বড় লেখক হওয়ার চেয়ে, ভাল মানুষ, বড় মানুষ হওয়া জরুরি জীবনে : জুলফিয়া ইসলাম - Aj SaraBela (আজ সারাবেলা)

বড় লেখক হওয়ার চেয়ে, ভাল মানুষ, বড় মানুষ হওয়া জরুরি জীবনে : জুলফিয়া ইসলাম

প্রকাশিত :৩০.০৫.২০১৮, ২:২৭ অপরাহ্ণ
  • বছর কয়েক আগে ‘লেখকের জীবন’, একটি তথ্যচিত্রে অধ্যাপক কবীর চৌধুরী, অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী যার লেখা ও লেখক জীবন নিয়ে ইতিবাচক বক্তব্য রেখেছেন, উচ্ছাস প্রকাশ করেছেন, তিনিই জুলফিয়া ইসলাম। উপন্যাস, গল্প, প্রবন্ধে তিনি নিরলস। লেখা তাকে তাড়িত করে, পরে সামাজিক দায়বদ্ধতাও যুক্ত হয়েছে। অন্ধকারে আলো ফেলে তুলে আনেন জীবনের গল্প। পেয়েছেন দেশে ও দেশের বাইরে অনেক পুরস্কার। তবে পাঠকের ভালবাসাকেই সবচেয়ে বড় পুরস্কার মনে করেন। ‘গান’ তার পুরনো ভাললাগা হলেও নতুনভাবে আন্দোলিত হয়েছেন। গান, সাহিত্য, প্রেম, পরকীয়া, সমাজ অনেক প্রসঙ্গেই কথা বলেছেন তিনি ‘আজ সারাবেলা’র সঙ্গে।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জববার হোসেনরবিউল ইসলাম রবি

আজ সারাবেলা: গান নিয়ে ইদানীং আপনি অনেক বেশি ব্যস্ত। গান লিখছেন, গাইছেন। হঠাৎ গানের প্রতি এতটা ঝুঁকে যাওয়ার কারণ কী?

জুলফিয়া ইসলাম : আসলে হঠাৎ নয় কিন্তু। গানের বিষয়টি ভেতরে বরাবরই ছিল। গান, কবিতাপ্রিয় মানুষ আমি। একটা সময় গান শিখেছিও। তবে অন্য ব্যস্ততার কারণে, জীবনের নানা প্রয়োজনে চর্চাটি হয়তো নিয়মিত হয়নি। গত কয়েক বছর থেকে আবার শুরু করেছি। ১০০টির বেশি গান আমার লেখা আছে। আমি বিটিভি’তেও অনলিস্টেড। যেহেতু গান লিখি, মনে আনন্দে বেদনায় গাই, তখন মনে হলো গানটা আরও মনোযোগ দিয়ে করি।

কলকাতার একটি স্টুডিওতে জুলফিয়া ইসলাম ও সুরকার উদয় বন্দোপধ্যায়।

আজ সারাবেলা: কদিন আগেই কলকাতা থেকে ঘুরে আসলেন। সেখানে কাজের সর্বশেষ খবর কী?

জুলফিয়া ইসলাম : অনেক বেশি কাজ যে আমি করি তা নয়। বেশি কাজ করার চেয়ে আমার মতে, কম কাজ প্রাণ ঢেলে করা উচিত। সৃজনশীলতা তো মনের ব্যাপার। চাইলেই তাড়া তাড়া কাজ করা সম্ভব নয়। মন না চাইলে কখনওই পারি না। সুবীর নন্দী আমার দুটি গান গেয়েছেন। রথীনদা একটি মরমি গান গেয়েছেন। কলকাতার শ্রীকান্ত আচার্য্য আমার দুটি আধুনিক গান করেছেন। আমি নিজে শাহীন সরদার, আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল, উদয় বন্দোপাধ্যায়ের সুরে কয়েকটি গান করেছি।

