মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা ও বঙ্গবন্ধুকে পাঠ্যক্রমের সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে: ড. এম. শাহ্ নওয়াজ আলি | Aj SaraBela (আজ সারাবেলা)

মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা ও বঙ্গবন্ধুকে পাঠ্যক্রমের সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে: ড. এম. শাহ্ নওয়াজ আলি

প্রকাশিত :১৭.০৪.২০১৮, ৭:৪০ অপরাহ্ণ
  • প্রফেসর ড. এম. শাহ্ নওয়াজ আলি। সদস্য, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন। বিদগ্ধ, আলোকিতজন। দীর্ঘদিন নিজেকে যুক্ত রেখেছেন প্রকৃত অর্থে জ্ঞান মেধায় পরিপূর্ণ মানুষ গড়তে। চান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গড়ে উঠুক শুধু আজ নয় আগামী। সেই লক্ষে কাজ করছেন অনেকদিন। বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অনুপ্রাণিত করছে তরুণ প্রজন্মকেও। কথা বলেছেন, শিক্ষা, নৈতিকতা আর সামাজিক সংকট নিয়ে ‘আজ সারাবেলা’র সঙ্গে।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জববার হোসেনরবিউল ইসলাম রবি

আজ সারাবেলা : শিক্ষার সুযোগ আগের চেয়ে বেড়েছে। সরকার সহায়তাও করছে। কিন্তু শিক্ষার যে মৌলিক জায়গা, নৈতিকতা সেটার প্রসার কতটা ঘটছে?

ড. শাহ্ নওয়াজ আলি: অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে। কিন্তু যে নৈতিকতার কথা বললেন, এটা তো বোধ, বিবেক। এটা জাগ্রত করবার জায়গায় আমরা একটু হলেও পিছিয়ে আছি। আমাদের যে ঐতিহ্য ত্যাগের, মহানুভবতার, মানবিকতার সেখান থেকে আমরা সরে এসেছি। এই জায়গাগুলো যদি আমরা নতুন করে চিন্তা ও কর্মের মধ্যে নিয়ে আসতে না পারি তাহলে হয়তো কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব নয়। আজকে গ্রামের মা’কে ভুলে গেছি, চিরায়িত বাংলাকে ভুলে গেছি, গ্রামের কৃষককে ভুলে গেছি। প্রযুক্তির উৎকর্ষতার মধ্যে তাদের নিয়ে আসতে হবে। তবেই আমাদের জ্ঞান ও মেধার জায়গাটি সমৃদ্ধি হবে।

আজ সারাবেলা: তবে কি আমাদের পাঠ্যক্রমকে ঢেলে সাজানো প্রয়োজন?

ড. শাহ্ নওয়াজ আলি: বাঙালির যে জীবন সে জীবনের বোধকে আজকের সঙ্গে একত্রিত করতে হবে। বাঙালির যে সংগ্রাম ও অর্জন, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা, যার ভিত্তিতে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ।সর্বোপরি মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা ও বঙ্গবন্ধুকে পাঠ্যক্রমের সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে। বিদেশের ইতিহাস জানব, তবে নিজের ইতিহাস বাদ দিয়ে নয়।
আমরা বাংলাদেশকে জানি না, বঙ্গবন্ধুকে জানি না, ইতিহাস জানি না। এই অজ্ঞতা, আত্মঘাত। এই আত্মঘাত থেকে নিজেদের ফিরে আসতে হবে, বাঁচতে হবে। চিন্তা ও কর্মে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করতে হবে।

shah-nawaz-ali-sir-1-ajsarabela

প্রফেসর ড. এম. শাহ্ নওয়াজ আলি। সদস্য, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন।

আজ সারাবেলা: প্রশ্ন ফাঁস শুধু শিক্ষা নয়, সামাজিক অসুস্থতায় পরিণত হয়েছে। এর দর্শনগত জায়গাটি যদি ব্যাখ্যা করেন?

ড. শাহ্ নওয়াজ আলি: সমস্যাটার মূলে সামাজিক নৈতিকতার সংকট রয়েছে। যে কোন জিনিসের ‘চাহিদা’ থাকলে ‘যোগান’ থাকে। এটা ডিমান্ড এবং সাপ্লাইয়ের থিওরি। বাবা মা চাইছেন ছেলে ম্যাজিস্ট্রেট হোক, ডাক্তার হোক, ইঞ্জিনিয়ার হোক, আইটি স্পেশালিস্ট হোক। কিন্তু একটি বারও চাইছে না, মানুষের মত মানুষ হোক। বাবা মা শুধু অর্থের পিছনে ছুটছে। চাইছে সন্তানও বিত্ত বৈভাবের মালিক হোক। কিন্তু নৈতিকতার শিক্ষা কোথায়? কেন আজকে আমরা ফাঁস হওয়া প্রশ্ন খুঁজতে যাই? কেন সন্তানকে লেখাপড়া করতে বলি না? কেন অসুস্থ প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ি? উত্তর একটাই, নৈতিকতার সংকট আর অর্থের জন্য অন্ধ হওয়া। একে তাকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। দোষ আমাদের নিজেদের প্রত্যেকের।

