বিদেশিদের নিরাপত্তায় আইন সংশোধন বিবেচনায়

নিজস্ব প্রতিবেদক: গুলশানে জঙ্গি হামলার পরিপ্রেক্ষিতে বিদেশি কূটনৈতিক মিশন ও কূটনীতিকদের নিরাপত্তা জোরদারের জন্য বাংলাদেশের প্রচলিত আইন ও বিধিমালায় ছোটখাটো সংশোধনের প্রয়োজন হলে সরকার তা করার বিষয়টি বিবেচনায় নিচ্ছে।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম রোববার বিকেলে তাঁর দপ্তরে গণমাধ্যমকর্মীদের এ তথ্য জানান।

গুলশানের জঙ্গি হামলার পর বিদেশিদের নিরাপত্তা বাড়ানোর জন্য সম্প্রতি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীকে সভাপতি করে একটি উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার টাস্কফোর্সের প্রথম বৈঠকে বিদেশি কূটনীতিক ও কূটনৈতিক মিশনের কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা নিশ্ছিদ্র করতে কিছু নতুন পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করেছে।

এদিকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কূটনীতিকদের নিরাপত্তা জোরদারের জন্য বিভিন্ন দূতাবাসকে আর্মার্ড ভেহিকেল (বিস্ফোরক নিরোধক বুলেটপ্রুফ গাড়ি) ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার কথা ভাবছে সরকার।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, স্পেনসহ কয়েকটি দেশ তাদের নিরাপত্তা জোরদারের জন্য অস্ত্র ব্যবহারের অনুমতি চেয়ে সরকারকে অনুরোধ জানিয়েছে। আর আর্মার্ড ভেহিকেল ব্যবহারের জন্য অনুমতি চেয়েছে জাপান, ইতালি, কানাডা ও নেদারল্যান্ডস।

বিদেশিদের নিরাপত্তায় সুপারিশকৃত নতুন কোনো পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে চাইলে কোনো মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। তবে তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন দূতাবাসের নিরাপত্তা জোরদারের জন্য তাদের কাছে আমরা সুপারিশ চেয়েছিলাম। তারা যেসব সুপারিশ দিয়েছে, তা বাংলাদেশের প্রচলিত আইন এবং আইনের বাইরে যে বিধিমালাগুলো থাকে, তাতে যদি ছোটখাটো সংশোধনের প্রয়োজন হয়, সেগুলো নিয়ে আলাপ-আলোচনা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হবে। মূল কথাটি হলো তাদের নিরাপত্তা আরেকটু বৃদ্ধি করা।’

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক জঙ্গি হামলার পর বিদেশিদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এবং বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকের পরিবারের সদস্যদের ঢাকা ছাড়ার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা রয়েছে। এ নিয়ে জানতে চাইলে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলেন, ‘দু-একটি দেশ স্বেচ্ছায় তাদের কূটনীতিকের পরিবারকে ঢাকা ছাড়ার অনুমতি দিয়েছেন। তবে আমাদের হাতে যে তথ্য উপাত্ত রয়েছে, তাতে দেখা যায়, প্রতিদিন গড়ে প্রায় এক হাজার নাগরিক বিদেশ যান। আর বাংলাদেশে আসেন প্রায় দেড় থেকে দুই হাজার মানুষ।’ তিনি বলেন, ‘গোয়েন্দা সংস্থা ও বহির্গমন বিভাগের কাছ থেকে পাওয়া এ তথ্য আমরা আমাদের বন্ধু দেশগুলোকে দিচ্ছি। গ্রীষ্মের ছুটির কারণে এই সময় লোকজন কম আসেন। ঈদের ৭ থেকে ১০ দিন আগে থেকে শুরু করে বাংলাদেশে আসার চেয়ে বাংলাদেশ ছেড়ে যাওয়া লোকজনের সংখ্যা থাকে বেশি। এ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে আসা-যাওয়ার ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক কোনো প্রবণতা এখনো আমাদের চোখে পড়েনি।’