আর এবার উদয় বন্দোপাধ্যায়ের সুরে বেশ কিছু গানের কাজ করেছি। আমার কথা হলো যে কোন কিছু মানুষকে স্পর্শ করতে হবে। মানুষের মন ছুঁয়ে না গেলে সে শিল্প মূল্যহীন। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, সহজ কথা যায় না বলা সহজে। সহজ করে কোন কিছু বলতে পারা সবচেয়ে বড় যোগ্যতা। আমি সে চেষ্টাটি করি। আমি গান লিখে যাই/ আমি গান গেয়ে যাই/ বাংলার পথে চলতে চলতে/ হৃদয়ের কথা বলতে বলতে- আমি খুব সহজ ছন্দে, সহজ ভাষায় নিজের কথা, গানের কথা বলেছি। আবার আমি পরো জনমে হতে চাই না রাধা/ আজও পাইনি কি তাই কৃষ্ণের দেখা/বল কি করে রাধা হই/বল কি করে যে রাধা হই- এখানে আমি কনসেপচুয়ালি রাধাকে নতুন ভাবনা ভূমিতে নিয়ে এসেছি। নতুন কিছু, ভিন্ন কিছু যদি না থাকে তাহলে মানুষ আমার ভাবনায় কেন তাড়িত হবে? আমি সব সময় সে চেষ্টাই করি।

আজ সারাবেলা: গদ্য এবং গান দুটোর প্রকাশ ভঙ্গি আপনার ব্যাখ্যায় কী রকম, আপনিতো দুটো নিয়েই কাজ করছেন?

জুলফিয়া ইসলাম: দেখুন, আমি শিল্পের কোন কিছুকেই আলাদা করে দেখি না। একটা গানও উপন্যাস হয়ে উঠতে পারে। একটা উপন্যাসও গান হতে পারে। একটা গান আবার ছবি হয়ে উঠতে পারে। একটা ছবি হয়ে উঠতে পারে কবিতা। আমার কাছে শিল্প মাধ্যমের কোনটি খুব দূরবর্তী কিছু নয়। বরং সম্পর্ক যুক্ত প্রত্যেকটি।

বইমেলায় পাঠকদের অটোগ্রাফ দিচ্ছেন জুলফিয়া ইসলাম।

আজ সারাবেলা: কথাসাহিত্যে ‘থিমেটিক’ উপন্যাস আপনাকে বিশেষ পরিচিতি দিয়েছে। বিষয়ভিত্তিক উপন্যাসের প্রতি আগ্রহ বা দুর্বলতা কেন?

জুলফিয়া ইসলাম: ব্যক্তি জীবনের চেয়ে সমষ্টিগত জীবনের আনন্দ বেদনা আমার কাছে বরাবরই অধিক গুরুত্বপূর্ণ। বিষয়ভিত্তিক উপন্যাসে ব্যক্তির চেয়ে সমষ্টির কথা বলার সুযোগ বেশি। গত বইমেলায় প্রকাশিত ‘হৃদয়ের একুল-ওকুল’ উপন্যাসটি ছিল রোহিঙ্গাদের জীবন নিয়ে। এর আগে কখনও আমার উপন্যাস মুক্তিযুদ্ধ, নারী জীবন, মধ্যবিত্ত, তৃতীয় লিঙ্গ এমন অনেক বিষয় পরিভ্রমণ করেছে। কোন একটি জনপদ বা সম্প্রদায়ের মানুষের কথা একক ব্যক্তি মানুষের জীবন তুলে আনার চেয়ে আমার কাছে সবসময় অধিক গুরুত্ব বহন করেছে। যেহেতু শুধু নিজের জন্য নয়, মানুষের জন্যও আমাদের লেখা।

আজ সারাবেলা : প্রসঙ্গ পাল্টাই। সোসাইটির দিকে আসি। সামাজিক অস্থিরতা বাড়ছে। বাড়ছে পারিবারিক অস্থিরতাও। পারিবারিক সম্পর্ক, ব্যক্তি সম্পর্কেও ভাঙনের শব্দ শোনা যাচ্ছে। লেখক হিসেবে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

