যে কারণে বিসিসি’র অচলাবস্থা - Aj SaraBela (আজ সারাবেলা)

যে কারণে বিসিসি’র অচলাবস্থা

প্রকাশিত :১৯.০৩.২০১৮, ৪:৫৫ অপরাহ্ণ

শামীম আহমেদ, বরিশাল : বকেয়া বেতন-ভাতার দাবিতে গত সাড়ে চার বছরে আটবার আন্দোলন করেছেন বরিশাল সিটি করপোরেশনের (বিসিসি) কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। গত বছরের ২৭ মার্চ থেকে টানা সাতদিনের কর্মবিরতিতে নগরীতে বর্জ্য-আবর্জনার স্তুপে নগরবাসীর জীবনযাত্রা অসহনীয় হয়ে উঠেছিল। একবছর পর নগরবাসী ফের একই পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছেন গত ১৮ মার্চ (রবিবার)।

একই দাবিতে গত একমাস ধরে লাগাতার কর্মবিরতি চলছে নগর ভবনে। কিন্তু বিষয়টির কোন সুরাহা না হওয়ায় আন্দোলনরত কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা পানি, বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ বন্ধ করার ঘোষণা করেছিলেন। সেই ধারা অনুযায়ী ১৮ই মার্চ রবিবার থেকে অলিখিত ভাবে বজ্র পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা কর্র্মীরা শহরের বিভিন্ন সড়কে জমা থাকা বজ্র পরিস্কার পরিচ্ছন্নতার কাজ বন্ধ করে দেয়ার কারনে বরিশাল নগরী এখন দুর্গন্দময় শহরে পরিণত হয়েছে। এরইমধ্যে রবিবার (১৮ মার্চ) মেয়র আহসান হাবিব কামাল নগর ভবনে আসছেন, এ খবরে বেতন বঞ্চিত পরিচ্ছন্নকর্মীরা সকাল থেকে নগরভবনে অবস্থান করেন। তবে শেষ পর্যন্ত মেয়র কামাল আর নগর ভবনে আসেননি। রবিবার সকাল থেকে কর্মচারীরা নগরীতে পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ বন্ধ করে দেয়ায় মাত্র একদিনেই নগরীর বিভিন্নস্থানে ময়লা-আবর্জনার স্তুপ জমা হয়েছে।

এদিকে, নাগরিক প্রতিনিধিরা বলেন, কর্মচারীদের দাবি যৌক্তিক এবং মানবিক। কিন্তু নগরবাসী সেবাও চায়। সেবা বন্ধ রেখে দাবি আদায়ের আন্দোলন কোনক্রমেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। আবার বিষয়টি সমাধানে নগর কর্তৃপক্ষও চরম উদাসীনতার পরিচয় দিচ্ছে। তাদের মতে, বকেয়া বেতন-ভাতা নিয়ে আন্দোলনরত কর্মকর্তা-কর্মচারী ও মেয়র আহসান হাবিব কামাল যে পাল্টাপাল্টি যুক্তি দেখাচ্ছেন তাতে স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে নগর ভবনে আর্থিক অনিয়ম, অতিরিক্ত জনবল এবং পদোন্নতি ও পদায়নে বৈষম্য সৃষ্টির ফলেই এবং যোগ্য ব্যক্তিকে যোগ্য স্থানে স্থান না দেয়ায় এ সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। যে কারণে সেবা বঞ্চিত হচ্ছেন সর্বস্তরের নগরবাসী।

সূত্রমতে, গত বছর প্রশাসন ও নাগরিক সমাজের মধ্যস্থতায় মেয়র আহসান হাবিব কামালের সাথে সমঝোতা হলে সাতদিন পর কাজে ফেরেন আন্দোলনকারীরা। কিন্তু এবার গত একমাসেও দাফতরিক কাজ বন্ধ রেখে কর্মবিরতি পালন করলেও সমঝোতা না হওয়ায় এবং দুইপক্ষ দুই রকমের দাবি করায় সমস্যা সমাধান করা কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বরিশাল সিটি করপোরেশনের স্থায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বকেয়া ছয় মাসের বেতন ও ২৩ মাসের প্রফিডেন্ট ফান্ড এবং অস্থায়ীদের তিন মাসের বেতনের দাবিতে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কর্মবিরতি শুরু করেন। কয়েকজন কাউন্সিলের মধ্যস্থতায় গত ২৪ ফেব্রুয়ারি প্রথমবার এবং পরে আর একবার মেয়র কামাল ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে সমঝোতা বৈঠক হলেও সমাধান হয়নি। দ্বিতীয় দফায় সমঝোতার চেষ্টা ভেস্তে যাওয়ায় আন্দোলনকারীরা নগর ভবনে সংবাদ সম্মেলন করে তাদের কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে বলেন, গত ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে কর্মবিরতি পালন করা হলেও নগরবাসীর দুর্ভোগের বিষয়টি বিবেচনা করে তারা পানি-বিদ্যুৎ সরবরাহ ও পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ অব্যাহত রেখেছেন।

