খেলোয়াড়, আমলা, নায়িকাদের লেখকের পর্যায়ে ফেলতে পারি না: হাসান জায়েদী তুহিন

  • বাংলা প্রকাশনার জগতে ‘পার্ল’ এর দ্যুতি দু’বাংলাতেই ছড়িয়ে আছে। মান বিচারে বই প্রকাশ করেন। চলতি সময়ে নেতা-নায়িকা আর আমলাদের বই প্রকাশের চল’কে নিন্দা করেছেন। লেখকরা সমাজের পালস্ বুঝতে পারছেন না- এমনও বলেছেন তিনি। নারী লেখক তৈরী না হওয়ার নেপথ্য, লেখকদের সততার অভাব, আর লেখক প্রধানমন্ত্রীর কাছে দাবী জানিয়েছেন প্রকাশনা শিল্পের উন্নয়নে।

যুক্তি দিয়ে, স্পষ্টভাবে কথা বলেছেন আজ সারাবেলা’র সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জব্বার হোসেন

আজ সারাবেলা: এখন সরকারি আমলা, সিনেমার নায়িকা, মাঠের খেলোয়াড়, রাজনৈতিক নেতা অনেকেই বই লিখেন। আপনার বিবেচনায় কাকে লেখক বলে মনে করেন?

হাসান জায়েদী তুহিন: এক সময় শওকত ওসমান, শওকত আলী, আক্তারুজ্জামান ইলিয়াস লিখতেন। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, আনিসুজ্জামান, হুমায়ুন আহম্মেদ, মুহাম্মদ জাফর ইকবাল, আনিসুল হক তারাও লিখছেন। তাদের অন্য পেশা থাকলেও তারা সারাবছরই লেখালেখি করেন। যারা লেখালেখিকে জীবনের সঙ্গে যুক্ত করতে পেরেছেন, তারাই প্রকৃত অর্থে লেখক। খেলোয়াড়, সরকারি আমলা কিংবা সিনেমার নায়িকা তাদেরকে আমি লেখকের পর্যায়ে ফেলতে পারি না। তারা সৌখিন। বড়জোড়, সিজনাল লেখক বলতে পারি।

পার্ল এর প্যাভিলিয়নে প্রকাশক।

আজ সারাবেলা: এই যে খেলোয়াড় কিংবা নায়িকা যাদের পরিচিতি আছে, যারা লেখক নন, অথচ বই বের করছেন, এটি কেন? আপনার কি মনে হয়?

হাসান জায়েদী তুহিন: এখানে প্রকাশক অনেক। বই মেলায় ৬’শ স্টল। যদি ৫’শ প্রকাশকও ধরি, তাহলে এত লেখক কোথায়? সব প্রকাশকতো আবার ভাল লেখকের বইও পান না, তখন তারা মনে করেন, যদি বাজার চলতি কোন নায়িকা বা খেলোয়াড় বা তথাকথিত নেতার বই করা যায় সেটা তাকে এক ধরনের আর্থিক সুবিধা দেবে। মূলত বাণিজ্যিক লাভের আশায় প্রকাশকেরা অলেখকদের বই প্রকাশ করেন।

আজ সারাবেলা: বাংলাদেশ এবং কলকাতা দুই মেলারই অভিজ্ঞতা রয়েছে আপনার। আমাদের পাঠকেরা মূলত কোন ধরনের বই খোঁজেন? আর কলকাতার পাঠকদের আগ্রহ কিসে?

হাসান জায়েদী তুহিন: আমরা এখনও কলকাতার বাজারে প্রবেশ করতে পারিনি। আমাদের পাঠকেরা কলকাতার লেখকদের গল্প উপন্যাস পরতে আগ্রহী কিন্তু কলকাতার পাঠকদের আমাদের গল্প, উপন্যাসে আগ্রহ নেই। আমাদের বই কিন্তু তারা পড়তে চায়। বই খোঁজে কলকাতার মেলায়। কিন্তু বিষয় বৈচিত্রের অভাবে আমরা তাদের বাজার হারাচ্ছি।

আজ সারাবেলা: কলকাতায় আমাদের বাজার নেই। কিন্তু এখানকার পাঠকদের চাহিদা কী পুরোপুরি পূরন করতে পারছে আমাদের লেখকেরা?

