চিন্তাশীল নয় এমন ফেসবুক ফ্রেন্ডদের আমি আনফ্রেন্ড করি: আলী যাকের - Aj SaraBela (আজ সারাবেলা)
আলী যাকের

চিন্তাশীল নয় এমন ফেসবুক ফ্রেন্ডদের আমি আনফ্রেন্ড করি: আলী যাকের

প্রকাশিত :২৪.০১.২০১৮, ৪:৩১ অপরাহ্ণ

আলী যাকের, বিদগ্ধজন, আলোকিত মানুষ। সমকালীন রাজনীতি ও সমাজ নিয়ে তার পর্যবেক্ষণ তীক্ষ্ণ। এখনও যুক্ত রয়েছেন অনেক সামাজিক আন্দোলনের সঙ্গে। এক সময় নাটকের মঞ্চে দাঁড়িয়েছিলেন ইতিবাচক সামাজিক পরিবর্তনের আকাঙ্খা নিয়ে। সমাজ ও রাজনীতি নিয়ে কথা বলেছেন আজ সারাবেলা’র সঙ্গে।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জববার হোসেন রবিউল ইসলাম রবি

আজ সারাবেলা: আপনি বা আপনার প্রজন্মের অনেকে মুক্তিযুদ্ধে অংশে নিয়েছেন শুধুমাত্র একটি দেশ নয়, অসাম্প্রদায়িক একটি চেতনাকে ধারণ করে। সেই জায়গা থেকে আমাদের অর্জন কতটুকু? এখনও আমরা সাম্প্রদায়িক সংঘাত দেখতে পাই। রাজনৈতিকভাবে আওয়ামী লীগ বিএনপিকে, বিএনপি আওয়ামী লীগকে দোষ দেয় সাম্প্রদায়িকতা উস্কে দেওয়ার ক্ষেত্রে। এই সংস্কৃতি থেকে কেন বের হতে পারিনি আমরা?

আলী যাকের: আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম সেটার যে মূল্যবোধ, সেই দিকে এগোবার যে পথ, সেই পথতো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল ১৯৭৫ সালে। সাড়ে তিন বছরের মাথায় বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধটাকে ভুলণ্ঠিত করা হয়। কারা ক্ষমতাটাকে নিল? দিনের আলো মতো স্পষ্ট যে, পাকিস্তানিদের প্ররোচনায় পাকিস্তানপন্থি কিছু সামরিক অফিসার যাদের মধ্যে অনেকে এখনও পাকিস্তানে আছে, এই মুহূর্তেও আছে। ওইখানে আশ্রয় পেয়েছে। তাদের পুরধা ব্যক্তি ছিল জিয়াউর রহমান। যে নাকি এখানে থেকে পাকিস্তানিদের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতে চেয়েছিল। ২১ বছর মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধকে, অসম্প্রদায়িক চেতনাকে ধারে কাছে ঘেষতে দেওয়া হয়নি। গোলাম আযমকে, জামায়াতকে কে পুনর্বাসিত করেছে তা সবাই জানে। আমরা কি কোনো কথা বলতে পেরেছি সেই সময়, না পারিনি। বুট আর বুলেটের ভয়ে মানুষের দিন কেটেছে।

৯৬ সালে মুক্তিযুদ্ধের সরকার আবার ক্ষমতায় আসে। ২১ বছরে যে তরুণ বা যুবকটি বেড়ে উঠেছে, সে তো বঙ্গবন্ধুর নাম জানে না। তাকে তো সঠিক ইতিহাস জানতে দেওয়া হয়নি। জিয়াউর রহমান, এরশাদ সবাই পাকিস্তানপন্থি ছিল। ফলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, অসম্প্রদায়িকতার চেতনার বিপরীতেই দেশটা হেটেছে। এখনও এর ফল ভোগ করতে হচ্ছে আমাদের।

আজ সারাবেলা: জাতীয় রাজনীতির বিষয়ে আসি। সামনে নির্বাচন, নিরপেক্ষ ও সহায়ক সরকারের দাবি বিএনপির। অন্য দিকে শেখ হাসিনার অধিনেই নির্বাচন হবে বলে আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায় থেকে বলা হচ্ছে। একটা সংঘাতের আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে বলে মনে করছেন অনেকে। আপনার কী মনে হয়?

আলী যাকের: কিছু সংকট তো হবেই। তবে এই সংকটটা মোকাবেলা করার মতো বুকে বল ভরসা রাখতে হবে সরকারের। বিএনপি তো নির্বাচনে আসবেই, আসতে তাদের হবেই। এদেশে রাজনীতি করতে হলে নির্বাচনে অংশগ্রহণ ছাড়া কোন গতি নেই। এটি ঐতিহাসিকভাবে সত্য।

আজ সারাবেলা: রাজনীতির জায়গা থেকে সরে একটু সমসাময়িক সামাজিক ঘটনায় আসি। নানাভাবে সামাজিক অস্থিরতা বেড়ে যাচ্ছে। ধর্ষণ বাড়ছে, নারী নির্যাতন বাড়ছে, শিশু নির্যাতন বাড়ছে। এই অস্থিরতাগুলো কেন? আপনার ব্যাখ্যা কী?

