গণতন্ত্রকে কার্যকর দেখতে চায় সবাই - Aj SaraBela (আজ সারাবেলা)
dr.kamal hossain-ajsarabela
ড. কামাল হোসেন।ফাইল ছবি

গণতন্ত্রকে কার্যকর দেখতে চায় সবাই

প্রকাশিত :০৩.০৩.২০১৮, ১:৪৩ অপরাহ্ণ

 

  • ড. কামাল হোসেন
    কার্যকর গণতন্ত্র সবাই চায়। আমাদের দীর্ঘদিনের সংগ্রাম, সেই পাকিস্তান আমল থেকেই আমরা কার্যকর গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম-আন্দোলন করে আসছি।

কার্যকর গণতন্ত্রের অর্থ হল জনগণ ক্ষমতার মালিক। সংবিধান যখন লেখা হল তখন সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়ে কার্যকর গণতন্ত্রের বিষয়টি লেখা হয়েছিল।

সংবিধানটি জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। বঙ্গবন্ধু ও যারা স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছেন তাদের স্বাক্ষরিত দলিলটি সেখানে রয়েছে। সংবিধানে স্পষ্টভাবে লেখা আছে এই প্রজাতন্ত্রের ক্ষমতার মালিক জনগণ। এটাকে কেউ মুছে দিতে পারবে না। একাধিক সংশোধন করলেও এটি সংশোধন করা যাবে না। কাজেই এটিই হল স্বাধীনতার অর্থ। স্বাধীন দেশের স্বাধীন জনগণ হল ক্ষমতার মালিক।

কার্যকর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় যেসব ঘাটতি রয়েছে তা চিহ্নিত হয়ে যায়, সমস্যাগুলো ধরা পড়ে যায় জনগণের চোখে। ঘাটতির বিষয়গুলো অস্বীকার করা যাবে না। আমি শতভাগ আশাবাদী। যেখানে সাড়ে সাত কোটি মানুষ পরাধীন থেকে দেশটাকে স্বাধীন দেশে পরিণত করেছিল, সেখানে আমরা ষোল কোটি মানুষ সবাই মিলে সব ঘাটতি পূরণ করব।

এই যে গুম-খুন কে শুনেছিল এসব আগে? বিভিন্ন সময়ে স্বৈরশাসক যারা ক্ষমতায় ছিলেন তারা গুম-খুনকে পরিচিত করান। কিন্তু এখন তো সরকারকে বলা হয় নির্বাচিত ও গণতান্ত্রিক সরকার। তাহলে নির্বাচিত সরকারের আমলে এভাবে গুম-খুন হওয়ার কথাতো নয়। যেটা ঘটছে এটি হলো ঘাটতি। এটা থেকে মুক্ত হতে হবে।

আমি প্রায়ই শুনি দেশতো বিভক্ত হয়ে আছে। দুইভাগে ভাগ হয়ে গেছে। দুই বড় দল দেশকে ভাগ করে নিয়েছে। দুই বড় দলের সদস্য সংখ্যা কত? খুব বেশি হলে এক কোটির বেশি হবে না। দুই বড় দল মিলে যদি দুই কোটি সদস্য থাকে তাহলে বাকি ১৪ কোটি মানুষতো কম না। দলের লোকজন কি দেশের চলমান অবস্থা নিয়ে সন্তুষ্ট? তারা কি মনে করে এটাই তাদের স্বাধীন দেশের স্বপ্ন ছিল? না ছিল না। দলীয় লোক হলে যে অন্ধ হয়ে যায় বা চিন্তাশক্তি হারিয়ে ফেলে সেটি কিন্তু নয়।

বড় দল হিসেবে তারা কিন্তু দাবি করতে পারে না যে সব ঠিক আছে। দুঃখ লাগে যখন সচেতন রাজনীতিক বাস্তবতাকে দেখেও দেখেন না। চোখ থেকেও তারা অন্ধ। এর চেয়ে দুর্ভাগ্য কি হতে পারে। বুদ্ধিমান হয়েও বাস্তবতা দেখায় নিজেকে বঞ্চিত করার চেয়ে দুঃখের কিছু নাই।

