ডাকছে নীল জলের দ্বীপ

প্রণব কর্মকার : জীবনকে উপভোগ করতে হলে আপনাকে অবশ্যই যেতে হবে প্রকৃতির কাছে। কারণ প্রকৃতিই মানুষকে উদার হতে শেখায়। মন ভালো রাখতে প্রকৃতির বিকল্প কোন কিছু আছে কিনা- আমার তা জানা নেই। বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গা রয়েছে যেখানে গেলে মনে হবে, সৃষ্টিকর্তা হয়তো নিজ হাতে তৈরী করেছেন। প্রকৃতির অপরুপ সৌন্দর্য মাখানো অনেক আকর্ষণীয় অনেক পর্যটন এলাকা রয়েছে আমাদের দেশে। যা নিজ চোখে না দেখলে হয়তো জীবনেন স্বাধ মিটবে না।

ক্যারিবিয়ান অঞ্চল অথবা মালদ্বীপ কিংবা ঘন নীল জলের অপার সৌন্দর্যের ঠিকানা বলতে দূর দেশের কোনও সমুদ্রের বুকে জেগে থাকা কোনও অনিন্দ্য সুন্দর দ্বীপকে বুঝে থাকি আমরা। সেই অনিন্দ্য সুন্দর দ্বীপ রয়েছে আমাদের লাল সবুজের বাংলাদেশেও। বলছি সেন্টমার্টিনের কথা। নয়নাভিরাম সৌন্দর্য অবলোকনের ও ভ্রমণের একটি আকর্ষণীয় পর্যটন এলাকার নাম সেন্টমার্টিন।

এ দেশের সেরা দ্বীপগুলোর মধ্যে সেন্টমার্টিন অন্যতম। এখানে বছরজুড়ে পৃথিবীর নানা দেশের বহু মানুষের ভিড় লেগে থাকে। তারা দেখতে আসে দ্বীপের মানুষের জীবন, এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সমুদ্রের সঙ্গে মানুষের চমৎকার মিতালি ইত্যাদি।

অবস্থান
সেন্টমার্টিন দ্বীপ বাংলাদেশের সর্ব দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের উত্তর-পূর্বাংশে অবস্থিত একটি প্রবাল দ্বীপ। এটি কক্সবাজার জেলার টেকনাফ থেকে প্রায় ৯ কিলোমিটার দক্ষিণে এবং মিয়ানমারের উপকূল হতে ৮ কিলোমিটার পশ্চিমে নাফ নদীর মোহনায় অবস্থিত। প্রচুর নারিকেল পাওয়া যায়। বলে স্থানীয়ভাবে একে নারিকেল জিঞ্জিরাও বলা হয়ে থাকে। পূর্ব কথা সেন্ট মার্টিনের প্রাচীন নাম ছিল জাজিরা। স্থানীয় লোকদের মতে, আরব বণিকেরা দিয়েছিল এই নাম। পরবর্তীকালে জাজিরা স্থানীয় লোকদের মাধ্যমে নারিকেল জিঞ্জিরা বলে খ্যাত হয়ে ওঠে। কিন্তু পরবর্তীকালে ইংরেজরা একে সেন্টমার্টিন নামে অভিহিত করে বলে জানা যায়।

১৮৯০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে কিছু বাঙালি এবং রাখাইন সম্প্রদায়ের মানুষ এই দ্বীপের বসতি স্থাপনের জন্য আসে। এরা ছিল মূলত মৎস্যজীবি। যতটুকু জানা যায়, প্রথম অধিবাসী হিসাবে বসতি স্থাপন করেছিল ১৩টি পরিবার। এরা বেছে নিয়েছিল এই দ্বীপের উত্তরাংশ। কালক্রমে এই দ্বীপটি বাঙালি অধ্যুষিত এলাকায় পরিণত হয়। আগে থেকেই এই দ্বীপে কেয়া এবং ঝাউগাছ ছিল। সম্ভবত বাঙালি জেলেরা জলকষ্ঠ এবং ক্লান্তি দূরীকরণের অবলম্বন হিসাবে প্রচুর পরিমাণ নারকেল গাছ এই দ্বীপে রোপণ করেছিল। কালক্রমে পুরো দ্বীপটি একসময় ‘নারকেল গাছ প্রধান’ দ্বীপে পরিণত হয়।

আয়তন
সেন্টমার্টিন দ্বীপের আয়তন প্রায় আট বর্গকিলোমিটার ও উত্তর-দক্ষিণে লম্বা। এ দ্বীপের তিন দিকের ভিত শিলা, যা জোয়ারে তলিয়ে যায় এবং ভাটার সময় জেগে ওঠে। এগুলোকে ধরলে এর আয়তন হবে প্রায় ১০-১৫ বর্গকিলোমিটার। দ্বীপটি উত্তর ও দক্ষিণে প্রায় ৫.৬৩ কিলোমিটার লম্বা। দ্বীপের প্রস্থ কোথাও ৭০০ মিটার আবার কোথাও ২০০ মিটার। দ্বীপটির পূর্ব, দক্ষিণ ও পশ্চিম দিকে সাগরের অনেক দূর পর্যন্ত অগণিত শিলাস্তূপ আছে।

সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে সেন্ট মার্টিন দ্বীপের গড় উচ্চতা ৩.৬ মিটার। পাওয়া যায় সেন্ট মার্টিন দ্বীপে প্রায় ৬৬ প্রজাতির প্রবাল ১৮৭ প্রজাতির শামুক-ঝিনুক, ১৫৩ প্রজাতির সামুদ্রিক শৈবাল, ১৫৭ প্রজাতির গুপ্তজীবী উদ্ভিদ ২৪০ প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ, চার প্রজাতির উভচর ও ১২০ প্রজাতির পাখি পাওয়া যায়। স্থানীয়ভাবে পেজালা নামে পরিচিত এক ধরনের সামুদ্রিক শৈবাল সেন্ট মার্টিনে প্রচুর পাওয়া যায়। এগুলো বিভিন্ন প্রজাতির হয়ে থাকে তবে লাল অ্যালগি বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে জনপ্রিয়।

এ ছাড়াও রয়েছে প্রজাতির ১৯ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী। অমেরুদণ্ডী প্রাণীদের মধ্যে রয়েছে স্পঞ্জ, শিল কাঁকড়া। সন্ন্যাসী শিল কাঁকড়া লবস্টার ইত্যাদি। মাছের মধ্যে রয়েছে পরী মাছ, প্রজাপতি মাছ, বোল কোরাল, রাঙ্গা কই, সুঁই মাছ, লাল মাছ, উড়ক্কু মাছ ইত্যাদি।

প্রকৃতি ও পর্যটন
দেখতে পাবেন দ্বীপে কেওড়া বন ছাড়া প্রাকৃতিক বন বলতে যা বোঝায়, তা নেই। তবে দ্বীপের দক্ষিণ দিকে প্রচুর পরিমাণে কেওড়ার ঝোঁপ-ঝাড় আছে। দক্ষিণ দিকে কিছু ম্যানগ্রোভ গাছ আছে। অন্যান্য উদ্ভিদের মধ্যে রয়েছে কেওড়া, শ্যাওড়া, সাগরলতা, বাইন গাছ ইত্যাদি। প্রায় শত বছর আগে এখানে লোকবসতি শুরু হয়। বর্তমানে এখানে সাত হাজারেরও বেশি মানুষ বসবাস করে। দ্বীপের লোকসংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এখানকার বাসিন্দাদের প্রধান পেশা মাছ ধরা। পর্যটক ও হোটেল ব্যবসায়ীরাই প্রধানত তাদের কাছ থেকে মাছ কেনেন। ছোট মাছ পাটিতে বিছিয়ে, পিটকালা মাছ বালুতে বিছিয়ে এবং বড় জাতের মাছ পেট বরাবর ফেড়ে মাচায় শুকানো হয়। এ ছাড়াও দ্বীপবাসী অনেকে মাছ, নারিকেল, পেজালা এবং ঝিনুক ব্যবসা করে। এ ছাড়াও কিছু মানুষ দোকানের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে। ছোট ছোট শিশুরা দ্বীপ থেকে সংগৃহীত শৈবাল পর্যটকদের কাছে বিক্রি করে থাকে। সম্পূর্ণ সেন্ট মার্টিন দ্বীপেই প্রচুর নারিকেল এবং ডাব বিক্রি হয়।

সেন্টমার্টিনে আপনি সবচেয়ে ভাল জলবায়ু এবং আবহাওয়া পাবেন নভেম্বর ও ফেব্রুয়ারী মাসের মাঝামাঝি সময়ে। এটিই এখানকার প্রধান পর্যটন ঋতু। মার্চ ও জুলাই মাসের পর্যটকদের অবশ্যই আবহাওয়ার পূর্বাভাসের প্রতি সর্বদা খেয়াল রাখতে হবে। কেননা ঘূর্ণিঝড় এই সময়ে এখানে বারবার আঘাত করে। ১৯৯১ সালের ঘূণিঝড়ে এই দ্বীপটি সম্পুর্ণরূপে বিদ্ধস্ত হয়েছিল, কিন্তু পুনরায় উদ্ধার হয়েছে এবং ২০০৪ সালের সুনামির পরও এটি অক্ষত আছে।

দ্বীপটি একটি জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র। পর্যটন মৌসুমে এখানে প্রতিদিন ৫টি লঞ্চ বাংলাদেশের মূল ভূখন্ড হতে আসা যাওয়া করে। সেন্ট মার্টিন্স দ্বীপে বর্তমানে বেশ কয়েকটি ভালো আবাসিক হোটেল রয়েছে। একটি সরকারি ডাকবাংলো আছে। যেহেতু এখনই সময়- প্রিয়জনদের নিয়ে উপভোগ করে আসতে পারেন প্রকৃতির নয়নাভিরাম সৌন্দর্য।

অাজসারাবেলা/ফিচার/রই/ভ্রমণ