গণতন্ত্রকে কার্যকর দেখতে চায় সবাই (পর্ব-২) - Aj SaraBela (আজ সারাবেলা)
ড. কামাল হোসেন

গণতন্ত্রকে কার্যকর দেখতে চায় সবাই (পর্ব-২)

প্রকাশিত :০৫.০৩.২০১৮, ১২:৪৬ অপরাহ্ণ
  • ড. কামাল হোসেন

২৬ মার্চের আগে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সম্মিলিত ছাত্র সমাজের ডাকে ঐতিহাসিক জনসভা অনুষ্ঠিত হল। সেই সভাতেই শেখ মুজিবকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হল। এই ২৬ মার্চে ভুট্টো পরিকল্পনা করলেন যে পূর্ব পাকিস্তানের ৫-৬ হাজার মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের হত্যা করলে সারা গ্রাম বাংলার মানুষ পাকিন্তানের পক্ষে কথা বলবে। আন্দোলন এগুলো কিছু থাকবে না।

২৬ মার্চের রাতের আসল ইতিহাসটি কি? পাকিস্তানী শাসকদের অনুচরেরা একাধিক ট্যাংক নিয়ে বঙ্গবন্ধুর বাড়ির সামনে গেল। রাস্তায় হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করে সেপথেই বত্রিশ নাম্বারের বাড়িতে উপস্থিত হল। সেখান থেকে পাক সেনারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে এগিয়ে গেল। বিশ্ববিদ্যালয়ে ইকবাল হল, জগন্নাথ হলের ছাত্র ও শিক্ষকদের ধরে ধরে হত্যা করল। সেখানে আজও গণকবর রয়েছে। কারণ ছাত্র সমাজকে পাকিস্তান সরকার খুব ভয় পেত। তারা ভাবল, ছাত্রদের হত্যা করে, নির্যাতন করে যদি আন্দোলন থেকে বিরত রাখা যায় তাহলে তাদের বিজয় নিশ্চিত হবে।

সংবিধান হলো একটি রাষ্ট্রের মালিকানার দলিল। জাতির পিতা সেই দলিল রেখে গেছেন। সেই সংবিধানে লেখা আছে চারটি মূলনীতি। যার অন্যতম কার্যকর গণতন্ত্র। মানুষ আসল গণতন্ত্র দেখছে না এখন। জনগণ যদি রাষ্ট্রের মালিক হয়ে থাকে তাহলে হাজার হাজার কোটি টাকা দেশ থেকে উধাও হয়ে গেল, কোন অ্যাকশন নেওয়া হল না কেন? বেসিক ব্যাংক সাড়ে তিন হাজার কোটি, জনতা ব্যাংক চার-পাঁচ হাজার কোটি আর বাংলাদেশ ব্যাংকের আট হাজার কোটি টাকা উধাও হয়ে গেল। কোন বিচারে শাস্তি নিশ্চিত হয়েছে?

আইনকে নিয়ে খেলা শুরু হয়েছে। প্রহসন শুরু হয়েছে। আমি তো বলব, জজ সাহেবরা কিছুটা আত্মসম্মানবোধ রক্ষা করে দায়িত্ব পালন করুন। বিচার বিভাগকে আমি সবচেয়ে বেশি শ্রদ্ধা করি। বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছি, ঝুঁকি নিয়েছি, জেলও খেটেছি। বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে টিকিয়ে রাখতে পারলে গণতন্ত্রের জন্য ভাল হবে।

সংবিধানে লেখা আছে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, জনগণের জানমালের নিরাপত্তা, বাক স্বাধীনতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা থাকবে। এইসব বিষয়ে আঘাত আসলে, মৌলিক অধিকার রক্ষায় আঘাত আসলে বিচার বিভাগ পদক্ষেপ নিবেন, আদেশ দিবেন। তারা দিয়েছেনও। কোর্টের নিয়ন্ত্রণ থেকে বের হওয়ার জন্য শুরু হয়ে যায় ভয়াবহ কিছু ঘটনা। তা হচ্ছে গুম-হত্যা। কেউ গুম হলে, গুপ্তহত্যার শিকার হলে কোর্ট কার বিরুদ্ধে রায় দিবেন? যারা এই গুম-খুনের সঙ্গে জড়িত, তিনি সরকারি কর্মকর্তা হন বা দলীয় কর্মী হন, আমার অনুরোধ থাকবে এটা করবেন না আপনারা। এই অপরাধগুলো দেশকে একটা ভয়াবহ অবস্থার দিকে নিয়ে যায়। গুম-খুন হলে তারা নাটকীয় ভাব ধরেন। কোথায় আছেন, জানি না। এরপর হইচই চলে গুম হওয়া ব্যক্তিকে মধ্যরাতে বাসার সামনে ফেলে দিয়ে চলে যায়। অনেক সময়ে এয়ারপোর্ট রোডে নামিয়ে দেওয়া হয়। যাকে নামিয়ে দেওয়া হয় তার মুখ বন্ধ হয়ে যায়। কিছু বলতে চান না তিনি। হত্যা-গুম মহামারী আকার ধারণ করেছে। বৃটিশ আমল, পাকিস্তান আমলকেও ছাড়িয়ে যাবে যদি আমরা মনে করি এসবের জবাবদিহিতার প্রয়োজন নেই। এটি কিন্তু সংবিধানের ষোল আনা পরিপন্থি।