আলী যাকের: কথা হচ্ছে, আসলে বেড়ে যাচ্ছে কি না, না কি বেড়ে যাওয়ার রিপোর্টটা বেড়ে যাচ্ছে। আমি সেইভাবে দেখি জিনিসটা। আমার ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরের একটি ছোট্ট ঘটনা ঘটবার সঙ্গে সঙ্গে এখন অনলাইনে চলে আসে। ফেসবুকে শেয়ার হয়। ফলে ঘটনা প্রকাশের মাত্রা বা হারটাও বেড়ে গেছে।

এখানে অতিরিক্ত জনসংখ্যার বৃদ্ধি একটা ফেক্টর। মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়ছে। অর্থনৈতিক উন্নতি যতই ঘটবে এ ধরনের অসামাজিক আচরণের মাত্রা তত কমবে। ইংরেজিতে একটা কথা আছে, অ্যান আইডল ব্রেন ইজ ডেভিলস ওয়ার্কশপ। অলস মস্তিক শয়তানের কারখানা। এই কথাটা কিন্তু সবৈব সত্য।
সর্বক্ষণ নারীকে নিয়ে চিন্তা যা থেকে অনেক সময় নারীত্বকে অবমাননা করে তাকে ধর্ষণ করার জন্য চেষ্টা এটাও কিন্তু হয়। এইসব করার কোনো সুযোগ আমাদের কিন্তু ছিল না। কেননা, আমাদের যৌবন কেটেছে দেশকে স্বাধীন করার চিন্তা নিয়ে। বাল্য বয়স থেকে কৈশরে যখন পৌঁছেছি তখন থেকে আমার চিন্তা ছিল অন্য রকম। ভেবেছি যে নারী আমার হাতে হাত রেখে বলবে, চল দেশ স্বাধীন করি। সেই ছিল আমার অভিষ্ট নায়িকা। আমি সেই নায়িকাকে খুঁজতাম। সেখান থেকে আমরা সরে এসেছি। আজকে রাজনীতির আদর্শের অভাব, কাজের অভাব, সুচিন্তার অভাব, সুপ্রতিষ্ঠানের অভাব, ভাল সহচর্যের অভাব।
গেন্ডারিয়া থাকতাম। নটরডেম কলেজে পড়তাম। বন্ধুরা দল বেধে সন্ধ্যাবেলা রেললাইন ক্রস করে গ্রামের দিকে চলে যেতাম। ডাহুকের ডাক শুনতাম, ঘুঘুর ডাক শুনতাম, উড়ে যাওয়া বক দেখতাম। এতে একটা মহা আনন্দ পেতাম। আজকে বাংলাদেশে এই বিষয়গুলো, চিন্তাগুলো অনুপস্থিত, তাই আমরা এখন অনেক সামাজিক অনাচারে আক্রান্ত হচ্ছি।

আজ সারাবেলা: অনেক সামাজিক সংগঠন তখন সক্রিয় ছিল, এখন নিক্রিয়। এই সামাজিক সংগঠনগুলো সক্রিয় করা যায় কিভাবে। আপনি তো সামাজিক, সংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত, আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত, এখনও সক্রিয়?

আলী যাকের: মূলবোধটা ভীষণভাবে দরকার। পাড়ায় একটি সুন্দরী মেয়ে দেখে মনে হতো তার সঙ্গে যদি প্রেম করতে পারতাম! কিন্তু কখনও মনে হয়নি তাকে জোর করে পেতে হবে। এটাতো কোনো ভদ্রলোক করে না। এই ধরনের একটা কনসাসনেস কাজ করতো, সেটা এখন আর নেই। এখন যাকে চাই, তাকে যেমন করে হোক পেতেই হবে। এটা হচ্ছে এখনকার এটিটিউড।

আমরা মুকুল ফৌজ করতাম। আজাদকেন্দ্রিক মুকুলের মাহফিল ছিল, সেখান মুকুল মেলা হতো। হাবিবুর রহমান শিশু সাহিত্যিক ছিলেন। অল্প বয়সে মারা গেছেন। সংবাদে থাকাকালীন তাকে ‘দাদা ভাই’ বলা হতো। এই মুকুল মেলায় প্রতি সন্ধ্যায় সাহিত্যের আলোচনা হতো। মনে আছে ‘কিশলয়’ বলে একটা দেয়াল পত্রিকা বের হয়েছিল। সেখানে আমার জীবনে লেখা প্রথম ছড়া প্রকাশিত হয়। ঈদ সংখ্যা ছিল সেটি। মনে আছে- এলো ঈদ, নেই নিদ হর্ষে/ পুলোকিত ঝর্ণার স্নেগ সুধা বর্ষে/ এলো ঈদ, নেই নিদ হর্ষে/ গিরি ধারি হাসি মাখা প্রাণ দেবো কর্ষে/ এলো ঈদ, নেই নিদ হর্ষে।