জুলফিয়া ইসলাম: দেখুন, ব্যক্তির যে অস্থিরতা সেটাই সমাজে প্রবাহিত হচ্ছে। পুঁজিবাদী কাঠামো ব্যক্তিকে ভোগবাদী করে তুলছে। যার প্রভাব পড়ছে ব্যক্তি সম্পর্কেও। যে মানসিকতার কারণে ব্যক্তি সম্পর্কের একগামিতার চেয়ে বহুগামিতার দিকে মনোযোগী হচ্ছে। এবং সেখানেও ভাঙনের সৃষ্টি হচ্ছে। কেন না বহুগামিতা ব্যক্তিকে কখনওই সম্পর্কের বিশ্বত্বতার মধ্যে রাখতে পারছে না, ব্যক্তি নিজেও থাকতে পারছে না। ফলে ভাঙন অনিবার্য হয়ে পড়ছে। এটা ঘটছে সব ক্ষেত্রে। প্রেমে কিংবা পারিবারিক ক্ষেত্রে।

আজ সারাবেলা: পরকীয়া বাড়ছে। পরকীয়ার কারণে খুন, হত্যাকাণ্ড এমন সব ঘটনার মাত্রাও বেড়ে যাচ্ছে। কী মনে হয় আপনার, কোন পথে সমাধান মনে করেন আপনি?

জুলফিয়া ইসলাম: প্রেম তো প্রেমই। প্রেমকে আমি প্রেম হিসেবেই দেখতে চাই। তবে সামাজিকভাবে, প্রেমের কারণে অন্য কেউ যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সে দিকগুলো বিবেচনায় রাখা উচিত। আমার সন্তান থাকতে পারে। এখন গিয়ে প্রেমে পড়লাম, সন্তানদের কি হবে? এসবও ভাবতে হবে। কখনও কখনও দেখা যায়, একই সঙ্গে একাধিক প্রেম। ‘এই প্রেম’ আদৌ কি প্রেম? একই সঙ্গে একজন মানুষ কি কখনও একই রকমভাবে অনেকের সঙ্গে জড়াতে পারে?
সম্পর্ক ভাঙতেই পারে। প্রেম নাও থাকতে পারে। তবে এক সঙ্গে অনেক প্রেম কখনই গ্রহণযোগ্য নয়। আমার মতে তা কখনই প্রেম নয়।

জুলফিয়া ইসলামের প্রকাশিত বইসমুহ।

আজ সারাবেলা : শেষ করব ব্যক্তিগত প্রসঙ্গে এসে। আপনি জুলফিয়া ইসলাম সমাজ কল্যাণ সংস্থা, একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। একজন লেখক তো তার লেখার মধ্য দিয়েই সামাজিক পরিবর্তন কল্যাণের জন্য কাজ করতে পারেন। প্রতিষ্ঠান করাটা কেন জরুরি মনে করলেন?

জুলফিয়া ইসলাম: লেখক তার লেখার মধ্য দিয়ে সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনে অংশ নেন। কিন্তু কখনও কখনও আরও প্রত্যক্ষভাবে মানুষের কল্যাণে অংশ নেওয়ার, ভূমিকা রাখার সুযোগ থেকে যায়। লেখার মাধ্যমে এক ধরনের কাজ তো করছি। আজ দীর্ঘ প্রায় ২০-২৫ বছর। যে মানুষেরা বঞ্চিত, বৈষম্যের শিকার তাদের জন্য আমার নিজেরও কিছু করার আছে বলে আমি মনে করি। সে জায়গা থেকে জুলফিয়া ইসলাম সমাজ কল্যাণ সংস্থার মাধ্যমে কাজ করতে চাই।

আমি লোক দেখানোয় বিশ্বাসী নই। মানুষের জন্য কল্যাণকর এমন সেবামূলক কাজে ব্যক্তিগত উদ্দ্যোগে অংশ নিয়ে আসছি আজ অনেক দিন। এই কাজগুলোকেই এখন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছি সংস্থার মাধ্যমে। কেননা প্রতিষ্ঠানের মধ্য দিয়ে আরও অনেক মানুষকে সেবা দেওয়া সম্ভব।

মানুষের জন্য প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কল্যাণকর কিছু করতে পারছি কিনা সেটাই আমার কাছে সবসময় অধিক গুরুত্ব বহন করে। বড় লেখক হওয়ার চেয়ে, ভাল মানুষ, বড় মানুষ হওয়া অনেক বেশি জরুরি জীবনে।

আজসারাবেলা/সাক্ষাৎকার/রই/কথাসাহিত্যিক/সাহিত্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*