় থাকুক, সে সব জায়গাই ভাল।

এই গবির দেশে আমার মত লক্ষ লক্ষ বিপ্লব সরকার রয়েছে। বিশ্ব বিদ্যালয় আমাকে উচ্চশিক্ষার সুযোগ দিয়েছে। সরকার আমাকে গাড়ি, ডাইভার, বডিগার্ড দিয়েছে। আমার মত সামান্য বিপ্লব সরকারের পিছনে এ রাষ্ট্রের অনেক ইনভেস্টমেন্ট। এই রাষ্ট্রের সেবায় আমার তো সবটুকুই দেওয়া উচিত।

আমি মনে করি প্রত্যেকে যদি এই জায়গা থেকে বিবেচনা করে, সে মানুষ হিসেবে স্বার্থক হতে পারবে।

আজ সারাবেলা: প্রসঙ্গ পাল্টাই। সার্ভিসের বিষয়ে আসি। নারী নির্যাতন সেল, প্রবাসী কল্যাণ সেল- এমন অনেক নতুন নতুন সেল খোলা হচ্ছে। কিন্তু সার্ভিস নিশ্চিত হচ্ছে কতটুকু?

বিপ্লব সরকার: এক সময় আমরা বলতাম পুলিশ বাহিনী। শুধু চাকরি মনে করতাম। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে এখন চাকরি বলি না, সার্ভিস বলে থাকি। বাংলাদেশ পুলিশ একটি সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠান। মুখে বললেই সেবাধর্মী হয়ে যাবে না, কর্মকান্ডে প্রতিফলন থাকতে হবে। এই প্রতিফলনের জন্য আমরা বেছে নিয়েছি সমাজে যারা সবচেয়ে বেশি অবহেলিত ও নির্যাতিত, নারী ও শিশুরা। এখন প্রত্যেক থানায় একটি নারী ও শিশু সেল রয়েছে। আমি বলছি না এই সেলের মধ্যে দিয়ে বিপ্লবিক পরিবর্তন চলে আসবে। কিন্তু কোথাও না কোথাও থেকে তো বিপ্লবের সূচনা করতে হবে।

জনবলের অভাবে সবকটা সেলে নারী অফিসার পদায়ন করা সম্ভব হয়নি। তারপরও আমরা সংবেদনশীল। যেখানে সম্ভব হচ্ছে নারী অফিসার দিচ্ছি আর যেখানে পারছি না, সেখানে নারীদের প্রতি সংবেদনশীল পুরুষ অফিসার পদায়ন করছি। মানুষ এসে যেন একটা আস্থার পরিবেশ পায়। তাদের যদি অন্তত সুবিচার দিতে পারি তাহলে বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতন একটু হলেও কমে আসবে।

আজ সারাবেলা: শোনা যায়, পুলিশের লোকবল কম। সেক্ষেত্রে অনেক বেশি সার্ভিস সেল বা অন্য অ্যাক্টিভেশনের মধ্যে থাকলে পুলিশের যে মৌলিক কাজ আসামি গ্রেপ্তার, তদন্ত, অপরাধ দমন- এই কাজগুলো বাধাগ্রস্ত হবে বলে কি মনে করেন না আপনি?

বিপ্লব সরকার: বাধাগ্রস্ত হবে না, যদি তাকে ইক্যুপ্ট করা হয়। শুধুমাত্র লজিস্টিক সাপোর্ট না, লিগ্যাল যে সাপোর্ট সেগুলোও আমাকে দিতে হবে। তখন আরও অনেক কাজ করা সম্ভব।

পুলিশের মূল কাজ হলো অপরাধ নির্ণয়, অপরাধ প্রতিরোধ, অপরাধ উদঘাটন ও অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা। যেটাকে আমরা বলি প্রিভেনশন অব ক্রাইম।
পুলিশের কাছে মানুষের প্রত্যাশা অসীম। মানুষ ব্যক্তিগত সম্পর্ক, জমিজমা এমন হেন বিষয় নেই যা নিয়ে পুলিশের কাছে না আসে। অনেক ক্ষেত্রেই আমাদের নির্ধারিত কর্মপরিসরের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। আমরা সকল প্রত্যাশার সমাধান দিতে পারি না। একটা পথ বাতলে দিতে পারি যে, এই রাস্তায় আপনি হাঁটেন।

কাজে বিশ্বাসী আমি। সরাসরি পদার্থবিদ্যায় কাজের যেমন সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে তেমন। আগে গামের্ন্টস ইন্ডাট্রি এলাকায় অনেক সহিংসতার ঘটনা ঘটতো। শিল্প পুলিশ আসার পর সেটা কমে এসেছে। ট্যুরিস্ট পুলিশ তাদের মত করে কাজ করছে।

নতুন সংগঠন পিবিআই (পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন) বিজ্ঞ আদালতের কাছে গ্রহণযোগ্য মাত্রা পেয়েছে। যে মামলা অন্য কেউ তদন্ত করতে পারে না, সে মামলাগুলো আদালত পিবিআইকে দিচ্ছে। নতুন ইউনিটগুলো ভাল কাজ করছে।

আজ সারাবেলা: স্পেশালাইজড বিভাগের কথা বললেন। কিন্তু স্পেশাল ট্রেনিং বা স্পেশালাইজেশন কতটা ঘটছে, সে প্রশ্নটি কিন্তু থেকেই যাচ্ছে?