এই যে তরুণদের উৎসাহিত করা, তাদের নিয়ে সংগঠন করা, তাদের সৃজনশীল কর্মে কাণ্ডে অনুপ্রেরণা দেওয়ার বিষয়গুলো এখন আর নেই। গলফ হাইটস নামে আমি একটি বিশাল অ্যাপার্টমেন্টে থাকি। সেখানে কয়েকটি ফ্ল্যাট মিলেইতো বাচ্চাদের একটা একটা অর্গানাইজেশন হতে পারে। কিন্তু সেদিকে কারো আগ্রহ নেই। এখন বাবা-মা’রাও সারাদিন টাকা পিছনে ছুটছে। দে আর হ্যানকারিং আফটার মানি। মূল্যবোধ বলে কিছু নেই। ফলে টাকাকেই সে জীবনের একমাত্র অর্জন বলে মনে করছে।

আলী যাকের

আজ সারাবেলা: মিডিয়ার দিকে আসি। মিডিয়ায় কাজ করার অভিজ্ঞতা আপনার দীর্ঘ দিনের। মিডিয়া বিজনেসের সঙ্গেও অনেককাল যুক্ত। মিডিয়া বাড়ছে, কিন্তু মানের দিক থেকে বাড়ছে কি?

আলী যাকের: ম্যাস প্রডাকশনে কখনই কোয়ালিটি এনশিওর হয় না। মিডিয়ার কোয়ালিটি তো ধস নেমেছে। বিশালভাবে কোয়ালিটি ধস নেমেছে। কেননা আমরা চিন্তাশীল মানুষ তৈরি করতে পারিনি। মেধাবী মানুষ সেই মাত্রায় নেই, যতটা কাঙ্খিতমাত্রায় থাকার কথা ছিল। আমি আবার সেই রাজনীতির কথায় যাই। রাজনৈতিক চেতনার, বাংলাদেশ গঠনের মূল স্রোতধারা থেকে সরে আসায় সামাজিক চিন্তারও বিপথগামিতা ঘটেছে। ভিন্ন স্নোতে চিন্তা আকাঙ্খা প্রবাহিত হয়েছে যা বাংলাদেশে হওয়ার কথা ছিল না।

আজ সারাবেলা: একটা বিষয় শেয়ার করতে চাই। অনেক সময় দেখা যায়, কোন শিশুকে নির্যাতন করা হচ্ছে বা নারীকে। কখনও কোন মানুষকে পেটানো হচ্ছে সেটা ভিডিও ইউটিউব, ফেসবুকে ভাইরাল হচ্ছে। ভিডিও করতে পারছে কিন্তু নির্যাতনকে প্রতিরোধ বা প্রতিহত করছে না। এর সামাজিক কারণ আপনি কি পর্যবেক্ষণ করেন?

আলী যাকের: এটা খুব ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি। শুধু সামাজিক দায়িত্বহীনতা নয়, এর সঙ্গে আরও অনেকগুলো অনুষঙ্গ জড়িত। দাঁড়িয়ে ভিডিও করলাম, অথচ তখন প্রতিবাদ করিনি। অন্যায়কারী যেমন অপরাধী, প্রতিরোধ না করে ভিডিও যে করছে সেও কম অপরাধী নয়। এর সঙ্গে আর্থিক বিষয়ও জড়িত। কেউ কেউ ভিডিও থেকে উর্পাজনও করছে। আর সামাজিক মনস্তত্ত্ব যদি বলি, মানুষের মধ্যে মানবিকতা কমে যাচ্ছে। সামাজিক বিকৃতি বেড়ে যাচ্ছে। ভোগবাদিতা বেড়ে যাওয়ার কারণে মানুষ ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে যাচ্ছে। সে শুধু নিজের একার কথা ভাবছে। সামষ্টিক যে প্রতিবাদ বা প্রতিরোধ সেটি ঘটছে না। এটি সমাজের জন্য বড় দুঃসংবাদ বটে।

আজ সারাবেলা: আবার ফেসবুক, টুইটার এমন সামাজিক গণমাধ্যমে তরুণদের প্রতিবাদ, বিপ্লবও কিন্তু চোখে পড়ে। তরুণদের এই ‘সামাজিক গণমাধ্যম প্রতিবাদ’ আপনি কিভাবে দেখেন?

আলী যাকের: সব বিপ্লবকে আমি অ্যাকসেপ্ট করি, ওয়েলকাম জানাই। যে কোন বিষয় কেবল আন্দোলিত করবার জন্য করছি নাকি সেখানে গভীর চিন্তা ও ভাবনার বিষয় আছে, মানুষকে ভাবানোর বিষয় আছে সেটা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ, মানবিকতা সবকিছুর ঊর্ধ্বে। ফেসবুকে অনেক লোককে দেখি অসংখ্য অগুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে, অমৌলিক বিষয় নিয়ে তোলপাড় করে। আমি এর মধ্যে কোন গভীরতা খুঁজে পাই না। চিন্তাশীল নয় এমন অনেক ফেসবুক ফ্রেন্ডদের আমি আনফ্রেন্ড করি।