শাবান মাসে করণীয় ইবাদত - Aj SaraBela (আজ সারাবেলা)

শাবান মাসে করণীয় ইবাদত

প্রকাশিত :৩০.০৪.২০১৮, ৭:১৪ অপরাহ্ণ

আজ সারাবেলা ডেস্ক : আরবী বার মাসের মধ্যে চার মাস অতি সম্মানিত। এসব হলো-মুহাররম, রজব, যুলকদাহ এবং যুলহিজ্জাহ। এসব মাসে ঝগড়া-বিবাদ, খুন-খারাবী, যুদ্ধ-বিগ্রহ ইত্যাদি অন্যায় হতে দূরে থাকা সব মুসলিমের ধর্মীয় কর্তব্য। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘এ মাসগুলোতে তোমরা পরস্পরের উপর অত্যাচার করো না।’ (সূরা তাওবা, ৩৬)। এ মাসগুলোকে নিষিদ্ধ ও সম্মানিত মাস এ জন্য বলা হয় যে, এতে যুদ্ধবিগ্রহ হারাম (নিষিদ্ধ)। তবে শত্রুপক্ষ যদি যুদ্ধ চাপিয়ে দেয় তো ভিন্ন কথা। এ জন্য এ মাসকে বোবা রজব নামকরণ করা হয়েছে।

ইমাম বুখারি আবু বাকরার সূত্রে নবীজি (সা) থেকে বর্ণনা করেন, ‘আল্লাহ যেদিন আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন। সেদিন যেভাবে সময় নির্ধারিত ছিল তা ফিরে এসেছে। ১২ মাসে এক বছর। এর মধ্যে চার মাস নিষিদ্ধ ও সম্মানিত। তিন মাস পরপর যিলকদ, যিলহজ ও মুহররম এবং মুজারের মাস রজব যা জমাদিউসসানি ও শাবানের মধ্যবর্তী মাস।’ (বুখারি ও মুসলিম)।

ইবনে হাজর বলেছেন, রজবের ফযিলত, রজব মাসে রোযা অথবা রজবের সুনির্দিষ্ট কোনো তারিখের রোযা, এ মাসের বিশেষ কোনো রাত্রি উদযাপন বিষয়ে বিশুদ্ধ ও শরীয়তি দলিল-হওয়ার মতো শক্ত কোনো হাদিস বর্ণিত হয়নি। তবে শাবানে অধিক রোযার ব্যাপারে বিশুদ্ধ হাদিস রয়েছে।

(১) সোম ও বৃহস্পতিবার দিনের রোযা: প্রতি সপ্তাহের সোম ও বৃহস্পতিবার দিন নফল রোযা রাখা সুন্নাত ও মুস্তাহাব। কারণ, তা ছিল মহানবী (সা) এর আমল। আর এই দুই দিন আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের নিকট বান্দার আমল পেশ করা হয়। মা আয়িশাহ (রাযি) বলেন, ‘আল্লাহর রাসূল (সা) সোমবার ও বৃহস্পতিবার দিন রোযা রাখাকে প্রাধান্য দিতেন।’ (তিরমিযী, সহীহ, শায়খ আলবানী, সহীহ তারগীব ১০২৭)

(২) ১৩, ১৪, ১৫ তারিখের রোযা: প্রতি চন্দ্র মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ রোযা রাখা সুন্নাত। আবু দারদা (রা) বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার প্রিয় বন্ধু (রাসূলুল্লাহ সা) আমাকে এমন তিনটি কাজের অসিয়ত করেছেন, ‘যা আমি যতদিন বেঁচে থাকব, কখনোই ত্যাগ করব না। সেগুলো হচ্ছে, প্রতি মাসে তিনটি করে রোযা (আইয়ামে বীয এর ৩দিন) পালন করা, চাশতের নামায পড়া এবং বিতির না পড়ে ঘুমাতে না যাওয়া।’ (সহীহ মুসলিম ৭২২, আবু দাউদ ১৪৩৩, আহমাদ ২৬৯৩৫) আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা) বাড়িতে থাকাবস্থায় অথবা সফরে থাকাবস্থায় কখনোই আইয়ামে বীযের রোযা ছাড়তেন না।’ (নাসায়ী ২৩৪৫ , শায়খ আলবানীর মতে হাসান সহীহ, তাহকীকরিয়াদুস সালেহীন)

(৩) নফল সলাত: এ মাসে বেশি বেশি নফল সলাত বা নামায আদায় করা যায়। আবু হোরায়রা (রা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা) কে বলতে শুনেছি। ‘আফযালুস সালাতি বাদাল মাফরুদাতি সলাতুল লাইলি’ অর্থাৎ ফরয নামাযের পর সবচেয় উত্তম নামায হলো তাহাজ্জুদের নামায। (১১৬৭/২) রাসূল (সা) বলেন, ‘আল্লাহ প্রতি রাতেই নিকটবর্তী আসমানে অবতীর্ণ হন যখন রাতের শেষ তৃতীয়ভাগ অবশিষ্ট থাকে। তিনি তখন বলতে থাকেন কে আছো যে আমায় ডাকবে, আর আমি তার ডাকে সাড়া দেবো? কে আছো যে আমার কাছে কিছু চাইবে, আর আমি তাকে তা দান করব? কে আছো যে আমার কাছে ক্ষমা চাইবে আর আমি তাকে ক্ষমা করব? (বুখারি ও মুসলিম)