বিপ্লব সরকার: আমি সেটা অস্বীকার করব না। আমাদের নানাবিধ সীমাবদ্ধতা রয়েছে। একটি উদাহরণ দেই। সারদায় বিভিন্ন ধরনের ট্রেনিং করেছি। কিন্তু জঙ্গি দমন নিয়ে কোন প্রশিক্ষণ ছিল না আমাদের। যখন বাংলাদেশে জঙ্গিপনার উপদ্রব দেখা দিল, প্রথম দিকে মনে হতো কি করব, কিভাবে গোপন শত্রুর সঙ্গে যুদ্ধ করব? খুব অল্প সময়ের মধ্যে আমরা কিন্তু নিজেদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে গুনগত পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছি।

আমাদের কিছু অফিসারকে ট্রেনিং দেওয়া হয়। তারা অন্তত ভাল কাজ করার কারণে এক বছরের মধ্যেই আপনি দেখতে পারবেন জঙ্গি নির্মূল করতে না পারলেও কার্যত দমন করতে সক্ষম হয়েছি।

আমি অবশ্যই বলব ট্রেনিং অন্তত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এবং ইক্যুপমেন্টও। ১ কোটি টাকার একটি ডিভাইস দিতে পারব কিন্তু সেটি যদি ব্যবহার করা না যায়, এটি জড় পদার্থের মত পড়ে থাকবে। তাই পুলিশ বাহিনীতে ইক্যুপমেন্টের প্রয়োজনীয়তাকে আমরা উপলব্ধি করেছি, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষও করছে। সর্বোচ্চ ট্রেনিং নেওয়ার জন্য দেশের বাইরে বিভিন্ন জায়গায় পাঠানো হচ্ছে আবার দেশের বাইরে থেকে এক্সপার্টদের এনে আমাদের সমৃদ্ধ করা হচ্ছে।

এখন স্পেশালাইজেশনের যুগ। কেউ যদি ট্যুরিস্ট পুলিশে যোগ দিতে চায় সে ট্যুরিস্ট পুলিশের সার্কুলারটাই ফলো করবে যোগদান করার জন্য। ট্যুরিস্ট পুলিশই হবে তার ক্যারিয়ার। কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে সেটা হচ্ছে না। আজকে ট্যুরিস্ট পুলিশে, কালকে শিল্প পুলিশে, পরশু আমি কাউন্টার টেররিজম-এ। এভাবে হচ্ছে। আমি মনে করি, দেশ যখন আরও এগিয়ে যাবে, যারা শিল্প পুলিশ তারা শিল্প পুলিশই থাকবে। ক্যাম্পাস পুলিশে যারা, তারা ক্যাম্পাস পুলিশই থাকবে।

রেলওয়ে পুলিশে যারা, তারা রেলওয়ে পুলিশেই থাকবে। তাহলে আপনি দিনে দিনে আপনার এক্সপার্টিজম বাস্তবে কাজে লাগাতে পারবেন। এটার জন্য একটা সামগ্রিক পরিকল্পনা ও পরিবর্তন দরকার।

আজ সারাবেলা: পুলিশের পদোন্নতি বিষয়ে আসি। প্রশাসনিক ক্যাডারদের ক্ষেত্রে সুপার নিওমরি প্রক্রিয়ায় ভ্যাকেন্ট না থাকার পরও পদোন্নতি দিয়ে দেওয়া হয়। মনে করা হয়, পদোন্নতি তার বাসনা ও অধিকার। কিন্তু পুলিশে সে সুযোগ নেই। এক যুগ চাকরি করেও পুুলিশ ক্যাডারের অনেকে পুলিশ সুপার হতে পারছে না।

বিপ্লব সরকার: পুলিশের ক্ষেত্রে এ সুযোগ একেবারেই নেই। এটা আমাদের দীর্ঘ দিনের দাবি। পুলিশ সপ্তাহে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, জননেত্রী শেখ হাসিনার কাছে বিনয়ের সহিত আমাদের অনেকগুলো দাবি পেশ করতে যাচ্ছি, যার মধ্যে পুলিশের জন্য সুপার নিওমরি অন্যতম। কারো সঙ্গে তুলনা করছি না, তবে আমি বলব, এটা পাওয়া উচিত। দীর্ঘদিন যাবত একজন অফিসার যদি একই র‌্যাঙ্কে থেকে যায় তাহলে তার কাজের উৎসাহে ভাটা পড়বে।

