[english_date]

গ্রহণ বর্জনের সিদ্ধান্ত দর্শকদেরই নিতে হবে-মামুনুর রশীদ

প্রকাশিত :22.01.2019, 5:15 pm

মামুনুর রশীদ বাংলাদেশের নাট্যাঙ্গনের এক মহাতারকার নাম। স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের মঞ্চ আন্দোলনের পথিকৃত। অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি মঞ্চ ও টিভির জন্যে অসংখ্য নাটক লিখেছেন। বিভিন্ন সামাজিক ইস্যূ নিয়ে, শ্রেণী সংগ্রাম, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা অধিকার আদায়ের নানা আন্দোলন নিয়ে নাটক রচনা ও নাট্য পরিবেশনা বাংলাদেশের নাট্য জগতে মামুনুর রশিদকে একটা আলাদা স্থান করে দিয়েছে। ব্যক্তি থেকে হয়ে উঠেছেন নাট্যজগতের বৃহৎ প্রতিষ্ঠান।আজ সারাবেলা প্রতিনিধি মো. মারুফ কথা বলেছেন এই মহাতারকার সাথে। পাঠকের জন্য সেটি তুলে ধরা হল-

আজ সারাবেলা: বাংলাদেশে নাটকের ক্ষেত্রে মঞ্চ থেকে ইউটিউব যুগ। এই সময়টাকে কিভাবে মূল্যায়ন করবেন?
মামুনুর রশীদ: প্রযুক্তির উন্নয়ন তো আমরা বন্ধ করতে পারি না। একসময় শুধু মঞ্চনাটক ছিল, এরপর বেতার এল, বেতার থেকে ফিল্ম এল- টেলিভিশন এল। এরপর ইন্টারনেট এল, ইন্টারনেট থেকে ইউটিউব এবং অনলাইন মিডিয়া। এট প্রযুক্তির ধারাবাহিকতা। এটা আমরা রোধ করতে পারি না, এগুলো আমাদের বিনোদনকে সহজ করছে। এগুলো অপ্রতিরোধ্য, এগুলো ঠেকানোর কথা চিন্তা করাই উচিত নয়। তবে মানের প্রশ্নে গেলে এটা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ এখানে কোন সেন্সর নেই, যে যার ইচ্ছামত করছে। এটা কিছু ভালো লোকও ব্যবহার করছে, আবার কিছু খারাপ লোকও ব্যবহার করছে। এখানে আসলে দর্শকদেরই সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে কোনটা তারা গ্রহণ করবে, আর কোনটা বর্জন করবে। আমাদের দেশে খুবই কুৎসিত, অশ্লীল বিষয় ইউটিউবে ভাইরাল হচ্ছে, খুবই ফালতু মানের লোকেরা হিরো হচ্ছে- এটা আসলে নিয়ন্ত্রণ করারও উপায় নেই। আমরা যখন মঞ্চে কাজ করেছি তখন একটি নাটক নিয়ে র্দীঘদিন রির্হাসেল করেছি, নাটকের মাধ্যমে সমাজকে কি মেসেজ দিচ্ছি সেটা নিয়ে ভেবেছি। বিটিভির যুগেও এই ভাবনাটা ছিল। কিন্তু দেশে অধিকাংশ টেলিভিশন চ্যানেল হওয়াতে এই মেসেজ দেওয়ার ব্যাপারটির ইতি ঘটে। ইউাটউবের যুগে এসে সেটি একেবারে বলগাহীন হয়ে পড়েছে। এক্ষেত্রে আসলে যারা কাজ করছে তাদের বিবেকের কাছে প্রশ্ন করা ছাড়া কোন উপায় নেই। যদিও যারা এগুলো করছে তাদের সুস্থ চিন্তা করার বোধ আছে কিনা সেটি নিয়েও সন্দেহ আছে।

আজ সারাবেলা: একটা সময় সামাজিক মূল্যবোধ নিয়ে নাটক হত। ইদানিং নাটকে সেসব নেই, দর্শকদের জোর করে হাসানোর একটা চেষ্টা দেখা যায়। এবং সেগুলো খুব মানহীন। এ ব্যাপারে কি বলবেন?
মামুনুর রশীদ: এটা নিয়ে আমরা নাটকের পরিচালকদের সংগঠনের পক্ষ থেকে অনেক কাজ করছি। কিন্তু টেলিভিশন নাটক আসলে নিয়ন্ত্রিত হয় চ্যানেগুলো আর বিজ্ঞাপন দাতাদের একটা সুন্দর সম্প্রীতির মাধ্যমে। একটা বিশ মিনিটের নাটকে ত্রিশ মিনিট চলে বিজ্ঞাপন। আমরা বিজ্ঞাপন দাতাদের বোঝানোর চেষ্টা করেছি কিন্তু তাদের থেকে পজেটিভ প্রত্যুত্তর পাইনি। টেলিভিশন চ্যানেল এবং বিজ্ঞাপনদাতাদের এই নেটওর্য়াকটি সস্তা নাটকেকে প্রাধান্য দিচ্ছে।

