[english_date]

একসঙ্গে যারা আট-দশটি উপন্যাস লেখেন তারা নেহাত-বাজারী: জুলফিয়া ইসলাম

প্রকাশিত :27.02.2019, 3:35 pm
  • লেখকের পূর্ণ সততা আছে বলেই, তিনি বলতে পারেন-ইতর প্রাণী প্রসব করে বেশি। জীবনের গভীর বোধ থেকে উপন্যাস লেখেন। সমাজকে দেখেন আতশকাঁচের নিচে ফেলে। তিনিই জুলফিয়া ইসলাম। বিজ্ঞাপন নয়, উৎকট প্রচারণা নয়, পাঠকের ভালোবাসাই তার শক্তি ও পরিচয়। জুলফিয়া কথা বলেছেন আজ সারাবেলা’র সঙ্গে বই, বই মেলা আর নিজের সম্পর্কে।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রবিউল ইসলাম রবি

আজ সারাবেলা: এবারের মেলায় প্রকাশিত বই নিয়েই কথা বলবো। আপনার নতুন উপন্যাস ‘কড়াঘাতে শব্দ শুনি’। চারপাশের সমাজ আর মানুষ নিয়ে লিখেছেন। লিখতে গিয়ে কান পেতে কি শুনেছেন?

জুলফিয়া ইসলাম: উপন্যাসটি মূলত জীবনের বোধ আর গভীরতাকে নিয়ে। জীবনের এক একটা সময় এক এক রকম। ফেলে আসা সময়গুলোকে আবার যদি নতুন করে পাওয়া যেত তার প্রতি এক ধরনের টান বোধ রয়েছে। পারস্পরিক চাওয়া-পাওয়া নয়, ব্যক্তির নিজের চাওয়া-পাওয়া, জীবনের প্রতি টান, মোহ আর শুদ্ধাচারের প্রতি এক ধরনের নির্মোহ আবেদন থেকে উপন্যাসটি লেখা।

আজ সারাবেলা: বিষয় বিচারে আপনার অভিনবত্ব্য রয়েছে। সব সময়ই থাকে। তবে আমাদের এখানে বেশিরভাগ ঔপনাস্যিকের ক্ষেত্রে এখনও পুরোনো ধারার প্রেম, বেকার জীবন, মধ্যবিত্তের টানাপোড়েন- ঘুরেফিরে এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। আজকের একজন তরুণ যে চারপাশে একই সঙ্গে উন্নয়ন দেখছে আবার সামাজিক অনাচার দেখছে। জঙ্গিবাদ দেখছে আবার সু-শাসনও দেখছে। পরকীয়া দেখছে আবার প্রেমের জন্য আত্নাহুতি দেখছে। এই যে চারপাশের বাস্তবতা ও দ্বান্দিকতা আমাদের উপন্যাসে কিন্তু তা নেই। তবে কেন পড়বে সে?

কথাসাহিত্যিক জাফর ইকবালের সঙ্গে জুলফিয়া ইসলাম।

জুলফিয়া ইসলাম: লেখককে আসলে অনেক বেশি চারপাশ দেখতে হয়। আমি একমত। আমরা এখনও কিছু নির্দিষ্ট ছকে আটকে রয়েছি। আরও যুক্ত করতে চাই, প্রযুক্তিতে অনেক এগিয়ে গিয়েছি আমরা কিন্তু আমাদের লেখায় সেই প্রযুক্তির জীবন কোথায়? অথচ আজকে জীবনেরই একটি বড় অংশ প্রযুক্তি। তরুণ পাঠকদের মন ও জীবনযাপন পর্যবেক্ষনে নিয়ে আসতে হবে। আজকের তরুণ আমার লেখায় যদি তার জীবন না পায় তবে কেন আমার লেখা পড়বে?

আজ সারাবেলা: এখনকার লেখকদের বড় একটি অংশ রয়েছে যারা সারা বছর কোথাও কিছু লেখেন না। শুধু বই মেলায় রেডিমেট লেখক হিসেবে আর্বিভূত হন এবং ব্যাপক প্রচারণা চালান। এমন লেখকদের সম্পর্কে আপনার মন্তব্য কি?