২০/২২ বছর চাকরি করার পরও যদি কেউ ঊর্ধ্বতন পদে যেতে না পারে তখন তার মধ্যে এক ধরনের হতাশা কাজ করবে। আর হতাশাগ্রস্ত ব্যক্তি নিজেকে, সমাজকে, দেশকে কিছুই দিতে পারবে না। তাই বারবার দাবি করছি, আমাদের অসংখ্য অফিসার রয়েছে, যাদেরকে সুপার নিওমরি করে ঊর্ধ্বতন পদে দিলে বেতনের এক টাকাও নতুন করে দিতে হবে না বা প্রয়োজন নেই।

পুলিশে যে বিনিয়োগ এর ফল সরাসরি পাবে দেশ ও জনগণ। কাজেই পুলিশ অফিসারদের মনোবল বৃদ্ধির জন্য, তাদের কর্ম দক্ষতা বাড়ানোর জন্য অসংখ্য সুপার নিওমরি পদ সৃজন করা এখন সময়ের দাবি।

আজ সারাবেলা: তাহলে চাকরির ক্ষেত্রে পুলিশের ‘ইন্ডিপেন্ডেন্ট’ বিধিমালার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছেন?

বিপ্লব সরকার: পুলিশকে আরও কর্মক্ষম করতে হলে আইনি সংস্কারের ব্যাপক প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। এখানে ‘ইন্ডিপেডেন্ট’ মানে ভিন্ন অর্থ মনে হতে পারে। পুলিশ কি রাষ্ট্র থেকে আলাদা হয়ে গেল কি না? পুলিশ কি একেবারে সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেল কি না?

এধরনের প্রশ্ন বিভিন্ন কর্নার থেকে উঠতে পারে। স্পষ্টভাবে বলতে চাই, আমরা দেশ, জাতি, সরকারের প্রতি অন্তত অনুগত একটি বাহিনী। বাহিনীতে থেকেই সরকারের নিয়ম আইন-কানুন সব কিছু মেনে সরকারের নিয়ন্ত্রণে থেকেই পুলিশ বর্তমান যে আইন দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে, সেই আইনগুলি কিছুটা সময়ের কারণে, যুগের বাস্তবতায়, কিছুটা পরিবর্তন, পরিমার্জন অতীব প্রয়োজন। কারণ তাতে আমাদের কার্যক্রমে আরও বেশি গতিশীলতা আসবে। যার ফলটা ভোগ করবে সরাসরি রাষ্ট্র ও জনগণ।

তাই আমি মনে করি, অবশ্যই এটা পরিবর্তন হওয়া প্রয়োজন।

আজ সারাবেলা: শেষ করবো, রাজারবাগ পুলিশ লাইনে ব্যারাকে থাকা সেই সব সাধারণ পুলিশ সদস্যদের কথা জানতে চেয়ে। যারা আসলে খুব বেশি বিশ্রামেরও সুযোগ পায় না। যাদের তেমন কোন বিনোদন নেই, এখনও লাইন ধরে যাদের টয়লেটে যেতে হয়। একটা ট্র্যাংক আর এক চিলতে চৌকিই যাদের জীবন। আপনি বিপ্লব সরকার সেই সব সাধারণ পুলিশ সদস্যদের কথা ভাবেন কখনও, ভাবলে কি ভাবেন?

বিপ্লব সরকার: এই যে আমার কনস্টেবল ভাইয়েরা, তারাই পুলিশের মূল শক্তি। শত সীমাবদ্ধতা সত্তে¡ও যারা অসাধারণ ভালো কাজ করছে। হয়তো ২/১ জনের বিচ্যুতির ঘটনা শোনা যেতে পারে, কিন্তু তা বিচ্ছিন্ন। নিয়মিত চিত্রটি হলো ১৬/১৭ ঘণ্টা তারা ডিউটি করেন দায়িত্ব, ভালোবাসা আর সততা নিয়ে। শত প্রতিক‚লতাকে তারা মানিয়ে নিয়ে দেশ আর জনগণের জন্য কাজ করেন।কি পেল কি পেল না, কি পাবে কি পাবে না এসব তারা ভাবেন না।

সত্যিই অভূতপূর্ব। আমি তাদের স্যালুট করি। হ্যাটস অফ টু দেম।

-আজসারাবেলা/সংবাদ/রবি/সাক্ষাৎকার/জাতীয়/পুলিশ/সপ্তাহ/উপ-পুলিশ/কমিশনার/তেজগাঁও/বিভাগ