প্রশ্ন হল কার্যকর গণতন্ত্র কিভাবে পাওয়া যাবে এবং নিজেদের অধিকার প্রয়োগ করে দেশটাকে কিভাবে এগিয়ে নেওয়া যাবে। আমি সবাইকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, এই দেশটাকে গড়ার জন্য যেটি সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত করবে সেটি হলো আমাদের গৌরবান্বিত ইতিহাস। সেই ইতিহাসের মানুষগুলো আপনাদের সামনে উপস্থিত রয়েছেন।

ভাষা আন্দোলনের যে ইতিহাস, সেটি জানা দরকার। সে সময়ের সরকার নিজেদের কত না শক্তিশালী মনে করেছিল। সেদিন প্রতিবাদ করেছিল ছাত্র সমাজ।

ছয় দফা আন্দোলনের কথা মনে আছে। সেখানে বলা হয়েছিল অস্ত্রের ভাষায় জবাব দেওয়া হবে। ছয় দফাকে নিশ্চিন্ন করে দেওয়া হবে। এই লক্ষ্যেই আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা হয়েছিল। ইসলামাবাদ থেকে একটি ঘোষণা দেওয়া হল যে এটিকে আগরতলা ষড়যন্ত্র বলা হবে। উদ্দেশ্য কিন্তু বোঝা যাচ্ছিল। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পথ তারা বের করল। তারা ভেবেছিল ফাঁসির মঞ্চে নিয়ে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হবে। কিন্তু তারা ঠিক হিসাব করতে পারেনি।

মনে আছে সময়টা ছিল ফেব্রুয়ারি মাস। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসে বঙ্গবন্ধকে ভড়কে দেওয়ার চেষ্টা করলেন। বললেন, এখানকার পরিস্থিতি খুব থমথমে। কয়দিন আগেই সাজেন্ট জহুরুল হককে হত্যা করা হয়েছে। আপনি আমার সঙ্গে চলুন। গাড়িতে করে নিয়ে যাব। আপনি প্লেনে করে ইসলামাবাদ গিয়ে আইয়ুব খানের সঙ্গে বসে একটা মিমাংসা করবেন।

আমার মনে আছে, আমি সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম। বঙ্গবন্ধু হেসে বললেন, দেখ আমি তো বিচারের আসামী। আমি কিভাবে হেটে এখান থেকে যেতে পারি। আর কিভাবে আলোচনা করব আসামী হিসেবে। আর তোমারও আমাকে এভাবে নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা নেই। আমাদের আইনজীবী এখানে উপস্থিত আছেন।

মামলা প্রত্যাহার করতে হবে। এবং আমিসহ সকল বন্দিদের মুক্তি দিতে হবে। মুক্ত হয়ে জনসভা করে তারপরই আমি আলোচনার জন্য যাব এবং বাঙালির জাতির দাবিগুলো সেখানে তুলে ধরব। এসব কথা শুনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চলে গেলেন।

কিছুদিনের মধ্যে জেনারেল মোজাফফর উদ্দিন যিনি জিওসি ছিলেন, তিনি বললেন তোমাদের নেতার নীতি আছে। প্রশংসা না করে পারছি না। কিন্তু এখনতো বিপদ আরো বেড়েছে। কি বিপদ? হাজার হাজার জনতা রাজপথ ধরে ক্যান্টনমেন্টের দিকে ধাবিত হচ্ছে এবং স্লোগান দিচ্ছে ‘জেলের তালা ভাঙ্গব, শেখ মুজিবকে আনব’।

হাজার হাজার মানুষ আমাদের উপর চড়াও হলে আমরা গুলি করব কিন্তু পরের পরিস্থিতি আরো খারাপ হবে। আপনি দয়া করে মাইকে আন্দোলনরত জনতাকে ফিরে যেতে বলেন। বলেন, কালই মামলা প্রত্যাহার করা হবে এবং আপনাকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়া হবে। বঙ্গবন্ধু মাইকে সবাইকে সুন্দরভাবে ফিরে যাওয়ার অনুরোধ করলেন। সবাই চলে গেল। পরের দিন বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দেওয়া হল। এটা ছিল জনগণের বিজয়। জনগণই যে ক্ষমতার উৎস বা শক্তি তা আমরা বারবার দেখেছি। (চলবে…)

লেখক: সংবিধান প্রণেতা, আইনবিদ ও গণফোরাম সভাপতি