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘অনেকে যেটা বলছেন, বিশেষ করে কিছু গণমাধ্যমে যে বলা হচ্ছে, বিদেশিরা বাংলাদেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছেন, এ তথ্য একেবারেই সত্যি নয়। গরমের ছুটি এবং লোকজন পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করছেন বলে বাংলাদেশে আসার সংখ্যা কমে গেছে। তবে আগস্টের শেষে এবং সেপ্টেম্বরের শুরুতেও যদি এই প্রবণতা অব্যাহত থাকে, তখন আমরা বুঝব যে এই সন্ত্রাসী হামলার কারণে লোকজন যাত্রা বাতিল করছেন।’ তিনি বলেন, ‘ওই ঘটনায় (গুলশানের হামলা) কিছুটা যে প্রভাবিত হয়েছে, এটা তো কেউ অস্বীকার করছি না। তবে আইনশৃঙ্খলার ক্ষেত্রে বর্তমান ধারা যদি অব্যাহত থাকে, তবে শিগগিরই তা স্বাভাবিক হয়ে আসবে। কারণ, বিভিন্ন কারণে যাঁরা বাংলাদেশে আসতে চান, তাঁদের ব্যাপারে বিভিন্ন সুপারিশও প্রতিনিয়ত পাচ্ছি।’

সিপিএ’র চেয়ারপারসন বাংলাদেশের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী বলেন, যেহেতু কয়েকটি দেশ নিরাপত্তাজনিত কারণে বাংলাদেশে ভ্রমণের ক্ষেত্রে সতর্কতা জারি করেছে, সেজন্য আমরা বাংলাদেশে এ বছর সম্মেলন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

তিনি জানান, বাংলাদেশে সম্মেলন না করার বিষয়টি সিপিএ সদরদপ্তরকে গত ৩ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে।

গত ১ জুলাই গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারি এবং ৭ জুলাই ঈদের সকালে শোলাকিয়ায় দেশের সবচেয়ে বড় জামাতের পথে জঙ্গি হামলায় ২৫ জন নিহত হন। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে নিহত হন সাত সন্দেহভাজন হামলাকারী। এরপর অস্ট্রেলিয়া, বৃটিশ আইল্যান্ডস অ্যান্ড মেডিটেরিয়ান (বি আইএম), কানাডা, ক্যারিবিয়ান, আমেরিকা ও আটলান্টিক এই পাঁচটি অঞ্চলের বেশ কিছু দেশ বাংলাদেশ ভ্রমণের সতর্কতা জারি করে।

জুলাই ও অগাস্টে অনুষ্ঠেয় দুটি আন্তর্জাতিক সভাও ঢাকা থেকে সরিয়ে নেয়া হয়। ঢাকায় সম্মেলন আয়োজন নিয়ে গত মাসে সিপিএ সদর দপ্তর থেকে শিরীন শারমিনকে ই-মেইল করেন সংগঠনটির সেক্রেটারি জেনারেল আকবর খান।

সেখানে বলা হয়, সিপিএভুক্ত নয়টি অঞ্চলের মধ্যে পাঁচটি অঞ্চলের কিছু শাখা নিরাপত্তার প্রশ্ন তুলে বাংলাদেশে ভ্রমণের বিষয়ে তাদের নাগরিকদের সতর্ক করেছে। এ কারণে সেসব দেশের আইন প্রণেতারা বাংলাদেশ সফরে আসবেন না।

স্পিকার বলেন, ‘এবারের সম্মেলনে কয়েকটি সংস্থার নির্বাচন হবে। এ কারণে আমরা একটু বড় পরিসরে এ সম্মেলন করতে চাই। এজন্য আমরা হোস্ট কান্ট্রি খুঁজছি। সিপিএভুক্ত সকল দেশকে ইতোমধ্যে চিঠি দেওয়া হয়েছে। আগামী চার মাসের মধ্যে আগ্রহী কোনো দেশ পাওয়া গেলে আমরা ২০১৬ সালের সম্মেলনটা করে ফেলব।’

বাংলাদেশ ২০১৭ সালের সম্মেলন অনুষ্ঠানে আগ্রহী জানিয়ে তিনি বলেন, ‘যেহেতু আমরা এবারই সম্মেলন করার সব প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিলাম, তাই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ২০১৭ সালের সম্মেলনটা বাংলাদেশে অনুষ্ঠানের প্রস্তাব দিয়ে রেখেছি।’