জুলফিয়া ইসলাম: আমি এদেরকে ‘তথাকথিত লেখক’ বলব। লেখা আসলে এক দিনের বিষয় নয়। বিজ্ঞাপনের বিষয়ও নয়। বিজ্ঞাপন দিয়ে বাণিজ্য মেলার পণ্য বিক্রি হতে পারে-বই নয়। যারা সারা বছর লেখেন না, লেখার সঙ্গেও থাকেন না তারা যত প্রচারণাই চালান, পাঠক তাদের লেখক হিসেবে আসলে আমলে নেন না। তারা নিজেদের লেখক বলাবার জন্য, অন্যদের কাছে গল্প করে শুধুমাত্র নিজের গুরুত্ব বাড়াবার জন্য এই কাজগুলো করেন। লেখক হবার আসলে কোন শর্ট-কাট পথ নেই।

আজ সারাবেলা: আপনি অনেক কাঠ-খড় পুড়িয়ে আজকের অবস্থানে এসেছেন। লেখক হিসেবে অনেক সংগ্রাম পাড়ি দিয়েই আজকে আপনি জুলফিয়া ইসলাম। লক্ষ্য করা যায় এখন সাহিত্যে তুলনামূলকভাবে মেয়েদের আগ্রহ কম। তার চেয়ে অনেক বেশি আগ্রহ বরং বিনোদন জগতে। কেন, কী মনে হয় আপনার?

জুলফিয়া ইসলাম: মূলত পুজিঁবাদের আগ্রাসন। মানুষ অনেক বেশি টাকার পেছনে ছুটঁছে। ফ্যাশন শো, মডেলিং এসবে কাচাঁ টাকা আরা দ্রুত পরিচিতি পাওয়া সহজ। আবার সুযোগ সন্ধানী পুরুষদের আনাগোনাও এখানে বেশি। অনেক মেয়েরাই লাভজনক মনে করে এসবের দিকে ঝুকছে। সাহিত্য বরাবরই শ্রমসাধ্য বিষয়। লেখাপড়া করতে হয়। সামাজিক নিরীক্ষা প্রয়োজন হয়। প্রতিষ্ঠা আসে আরও পরে। শর্ট-কাট ওয়েতে যদি শ্রম মেধা ছাড়া উপার্জনের সুযোগ থাকে তাহলে সহজটাকেইতো অনেকে নেবে।

অনুরাগী পাঠকদের সঙ্গে লেখক জুলফিয়া।

আজ সারাবেলা: আপনার সমসাময়িক অনেকেরই যখন এক মেলাতে একসঙ্গে আট-দশটি উপন্যাস বেরুচ্ছে সেখানে আপনার নতুন উপন্যাস মাত্র একটি। একাধিক উপন্যাস কেন লিখছেন না? নাকি অনেক বেশি লেখায় মনযোগী নন আপনি?

জুলফিয়া ইসলাম: ড. হুমায়ুন আজাদ বলেছিলেন, ইতর প্রাণী প্রসব করে বেশি। উপন্যাসের নামে আমি অপন্যাস লেখতে চাইনি। একইসঙ্গে যারা আট-দশটি করে উপন্যাস লেখেন তারা নেহাত- বাজারী। আমি মনে করি, তাদের আট-দশটি উপন্যাসে যা আছে, তার চেয়ে আমার একটি উপন্যাস অনেক বেশি শক্তিশালী।

আজ সারাবেলা: সমসাময়িক কাদের লেখা আপনাকে আকর্ষণ করে?

জুলফিয়া ইসলাম: সবার লেখাই কম-বেশি পড়ি। তবে তাদের লেখায় আগ্রহ থাকলেও আকর্ষণের ঘাটতি থেকে যায়। এখনও বিভুতিভূষণ, মানিক বন্দোপাধ্যায়, কমল কুমার মজুমদার, তারা শংকর আগ্রহ নিয়ে পড়ি। আর বাইরের লেখকদের মধ্যে অরহান পামুক, হারাকু মুরাকামি আর গ্যাব্রিয়াল গার্সিয়া মার্কেস-এর ঘোর আমার এখনও কাটেনি।

আজসারাবেলা/সাক্ষাৎকার/রই/লেখক/বই-মেলা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.