‘কলরেডি’ স্বীকৃতির অপেক্ষায় অবহেলিত ইতিহাস - Aj SaraBela (আজ সারাবেলা)
ডা. সুব্রত ঘোষ

‘কলরেডি’ স্বীকৃতির অপেক্ষায় অবহেলিত ইতিহাস

প্রকাশিত :০৭.০৩.২০১৮, ১১:৫০ পূর্বাহ্ণ
  • ডা. সুব্রত ঘোষ

১৯৪৮ সালের কথা। বিক্রমপুরের শ্রীনগর থানার মঠবাড়িয়া গ্রামের আপন দুই ভাই দয়াল ঘোষ ও হরিপদ ঘোষ। ওই বছর পুরান ঢাকার লক্ষ্মীবাজারে মাইকের ব্যবসা শুরু করলেন। প্রথমেই এই প্রতিষ্ঠানের নাম ছিল আই এম অলওয়েজ রেডি, অন কল এট ইয়োর সার্ভিস বা আরজা (এআরজেএ) ইলেকট্রনিক্স। এর বছরখানেক পরই নামকরণ হয় কলরেডি নামে। যার স্থান ছিল ১৯৪৮ এর স্বাধিকার আন্দোলনে, ১৯৫২ এর ভাষা আন্দোলনে, ১৯৬২ এর শিক্ষা আন্দোলনে, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে আর ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়। পরিণত হয় বাংলার ইতিহাসের এক জ্বলন্ত স্বাক্ষী রূপে। বাঙলির প্রধান প্রধান আন্দোলন-সংগ্রামের সভা-সমাবেশে ছিল এই কলরেডি মাইক কোম্পানি।

দেশের তৎকালীন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, মওলানা ভাসানী, কমরেড মণি সিংহ, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেরেবাংলা একে ফজলুল হক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সবার জনসভা মানেই ছিল ‘কলরেডি’। এছাড়াও এ কোম্পানির মাইকে দেশখ্যাত অনেক নেতা বক্তব্য রেখেছেন। পরবর্তীতে যাদের কেউ এমপি, মন্ত্রীসহ দেশের খুবই গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হয়েছেন। মূলত এ ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন পুরাতন ঢাকার লক্ষীবাজারের কানাই ঘোষের প্রয়াত ভাই দয়াল ঘোষ। শিল্প ও সংস্কৃতি নিয়ে তার আগ্রহ ছিল অনেক। ছিলেন চিরকুমার। সিনেমা, স্টেজ, থিয়েটার, শো এসব নিয়ে থাকতেন। এজন্য ঝুঁকে পড়েছিলেন গ্রামোফোনের ব্যবসায়। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন তার দুই ভাই। বাংলাদেশের মাইক ব্যবসা জগতের অগ্রগামী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এটিই ছিল শীর্ষে। বর্তমানে পারিবারিক সূত্র ধরে আরেক ভাই হরিপদ ঘোষের ৪ ছেলে মিলে পারিবারিক ভাবেই এ ব্যবসাটি টিকিয়ে রেখেছেন বলে জানালেন সাগর ঘোষ ও বিশ্বনাথ ঘোষ।

বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি ৩৬, এইচকে দাস রোড, লক্ষীবাজার, সূত্রাপুর থেকে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। বর্তমানে প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান কলরেডি’র প্রতিষ্ঠাতা দুই ভাইয়ের কেউই বেঁচে নেই। বড় ভাই দয়াল ঘোষের মৃত্যু সাল না জানা গেলেও হরিপদ ঘোষেরটি জানা গেছে। তিনি ২০০৪ সালে স্বর্গলোকে গমন করেন। কিন্তু দুই ভাইয়ের স্মৃতি চিহ্ন আর বিভিন্ন ইতিহাসের নির্বাক রাজস্বাক্ষী কলরেডির দোকান লক্ষ্মীবাজারের সেই একই স্থানে রয়েছে। তবে দিন যেমন পাল্টেছে, তেমনি পাল্টেছে কলরেডি। বেড়েছে দোকানের আয়তন, সংযোজন হয়েছে আধুনিক সাউন্ড সিস্টেম। যা দ্বারা যে কোনও বড় ধরনের সভা-সমাবেশসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠান করা সম্ভব। বাবা দয়াল ঘোষের মৃত্যুর পর ২০০৪ সালেই প্রতিষ্ঠানের হাল ধরেন তারই সন্তান সাগর ঘোষ। তাকে সহায়তা করছে চাচা কানাই ঘোষ ও অপর দুই ভাই বিশ্বনাথ ঘোষ ও শিব নাথ ঘোষ। অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে সুনামের সঙ্গে টিকিয়ে রেখেছেন ইতিহাসের এই স্বাক্ষী ও চাচা-বাবার লালিত স্মৃতি। রাজধানীর খুব কম মানুষই আছেন যারা কলরেডির নাম শুনেন নি। ঢাকার বাইরেও যথেষ্ট পরিচিতি রয়েছে কলরেডির।