আজ সারাবেলা: আমরা যে শুনে থাকি ‘নাটক সমাজ বদলের হাতিয়ার’। সেই জায়গা থেকে নাটক এখন কি অবস্থায় আছে?
মামুনুর রশীদ: এটা বলতেই পারেন যে আমাদের দেশের নাটক এখন সেই সমৃদ্ধ পর্যায়ে নেই। তবে সমাজে সচেতনতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে মঞ্চনাটক কিন্তু এখনও আগের মতই আছে। এই যে যুগে যুগে প্রযুক্তির এত বদল, তারপরও মঞ্চ হাজার বছর ধরে টিকে আছে।

আজ সারাবেলা: মানসম্পন্ন নাটক নির্মানের  ক্ষেত্রে আপনারা কি কিছু ভাবছেন?
মামুনুর রশীদ: আমরা চেষ্টা করছি। কিন্তু এটা আসলে এত অনিয়ন্ত্রিত হয়ে গেছে যে চাইলে খুব বেশি পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব হচ্ছে না। এখন লেখকের সংখ্যা হাজার হাজার, কে যে কোথা থেকে লিখছে, অভিনয় করছে তার ইয়াত্তা নেই। এদরকে মানুষ চেনেও না, অথচ দেখবেন আমাদের সময়কার বা অন্য যেকোন সময়ের যারা ভালো কাজ করেছে তাদেরকে মানুষই ঠিকই চেনে। বিনোদের সাথে বার্তা না থাকলে সেটা আসলে সমাজের কোন কাজে আসে না। এক্ষেত্রে যারা কাজ করছে তাদের শুভবুদ্ধির উদয় হোক, এই কামনা করা ছাড়া আমাদের আর কোন উপায় নেই।

আজ সারাবেলা: আপনি তো র্দীঘদিন ধরে কাজ করছেন। নিজের প্রাপ্তি নিয়ে আপনি কতটুকু সন্তুষ্ট?
মামুনুর রশীদ: অনেক দিন ধরে কাজ করছি, মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি, প্রশংসা পেয়েছি তবে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি আমি কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। এখন যে পরিস্থিতি চলছে তাতে নিজেই কাজ করার উৎসাহ হারিয়ে ফেলছি। তবু আশাবিাদী যে পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে।

আজ সারাবেলা: নাটক লিখছেন এখন?
মামুনুর রশীদ: মঞ্চের জন্য আমি এখনও লিখছি। আমি টিভির জন্য যত নাটক লিখেছি সেটা সফল হোক কিংবা ব্যর্থ হোক এমন একটি নাটক পাবে না সেখানে সমাজের জন্য পজেটিভ মেসেজ নেই। আমি সবসময় চেয়েছি মানুষের কল্যাণে লিখতে। তবে টেলিভিশনের জন্য লিখছি না।

আজ সারাবেলা: আপনারা লিখছেন না বলেই কি মানহীনরো সুযোগ পাচ্ছে?
মামুনুর রশীদ: আমরা যেন না লিখি তারা সেটাই চায়। স্থূল বিষয় নিয়ে নাটক হোক এটা এখন এরা চায় না। এরা এখন প্রেম,ভালোবাসা, প্রতারনা এসব বিষয় নিয়ে লেখা হোক সেটাই চায়। তাদের ধারনা দর্শক এখন আমাদের নাটক দেখবে না। অবশ্য যাদের দিয়ে করাচ্ছে তাদেরটাও দেখছে না। চ্যানেলগুলো এখন চায় কম টাকায় নাটক পেতে। আমি ত্রিশ মিনিটের নাটক করেছি আড়াই লক্ষ টাকা খরচ করে। এখন একটা রুমের মধ্যে দুইজন তিনজন নিয়ে নাটক হয়ে যায়। আমরা যখন নাটক করছি তখন একটা নাটকে নাতি, নাতনি, পূত্রবধূ দিয়ে একটা বৃহৎ পরিবার নিয়ে কাহিনী আর্বতিত হত। এখন নাটকে বাজেট কমাতে, চরিত্র কমাতে স্বামী আছে তো স্ত্রী নাই, শিশু শিল্পী তো নেই ই। ভারতীয় নাটক গুলোতে দেখবেন যে, এরকম একিটি বৃহৎ পারিবারিক আবহ থাকে। এজন্যই সেটা এখন আমাদের দেশের দর্শ করাও বেশি করে দেখছে।

আজসারাবেলা/বিনো/এমকে/সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.