(৪) কুরআন তেলাওয়াত: এ মাসে বেশি বেশি কুরআন তেলাওয়াত করা যায়। রাসূল (সা) বলেন, যে ব্যক্তি পবিত্র কুরআনের একটি অক্ষর পড়বে, সে একটি নেকি পাবে। আর একটি নেকি দশটি নেকির সমপরিমাণ। (তিরমিযী) রাসূল (সা) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে ওই ব্যক্তি সর্বশ্রেষ্ঠ, যে আল কুরআন নিজে শেখে ও অন্যকে শেখায়।’ (বুখারি) হাদিসে কুদসিতে মহান আল্লাহ বলেন, ‘যে ব্যক্তি কুরআন পড়ানো এবং তেলাওয়াতের কারণে আমার কাছে কিছু চাইতে পারল না, আমি তাকে প্রার্থনাকারীর চেয়েও বেশি দান করি।’ রাসূল (সা) এরশাদ করেন, ‘যে হৃদয়ে আল কুরআনের কোনো অংশ নেই, সে হৃদয় বিরান গৃহের ন্যায়।’ অন্যত্র তিনি আরও বলেন, কিয়ামত দিবসে কুরআন অধ্যয়নকারীকে বলা হবে, কুরআন পড় এবং উপরে উঠো। যেভাবে দুনিয়াতে তারতীলের সাথে কুরআন পড়তে সেভাবে পড়। যেখানে তোমার আয়াত পাঠ করা শেষ হবে, জান্নাতের সেই সুউচ্চ স্থানে হবে তোমার বাসস্থান। (তিরমিযী)

(৫) গুনাহ ত্যাগ: এ মাসে ছোট ও বড় গুনাহ থেকে দূরে থাকতে হবে। আল্লাহ তা‘আলা ৪টি সম্মানিত মাসে গুনাহ থেকে দূরে থাকতে বলেছেন। আর রজব এ সম্মানিত মাসসমূহের মধ্যে পড়ে। গুনাহ ত্যাগ করে বেশি বেশি আমলে সলেহ বা ভাল কাজ করতে হবে। আসন্ন রমাযানে ভাল কাজ করার অভ্যাস গড়ে উঠবে।

(৬) রজব মাসের দোআ : আনাস (রা) থেকে একটি হাদিস বর্ণিত যে, ‘রজব মাস এলে নবীজি (সা) এ দোআটি পড়তেন- ‘আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফি রজাবা ও শাবানা ওয়া বাল্লিগনা রমাযান’ অর্থাৎ হে আল্লাহ! রজব ও শাবান মাসে আমাদের বরকত দান করুন এবং রমাযান পর্যন্ত পৌঁছে দিন। হাদিসটি আহমাদ মুসনাদ গ্রন্থে, তাবরানি আল মুজামুল আওসাদ গ্রন্থে এবং বায়হাকি শোয়াবুল ঈমান গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন। এ হাদিসের সনদে একজন বর্ণনাকারী রয়েছেন যার নাম যায়েদাহ ইবনে আবুর রাকাদ। তার সম্পর্কে ইমাম বুখারি বলেন, তার বর্ণিত হাদিস মুনকার। (শোয়াবুল ঈমান)। ইবনে রজব ও ইবনে হাজার তাকে যইফ (দুর্বল) বলেছেন। (লাতাইফুর মায়ারিফ)। অতএব দেখা যাচ্ছে হাদিসটি দুর্বল। তাই কেউ কেউ বলেন, যেহেতু এটা দোআ তাই এর ওপর আমল করা যেতে পারে। আবার অনেকে হাদিসটি দুর্বল হওয়ার কারণে নিষেধ করেন।

(৭) শাবানের রোযা: আয়েশা (রাযি) বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ (সা) এমনই সাওম রাখতেন যে, আমরা বলতাম তিনি সওম ভাঙ্গবেন না। আবার এমনই সাওম ভাঙ্গতেন যে, আমরা বলতাম তিনি সওম রাখবেন না। তিনি রমাযান ছাড়া কোন সম্পূর্ণ মাস সাওম রাখেননি। এ ছাড়া অন্য কোন মাসে শাবানের চেয়ে বেশী সওম পালন করতে আমি তাকে দেখিনি।’ (সহীহ বুখারী-১৮৩৩, সহীহ মুসলিম-১৯৫৬)

আরেকটি বর্ণনায় তিনি আরো বলেন, ‘নবী (সা) অল্প কিছু দিন ছাড়া পুরো শাবানে সওম রাখতেন।’ (সহীহ মুসলিম-১৯৫৭) উসামা বিন যায়েদ (রা) বলেন, আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! শাবান মাসে আপনি যতটা সওম রাখেন আর কোন মাসে আমি আপনাকে এতটা সওম রাখতে দেখি না? তিনি বললেন, ‘এটি এমন মাস যাতে বান্দার আমল রাব্বুল আলামীনের কাছে পেশ করা হয়। আর আমি চাই আমার সওম রাখা অবস্থায়ই তাঁর কাছে আমার আমল যেন উপস্থাপিত হয়।’ (সুনান আন-নাসায়ী, সহীহ আত-তারগীব ওয়াত তারহীব)

তথ্যসূত্র : নাগরিক

আজসারাবেলা/সংবাদ/জাতীয়/খন্দকার/ধর্ম