অপরদিকে মেয়র কামাল বরাবর দাবি করে আসছেন, বিসিসিতে জনবল রয়েছে প্রয়োজনের তুলনায় দ্বিগুণ। তার দেয়া তথ্য মতে, বিসিসির অর্গানোগ্রামে জনবল কাঠামো এক হাজার ১২৫ জনের। বর্তমানে কাজ করছেন দুই হাজার ২৩১ জন। এরমধ্যে স্থায়ী ৫৩১ জন এবং অস্থায়ী এক হাজার ৭০০ জন। তাদের বেতন বাবদ প্রতি মাসে বিসিসির প্রয়োজন দুই কোটি ২০ লাখ টাকা। প্রস্তাবিত অর্গানোগ্রামের চেয়ে অতিরিক্ত জনবল রয়েছে এক হাজার ১০৬ জন। তাদের গড় বেতন আট হাজার টাকা করে হলে প্রতি মাসে ৮৮ লাখ ৪৮ হাজার টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে। মেয়র বলেন, বেতন ছাড়াও বিসিসির যাবতীয় ব্যয় বাড়লেও আয় বাড়েনি। সে কারণে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বকেয়া পরেছে।

মেয়রের এ বক্তব্যের তীব্র বিরোধিতা করে আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারীদের অন্যতম নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আনিসুজ্জামান বলেন, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বিসিসির রাজস্ব আয় ছিল ৩৩ কোটি ২২ লাখ টাকা এবং ব্যয় হয়েছে ২৩ কোটি ৬৮ লাখ টাকা অর্থাৎ উদ্বৃত্ত ছিল প্রায় সাড়ে নয় কোটি টাকা। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে আয় ছিল ৩৬ কোটি টাকা এবং ব্যয় হয়েছে ২৮ কোটি টাকা। আনিসুজ্জামান আরও বলেন, নিয়মানুযায়ী রাজস্ব আয়ের টাকায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, মেয়র-কাউন্সিলদের সম্মানীসহ যাবতীয় মেটানোর পরেও উদ্বৃত্ত টাকা উন্নয়নখাতে ব্যয় করা হবে। কিন্তু মেয়র কামাল কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা বকেয়া রেখে ঠিকাদারদের বিল দেয়ায় বিসিসি অর্থ সংকটে পরেছে।

আন্দোলনকারীদের দাবি, ঠিকাদারদের সাথে মেয়রের কমিশন বাণিজ্য রয়েছে। উন্নয়ন কাজের বেশিরভাগ ঠিকাদারই হলেন বিসিসির কয়েকজন কাউন্সিলর ও মেয়রের ঘনিষ্টজন।

রাজস্ব আয়ের ব্যাপারে বিসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ওয়াহেদুজ্জামান বলেন, বাজেটে রাজস্ব আয় বেশি দেখানো হয়। বাস্তবে ২২ থেকে ২৩ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আয় হচ্ছেনা। বেতন-ভাতার জন্য বছরে প্রয়োজন ৩০ কোটি টাকা। আবার কিছু কাজও রাজস্ব আয় থেকে করতে হয়। তিনি আরও বলেন, করপোরেশনে সব মিলিয়ে প্রায় দেড় হাজার অতিরিক্ত জনবল রয়েছে। পাঁচ বছর আগে একতলা বাড়ির যে হোল্ডিং ট্যাক্স নেয়া হতো সেই বাড়ি এখন তিন থেকে পাঁচ তলায় উন্নীত হলেও আগের হারেই কর নেয়া হচ্ছে। হোল্ডিং ট্যাক্স উপযুক্ত হারে বাড়ানো দরকার। প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মনে করেন, কাজ না করে বেতন নিচ্ছেন এমন জনবল কমানো দরকার।

আন্দোলনকারীদের একজন করধার্য শাখার কর্মকর্তা কাজী মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, ২০০৩ সাল থেকে এ পর্যন্ত তিনজন মেয়র বিসিসির দায়িত্বপালনকালে তাদের অনুগত রাজনৈতিক কর্মীদের কর্মসংস্থান হিসেবে অস্থায়ী শ্রমিক হিসেবে নিয়োগ দিয়ে বিসিসির কাঁধে অতিরিক্ত জনবলের বোঝা চাঁপিয়ে দিয়েছে। মেয়র কামাল প্রায় ৪০০ অতিরিক্ত শ্রমিক নিয়োগ দিয়েছেন। চলমান আন্দোলনের মধ্যেও দুইজনকে অস্থায়ী কর্মচারী (স্লিপ দারা কর্মচারী) হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে।