কলরেডির বর্তমান পরিচালক সাগর ঘোষ জানান, প্রতিষ্ঠানটির আদি মালিকদের মধ্যে একজন তার পিতৃব্য কানাই ঘোষ। ১৯৭১ সালে তার বয়স ছিল ১৭-১৮ বছর। ৭ই মার্চের সেই ঐতিহাসিক ভাষণ প্রচারিত হয়েছিল তার লাগানো মাইকেই। জনসভার একদিন আগে থেকেই কানাই ঘোষ তার অন্য দুই ভাইকে নিয়ে রেসকোর্স ময়দানে মাইক লাগিয়েছিলেন। ৭ই মার্চ অনেক ঝুঁকি সত্ত্বেও কর্মচারীদের সঙ্গে নিয়ে মাইক লাগিয়েছেন তিনি। একপ্রকার হাতে প্রাণ নিয়ে কাজ করেছেন। বঙ্গবন্ধু যখন ভাষণ শুরু করেন তখন তিনি কাছেই ছিলেন। কলরেডির স্বত্বাধিকারীদের মধ্যে একমাত্র কানাই ঘোষ জীবিত। বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত কলরেডি ও কানাই ঘোষ। স্বাধীনতা আন্দোলন ও সকল সভা-সমাবেশে উপস্থিতি ছিল কলরেডির। সহকর্মী দুই ভাই দয়াল ঘোষ ও হরিপদ ঘোষ এখন বেঁচে নেই। তার প্রতিষ্ঠানের ৩০ জন স্টাফও তার সঙ্গে ছিলেন। কানাই ঘোষ এখন জীবনের শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছেন। জীবনে অনেক অর্জন থাকলেও স্বীকৃতির অভাবে সেগুলো মূল্যহীন। সারাজীবন রেসকোর্স ময়দানে ব্যবহৃত সরঞ্জাম আঁকড়ে রাখলেও মনের কষ্ট থেকে তা বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছিলেন তিনি ও তার উত্তরাধিকাররা। এসব সরঞ্জামাদি ও ঐতিহাসিক ঘটনা লিখে ২০১০ সালে ওয়েবাসাইট তৈরি করা হয়েছিল ‘কলরেডি’ নামে। বর্তমানে আর্থিক সমস্যার কারণে মাইকের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীর সংখ্যাও কমিয়ে ফেলতে হয়েছে। কমে গেছে ব্যবসার পরিসর। তাই ব্যবসা বাঁচাতে ও কাজের স্বীকৃতি দানে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এবং তার বিভিন্ন অংগসংগঠনের বিভিন্ন কর্মসূচীতে এখনো কলরেডি’র ডাক পড়ে।

স্বাধীনতার পর বিভিন্ন পট পরিবর্তনশেষে ক্ষমতায় এসে বঙ্গবন্ধুর কন্যার নেতৃত্বের সরকার সর্বপ্রথম সোহরাওয়ার্দী উদ্যান সংরক্ষণের ব্যবস্থা নিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৯৭ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এখানে স্থাপন করেন শিখা চিরন্তন। স্থানটি সংরক্ষিত হলো কিন্তু অবহেলিত থেকে গেলেন সেই কানাই ঘোষ আর তার ‘কলরেডি’।

প্রতিবছর ৭ মার্চ আসে এখনও চাতকের মত অপেক্ষায় থাকেন কানাই। রাষ্ট্র যন্ত্রের কেউ হয়তো তার বাড়িতে আসবেন- সম্মান দিবেন ৭ মার্চের সেই সমাবেশের অন্যতম নায়ক হিসেবে। কিন্তু না! কেউ আসে না। স্বপ্ন ভাঙে তার। বার্ধক্য আর বঞ্চনার শিকার তার জীবন এসব সয়ে গেছে অনেকটাই। সবাই সরে গেছে তার জীবন থেকে। শুধু তার পিছু ছাড়েনি শারীরিক অসুস্থতা। সাউন্ড সার্ভিসের সব সরঞ্জামাদি অনেক যত্নে আগলে রেখেছেন তিনি- আগলে রেখেছেন ইতিহাসের স্বাক্ষী হয়ে থাকা শব্দযন্ত্রগুলো পরম মমতায়। তার সন্তানরা আর এখন চান না সম্মান দিয়ে সেই মাইকগুলো আগলে রাখতে। এগুলো রেখে আর কি হবে? যতসব পুরনো জিনিসপত্র। প্রয়োজনে অর্থের কাছে বিকিয়ে দিতে চান তাদের বাবার সেই অমূল্য সাহসিক শব্দের অস্ত্রগুলো। আমাদের রাজনৈতিক নেতারা কি পারেন না কানাই ঘোষকে তার উপযুক্ত সম্মান দিতে? সহযোগিতার মাধ্যমে পারেন না কানাই ঘোষের ছেলেদের সিদ্ধান্তকে বদলে দিতে? এ প্রশ্ন দেশবাসীর- এ প্রশ্ন আমাদের নবীন প্রজন্মের।

লেখক: চিকিৎসক ও সংগঠক