অন্যায়ভাবে প্রাপ্তির ফসল কেউ ভোগ করতে পারে না। ব্যক্তি নিজেও না। মানসিকতার পরিবর্তন ঘটাতে হবে। সন্তানকে মিথ্যা যোগ্যতায় তৈরি করে লাভ নেই। সে তার ধারণ করতে পারবে না। আর ধারণ করতে না পারলে অর্জনও অসম্ভব। আমরা সমাজের ক্ষতি করছি। রাষ্ট্রের ক্ষতি করছি। পাশাপাশি সন্তানকে বিকলাঙ্গ হবার দিকে ঠেলে দিচ্ছি।

আজ সারাবেলা: বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকদের বড় একটি অংশ বিত্তবান ও ক্ষমতাবান। বিশ্ববিদ্যালয়ের মঞ্জুরী কমিশন এই ক্ষমতাবানদের নানা অনিয়মের প্রবণতা কতটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে?

ড. শাহ্ নওয়াজ আলি: মানুষের সঙ্গতি বেড়েছে পাশাপাশি বেড়েছে শিক্ষার চাহিদা। বিত্তবান অনেক মানুষই আছেন যারা শিক্ষানুরাগী। শিক্ষা নিয়ে তারা ভাবেন। অনেকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তুলেছেন।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন শতভাগ তদারকি করছেন। ইতিমধ্যে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালাও হয়েছে। সেটি কঠোরভাবে যাতে পালন হয় আমরা সে ব্যাপারে সচেষ্ট।

নীতিমালার মধ্য থেকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় উচ্চশিক্ষায় আরও এগিয়ে যাক সেটা কাম্য। বর্তমান সরকার শিক্ষা ও উচ্চশিক্ষাকে আরও এগিয়ে নিতে যে পদক্ষেপ নিয়েছে, কাজ করছে, তাতে সরকারি বেসরকারি কোন বিশ্ববিদ্যালয় চাইলেই অনিয়ম করে টিকে থাকতে পারবে না।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে আগে যে অনিয়মের অভিযোগগুলো ছিল তা এখন প্রায় নেই বললেই চলে। তারাও এখন শিক্ষার গুনগত মানের প্রশ্নে নিজেদের আরও উন্নততর করতে চাইছে।

প্রফেসর ড. এম. শাহ্ নওয়াজ আলি। সদস্য, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন।

আজ সারাবেলা: অন্য প্রসঙ্গে আসি। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে কোন লিখিত পরীক্ষার প্রচলন নেই, কেবল মৌখিক পরীক্ষার ভিত্তিতে নিয়োগ সম্পর্ন হয়ে থাকে। কেউ কেউ পরীক্ষা দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক হওয়াটাকে খুব অসম্মানজনক মনে করেন। এক্ষেত্রে আপনার মতামত কী?

ড. শাহ্ নওয়াজ আলি: এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে। মেধাবীদের সংখ্যাও বেড়েছে। এখন সরকারি বেসরকারি মিলিয়ে ১৩৫-১৩৯টি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে এখন থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে অভিন্ন নীতিমালা বাস্তবায়ন করা হবে। আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল কম ফলে বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। আমরা ইতিমধ্যেই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় যাতে লিখিত, মৌখিক ও ডেমনস্ট্রেশনের মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পর্ন করে সেজন্য চিঠি দিয়েছি।

আজ সারাবেলা: লক্ষ্য করলে দেখা যায়, বাণিজ্য শিক্ষার প্রতি যতটা আগ্রহী বিজ্ঞান শিক্ষার প্রতি ততটা আগ্রহী নয় শিক্ষার্থীরা। সাহিত্য বা দর্শন না পড়তে চেয়ে বিবিএ-এমবিএয়ের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠে। ফলে সহিঞ্চু, যুক্তিপ্রবণ মানুষ হওয়ার চেয়ে কট্টরপন্থী মানুষ হওয়ার প্রবণতা বেশি। এর সামাজিক, রাজনৈতিক কারণ কী হতে পারে বলে আপনার মনে হয়?

ড. শাহ্ নওয়াজ আলি: বাজার অর্থনীতির যুগে মানুষের কাছে উপার্জনই বড় হয়ে উঠেছে। মানুষ ছুটছে টাকার পিছনে। যুক্তি, জ্ঞান বিজ্ঞান, দর্শনে আগ্রহ কমে গেছে, এটি সামাজিক বাস্তবতা। পুঁজিবাদি ব্যবস্থা ব্যক্তিকে স্বার্থপর ও একা মানুষে পরিণত করছে। এর নেতিবাচক ফল ভোগ করছে সে নিজেই। আমি বিশ্বাস করি, সবার আগে মানুষ মানবিক হবে, বিজ্ঞানমনস্ক হবে, যুক্তিপ্রবণ হবে, মক্তচিন্তক হবে। মানুষ পরিচালিত হবে তার বোধ আর বিবেক দ্বারা, যা একজন মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি।

আজসারাবেলা/সাক্ষাৎকার/রই/১৭/এপ্রিল/২০১৮