মেয়র কামাল অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করে বলেন, আমি একজনও নিয়োগ দেইনি। সাবেক মেয়র যাদের নিয়োগ দিয়েছিলেন তারা তার সময়ে যোগদান করেছেন মাত্র। অথচ চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে পানি শাখায় বিল ক্লার্ক পদে রাশেদ খান ও ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের পাম্প চালক পদে মো. জুম্মান নামের দুইজনকে অস্থায়ী নিয়োগ দিয়েছেন মেয়র কামাল।

অতিরিক্ত জনবল থাকার পরেও নতুন নিয়োগের কারণ জানতে চাইলে মেয়র আহসান হাবিব কামাল বলেন, পাম্প চালক কালাম খানের মৃত্যুর পর অতিরিক্ত জনবলের মধ্যে পাম্প চালনায় দক্ষ কেউ না থাকায় তাকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তাছাড়া অতিরিক্ত শ্রমিকদের বেশির ভাগই বিএ-এমএ পাশ। তারা বিল ক্লার্কের পদে মাঠে কাজ করতে চায় না।

চলমান আন্দোলনে অচলবস্থা নিরসনে মেয়র ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে সমঝোতা চেষ্টাকারীদের অন্যতম কাউন্সিলর আলতাফ হোসেন সিকদার বলেন, আন্দোলনকারীদের সব বকেয়া পরিশোধ করতে হলে মোট ১৩ কোটি টাকা এবং আপাতত তিন মাসের বেতন দিতে হলে আট কোটি টাকার প্রয়োজন। বিসিসির তহবিলে অর্থ রয়েছে মাত্র ৯০ লাখ টাকা। ফলে আন্দোলনকারীদের দাবি আপাতত মেনে নেয়া সম্ভব নয়।

এ ব্যাপারে আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারীদের একজন কাজী মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, গত মাসের প্রথমদিকে মন্ত্রণালয় থেকে সোয়া পাঁচ কোটি টাকার থোক বরাদ্দ এসেছে। ওই টাকায় দুই কোটি ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে নগরীর আমানতগঞ্জে সুকান্ত আব্দুল্লাহ বাবু শিশু পার্ক স্থাপনের নির্দেশনা রয়েছে।

আন্দোলনকারীদের দাবি, অবশিষ্ট টাকা দিয়ে তাদের বকেয়া বেতন পরিশোধের। এছাড়া আরও থোক বরাদ্দ আসছে বলে আন্দোলনকারীরা উলে­খ করেন। কারন থোক বরাদ্দে যখন নির্দিষ্ট খাতে ব্যয় করার নির্দেশনা না থাকে তখন মেয়র যেকোন খাতে ব্যয় করতে পারেন।

সার্বিক বিষয়ে মেয়র আহসান হাবিব কামাল বলেন, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আন্দোলন করছেন। আন্দোলনকারীরা কাজে যোগদান না করায় নগরীর বিশিষ্টজনদের ডেকে পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়। কিন্তু বিশিষ্ট নগরবাসীরা কোন সিদ্ধান্ত না দিয়ে বিষয়টি করপোরেশনের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন।

আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারীদের একজন পরিচ্ছন্ন শাখার কর্মকর্তা দিপক লাল মৃধা বলেন, তাদের পুরো বকেয়া বেতন ও প্রভিডেন্ট ফান্ডে পুরো টাকা জমা না দেয়া পর্যন্ত তারা কাজে যোগদান করবেন না। ইতোমধ্যে তারা নগর ভবনের প্রধান ফটকে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছেন। প্রয়োজনে নগরীর পানি, বিদ্যুৎ ও পরিস্কার পরিচ্ছন্নতার কাজ অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেয়া হবে বলেও তিনি হুঁশিয়ারী দিয়েছেন।

এছাড়া তিনি সহ অন্যান্ন আন্দোলন কারীরা বলেন নগরভবনের আজকের এ অবস্তার জন্য তারা নগর ভবনের সব আমলের খলিফা কাউন্সিলর আলতাফ মাহমুদ সিকদার,জাকির হোসেন জেলাল, মোসারেফ হোসেন বাদশা ও বর্তমান পরিষদে নির্বাচিত হয়ে আসা হাবিবুর রহমান টিপুদের কে দায়ী করেন।

এসময় আন্দোলনকারীরা আরো বলেন তারা জন প্রতিনিধি নির্বাচিত হয়ে আসলেও জনগণের সেবা দেয়ার চেয়ে ঠিকাদারী কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকেন।
তারা মেয়রকে কামালকে চেপে ধরেছে তাদের কাজের বিলের জন্য যেহেতু কাউন্সিলররা প্রতিটি কাজে ১০/% থেকে ১৫% পাসেন্ট কমিশন দিয়ে কাজ নিয়েছে তাই কাউন্সিলররা চাচ্ছেন না ঐ তিন কোটি টাকা থেকে আমাদের বেতন-ভাতা দেয়া হোক।
তাদের বিলের কারণেই কোন সমঝোতা হচ্ছে না বলেই মনে করেন।