অর্জন করে ফেলেছি বলাটা আমার কাছে খুব ভুল মনে হয় : ড. তৌফিক এম. সেরাজ - Aj SaraBela (আজ সারাবেলা)
dr-toufiq-m-seraj-ajsarabela-cover-1

অর্জন করে ফেলেছি বলাটা আমার কাছে খুব ভুল মনে হয় : ড. তৌফিক এম. সেরাজ

প্রকাশিত :১১.০৩.২০১৮, ৪:৪৭ অপরাহ্ণ

ড. তৌফিক এম. সেরাজ, প্রকৌশলী, নগর পরিকল্পনাবিদ। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষক ছিলেন। সেখান থেকে সফল উদ্যোক্তা। গড়ে তুলেছেন শেল্টেক্। নিজেকে উদাহরণ করেছেন রিয়েল এস্টেট ইন্ডাস্ট্রির আলোকিত মানুষ হিসেবে। বদলে দিয়েছেন নগরবাসীর জীবনধারা। লিভিং কনসেপ্টে নিয়ে এসেছেন আমূল পরিবর্তন। যে জীবনধারা সামাজিক বাস্তবতায় নগর জীবনের সঙ্গে মানানসই। ৩০ বছরে শেল্টেক্ এর ১৭০টি প্রকল্প হস্তান্তর করেছেন যথাসময়ে। রিয়েল এস্টেট সেক্টরে শেলটেক্ প্রথম ওঝঙ ৯০০১:২০১৫ সনদ অর্জন করেছে।

আবাসন সহায়ক শেলটেক্- নগরায়ন, নির্মাণ নিরাপত্তা, ভূমিকম্প ইত্যকার নানা বিষয়ে গবেষণাও করে আসছে দীর্ঘদিন। নাগরিক সচেতনতা গড়ে তুলতে কাজ করছে অনেকদিন ধরেই। ৩০ বছরে বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে রিয়েল এস্টেট সেক্টরকে রূপান্তরও করেছে। ঢাকায় তিন বেজমেন্টসহ ভবন নির্মাণে অন্যতম পথিকৃত শেলটেক্। যার অন্যতম উদাহরণ ৪.৫ লক্ষ বর্গফুটের ১৬তলা স্কয়ার হসপিটাল ভবন।

ড. তৌফিক রিহ্যাবেরও সভাপতিত্ব করেছেন তিন মেয়াদে (২০০১-২০০৬) সফলতার সঙ্গে। শেল্টেক্ পদকের মাধ্যমে দেশের গুণীজনদের সম্মানিত করে আসছে অনেক দিন ধরেই। নির্মাণ, নগরায়ন ও আবাসন বিষয়ে রয়েছে ড. তৌফিক এম. সেরাজ’র লেখা রয়েছে একাধিক বই, যা ইতোমধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

শেলটেক্ এর সাফল্যের ৩০ বছর উপলক্ষে ‘আজ সারাবেলা’ কথা বলেছে ড. তৌফিক এম. সেরাজ’র সঙ্গে। প্রসঙ্গ ছিল শেলটেক্ এবং একজন ড. তৌফিক এম. সেরাজ।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জববার হোসেনরবিউল ইসলাম রবি

আজ সারাবেলা : শেলটেক্ আজকে যে জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে খ্যাতি, সুনাম, সম্মান, অর্জনের দিক থেকে, ৩০ বছর আগে এতটা ভেবেছিলেন কি বা কী ভেবেছিলেন?

ড. তৌফিক এম. সেরাজ : এখন পর্যন্ত ১৭০টি প্রোজেক্ট ডেলিভারি দিয়েছি। সবগুলোর হয়ত মডেলও নেই। প্রথমটির মডেল আছে। তবে যেভাবে করতে চেয়েছিলাম, সেভাবে পারিনি। প্রথম মডেলটি যদি আমাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী করতে পারতাম তাহলে আজকে রিয়েল এস্টেট ইন্ড্রাষ্টির ইতিহাস হয়ত অন্যরকম হত। হয়ত সেই সময়ে প্রথম পাঁচ বছরেই ইস্টার্ন হাউজিংকে ছাড়িয়ে যেতাম। মনে হতে পারে কেন পারিনি? পারিনি আসলে অর্থ সংকটের কারণে। সব রকম যোগ্যতা ও প্রস্তুতি থাকা সত্তে¡ও ব্যাংকের কাছ থেকে মাত্র এক কোটি টাকা চেয়েও পাইনি। টাকার অভাবে প্রজেক্টটি আঠারো তলা না করে মাত্র ছয়তলায় নিয়ে আসি। এমন না পাওয়ার কথা অনেক আছে। তবে আমি কখনই থেমে থাকিনি।

আজ সারাবেলা : আপনার বাবা-মা দু’জনই সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন। ভাই-বোনরা চাকরিজীবী ছিলেন। আপনি নিজেও ছিলেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। সেখান থেকে উদ্যোক্তা হওয়া। একটা কর্পোরেট জীবনে ঢুকে পড়া। এই যে ট্রান্সফরমেশন অফ লাইফ, সাইকোলোজিক্যালি ট্রান্সফরমেশনের জায়গাটি বুঝতে চাইছি, যদি শেয়ার করেন একটু।