সরকারের সব সুযোগ সুবিধা নিবেন, বেতন ভাতা নিবেন, বিদেশ ঘুরে বেড়াবেন আর মানুষ গুম-খুন হলে বলবেন জানি না, এটি হয় না। হত্যা-গুমের ব্যাপারে দায়িত্ব নিয়ে, দায়িত্ব পালন করতে হবে।

যারা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছিল, তারা কোথায় যেন বলেছিল, বঙ্গবন্ধুকে মেরে আমরা এই স্বাধীনতাকে নাকচ করে দিব। আমরা তা হতে দেইনি। যারা হত্যা করেছিল তারা ভেবেছিল আগের শাসকদের পা ধরে ক্ষমা চেয়ে নিবে। কিন্তু আমরা তা হতে দেইনি। ধারাবাহিকভাবে আন্দোলন হয়েছে। এমনকি জাতীয় চার নেতাকে যখন হত্যা করা হলো, তারা ভেবেছিল আমরা হেরে যাব। আমরা তো হারিনি। ধারাবাহিকভাবে আন্দোলন হয়েছে।

দেশের মালিক জনগণ, কেবল একজন নন। এটি সবাইকে বুঝতে হবে। আমি অন্তর থেকে যৌথ নেতৃত্বে বিশ্বাস করি। অনেকেই বলতে পারেন যে আমি বঙ্গবন্ধুর প্রতি অসম্মান করছি, কিন্তু আমি তো উনাকে কর্মী হিসেবে দেখেছি। দেখেছি কর্মীদের নিয়ে আলাপ-আলোচনা করতে। উনি খুব কম সময়ে একক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আলাপ-আলোচনা করেই বেশিরভাগ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এরপর মঞ্চে গিয়ে ঘোষণা করেছেন। যেমন ধরেন তার ৭ই মার্চের ভাষণ, যেটি আন্তর্জাতিকভাবেও স্বীকৃতি পেয়েছে। সেই ৭ই মার্চের ভাষণের পর ২৬ মার্চের রাতের পর জনগণ সেই ঘোষণাকে মেনে নিয়ে নয় মাসব্যাপী স্বাধীনতার সংগ্রাম করেছে।

একটি ঘটনা বলতে চাই। ১০ জানুয়ারি, বঙ্গবন্ধু যখন দেশে ফিরলেন। প্লেন থেকে দেখছেন শুধু মাথা দেখা যায়। লক্ষ লক্ষ মানুষের মাথা। বঙ্গবন্ধু চিন্তিত ভঙ্গিতে মাথায় হাত দিয়ে বসেছিলেন। আমি বললাম আপনি চিন্তিত কেন? বললেন, দেখ দীর্ঘ নয় মাস সংগ্রামের পর স্বাধীন বাংলাদেশে পা রাখতে যাচ্ছি আমরা। এই স্বাধীনতা কিন্তু ঐক্যের ফসল। আমাদের এই ঐক্য ধরে রাখতে হবে। স্বাধীনতা ধরে রাখতে হবে।

পাকিস্তানীদের ধারণা ছিল বাঙালি ঐক্যবদ্ধ হতে জানে না। কিন্তু বাঙালি ঐক্যবদ্ধ হয়ে স্বাধীনতা অর্জনের মধ্য দিয়ে তা প্রমাণ দিল। কিসিঞ্জার একবার বঙ্গবন্ধুকে বলেছিলেন যে আপনি অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন। বাঙালিকে আপনি ঐক্যবদ্ধ করেছেন। একাত্তরের পর যত অর্জন সব ঐক্যবদ্ধভাবে হয়েছে। স্বৈরাচারের কবল থেকে মুক্তি এসেছে ঐক্যবদ্ধ হয়েই। (সমাপ্ত)

লেখক: সংবিধান প্রণেতা ও আইনবিদ। গণফোরামের সভাপতি।

আজ সারাবেলা/সংবাদ/কলাম