ড. তৌফিক এম. সেরাজ : একটি মধ্যবিত্ত ও সৎ পরিবারে আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা। ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করা পর্যন্ত দেখেছি বাসায় অভাব নেই কিন্তু কোন বাড়তি টাকা নেই। হিসাব করে চলত হত। ইচ্ছা করলেই প্রতিদিন ভালো খাওয়া সেটি সম্ভবপর ছিল না। দুই ঈদে নতুন পোশাক আর জুতো পেতাম এবং এর জন্য সারা বছর অপেক্ষা করতাম। এই অস্বচ্ছলতার বিষয়টি ভালো লাগত না। এটা কেমন কথা, চাইলেই বাড়তি টাকা খরচ করতে পারব না।

dr-toufiq-m-seraj-ajsarabela-body

শেলটেক্ এর ব্যবস্তাপনা পরিচালক ড. তৌফিক এম. সেরাজ। ছবি : সংগৃহিত

বুয়েটে যখন পড়ি তখন আমার বন্ধু কুতুবকে প্রায়ই বলতাম চাকরি করাটা বোধ হয় ঠিক হবে না। ঘুরেফিরে সেই হিসাবের জীবন। আর ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে বেরিয়ে চুরি-দুর্নীতি যে করব সেটিতেও কখনও মন সায় দেয়নি। তখন থেকেই ভাবতাম ব্যবসা করব। ৮০তে একটা কনসালটেন্সি ফার্মও খুলে ছিলাম। অফিস ছিল বাংলামটর। ইউরেকা এসোসিয়েটস।

অনেক ছোট-খাটো শিল্প প্রতিষ্ঠানের ডিজাইন-ড্রয়িং করে দিয়েছি। ফি ছিল ২ হাজার থেকে ৪ হাজার টাকা। দিনে এনে রাতে খাওয়ার মত অবস্থা। তখনও আমি ছাত্র। মাঝে মাঝে ভাবতাম জীবনে দশ হাজার টাকা জমতে হবে। এর চেয়ে বড় অংক তখন চিন্তাও করতে পারতাম না।

আজ সারাবেলা: বলা হয় এন্টারপ্রেনার হওয়া যায় না, হয়ে উঠতে হয়। এন্টারপ্রেনার হয়ে উঠবার জন্য কী অনুভব করেছেন, যেটি সবচেয়ে বেশি জরুরি?

ড. তৌফিক এম. সেরাজ : আমাদের দুই বন্ধুর মধ্যে কুতুব অনেক ভালো এন্টারপ্রেনার। আমি নিজেকে কখনই এন্টারপ্রেনার ভাবিনি। আমার মনে হয়, আমি ভালো সংগঠক এবং ব্যবস্থাপক। আমি স্বাধীনতা চেয়েছি। ঘড়ি ধরে বছরের পর বছর একই রুটিনে ক্লাশ নেওয়াটা কেন জানি আমার ভালো লাগেনি। মূলত নিজের মত করে কাজ করতে চাওয়া, সেই কাজ আরো অনেক মানুষের কাজের সুযোগ করে দিবে এমন একটি ভাবনা থেকেই আমার স্বাধীন জীবনের যাত্রা।

আজ সারাবেলা : আপনার ভাবনার সূত্র ধরেই বলি, উদ্যোক্তা হিসেবে আপনার ভাবনার কতটা জায়গাজুড়ে শেল্টেক্ থাকত, যদি সময়ের হিসেব করি?

ড. তৌফিক এম. সেরাজ : আমার চিন্তার শতভাগ জায়গাজুড়েই শেলটেক্ থাকত এবং এখনো আছে। এ ভাবনার কোনো সময়-ঘণ্টা নেই। দিন-রাত নেই। এ অনেকটা ঘোরের মত। প্রতিদিনই নতুন নতুন ঘোর তৈরি হত নতুন কিছু করার। যা এখনও হয়। এই যে ঘোর এটি কাজের জন্য খুব জরুরি।

আজ সারাবেলা : শেলটেক্ এবং আপনার ব্যক্তিগত ইমেজ ব্র্যান্ডিংয়ের জায়গাটিও জানতে চাইব। এই যে আপনি স্বতন্ত্র, আলাদা এটা কি সচেতনভাবে নাকি আপনি এমনই?

ড. তৌফিক এম. সেরাজ : সততা ছাড়া প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখা যায় না। এগিয়ে যাওয়া যায় না। কোয়ালিটি এন্ড কমিটমেন্ট এই দুটোতে কখনো আপোষ করিনি। ইমেজ তৈরি করা যায় না। ইমেজ কোন রেডিমেড প্রোডাক্ট না। কাজ দিয়েই ইমেজ তৈরি করে নিতে হয়।

ব্যক্তিগত জীবনে আমি গুছিয়ে থাকতে পছন্দ করি। কখনো আমার টেবিল বা রুম এলোমেলো দেখবেন না। আমি বরাবরই কৌতুহলী। নতুন কিছু শিখতে চাই, নতুন কিছু জানতে চাই। প্রতিদিন কিছু সময় হলেও বইয়ের সঙ্গে কাটাই। প্রযুক্তির প্রতি আমার দুর্বলতা বরাবরই।

আজ সারাবেলা : শেলটেক্ নিয়ে আপনার স্বপ্নযাত্রার বাকিটুকু যদি শেয়ার করেন।

ড. তৌফিক এম. সেরাজ : স্বপ্নের আসলে শেষ নেই। স্বপ্ন সীমাহীন। অনেকটা নিরন্তর বলতে পারেন। অর্জন একটি প্রক্রিয়া। অর্জন করে ফেলেছি বলাটা আমার কাছে খুব ভুল মনে হয়। আমি পেশাদারিত্বে বিশ্বাস করি।

বিশ্বাস করি একমাত্র পেশাদারিত্বই যেকোন প্রতিষ্ঠানকে প্রতিদিন আরেকটি দিনের কাছে নিয়ে যায়। প্রতিদিনই একটু একটু সাফল্য যোগ হয়, এগিয়ে যায়।

আজসারাবেলা/সাক্ষাৎকার/রাজধানী/শেলটেক্/১১/মার্চ/২০১৮