হাসান জায়েদী তুহিন: সময় এগিয়ে গেছে। কিন্তু আমাদের লেখকেরা সেই অর্থে সময়কে ধরতে পারছেন না। সমাজের পরিবর্তনটা বুজতে পারছেন না। এখন আর সাবেকী ধারার প্রেমের উপন্যাস লোকে পড়বে না। এটা লেখকদের বুঝতে হবে। সমাজে অনেক নতুনত্ব এসেছে। এটা বাস্তবতা কিন্তু আমাদের গল্প বা উপন্যাসে সে সব নেই। এখানে জঙ্গিবাদ নিয়ে কোন উপন্যাস নেই। রাজনৈতিক দূর্বিত্তায়নের কোন গল্প নেই। স্মাগলিং নেই, নারী পাচার নেই, সিরিয়াল কিলার নেই, শুধু প্রেম আর পরকীয়া আছে তাও সেটা অনেক পুরনো ধাঁচের। প্রযুক্তি নির্ভর কোন উপন্যাসও দেখি না। অথচ ডিজিটালি সমাজ অনেক এগিয়ে গেছে। তাহলে এই গল্প বা উপন্যাস লোকে পড়বে কেন?

আজ সারাবেলা: এবারের মেলায় পার্লের নতুন আকর্ষণ কী?

হাসান জায়েদী তুহিন: মুহাম্মদ জাফর ইকবালের ‘মানুষের ছোট বাচ্চা’ শিশুদের জন্য বইটি চমৎকার। আনিসুল হকের গদ্য কার্টুনের পাশাপাশি রয়েছে ‘বঙ্গবন্ধুর জন্য ভালোবাসা’ বইটি। সুমন্ত আসলামের ‘বাউণ্ডুলে’, মোস্তফা কামালের ট্রিলজি ‘অগ্নিমানুষ’, দিপু মাহমুদের ঐতিহাসিক উপন্যাস ‘আলমপনা’সহ বেশ কিছু চমৎকার প্রবন্ধের বই বের হয়েছে।

লেখকদের সাথে পার্ল-এর প্রকাশক।

আজ সারাবেলা: নারীরা সবক্ষেত্রে অনেক এগিয়েছে। কিন্তু সাহিত্যে নারী লেখকদের এক ধরনের সঙ্কট লক্ষণীয়। সেলিনা হোসেন, তসলিমা নাসরিন, নাসরিন জাহান, কিংবা শাহীন আখতারের পর আর কোন নারী লেখককে পাঠকরা সেভাবে পায়নি। সাহিত্যে মেয়েরা কি আগ্রহী নয়, নাকি নারী লেখকদের বাজার নেই?

হাসান জায়েদী তুহিন: যাদের কথা বললেন তারা অনেক সাহসী ছিলেন। লেখালেখির জন্য অনেক সংগ্রাম করেছেন, শ্রম দিয়েছেন। এখনকার মেয়েরা হয়তো অত শ্রম দিতে চান না। তাদের আগ্রহ অল্প শ্রম বিনিয়োগে অধিক মুনাফা। একজন মেয়ে যতটা না লেখক হতে চান, তারচেয়ে মডেল হবার আগ্রহ অনেক বেশী। এতে লাভ অনেক আর ডাকও আসবে অনেক দিক থেকে। অল্পদিনেই হয়তো সেলিব্রেটি হবে।

আজ সারাবেলা: এদেশে একসময় লেখকেরা ‘বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন’ করেছিল। প্রথাবিরোধী লেখক ছিলেন অনেকেই। অভিজিৎ বা দীপন হত্যাকাণ্ডের পর এখন প্রকাশকেরাও প্রথাবিরোধী এইসব লেখকদের বই প্রকাশ করতে চাইছেন না। প্রকাশকদের সাহসের জায়গাটা এখন অনেকাংশেই অনুপস্থিত। এই অনুপস্থিতি কেন?

হাসান জায়েদী তুহিন: এখন সবকিছুতেই রাজনীতি চলে এসেছে। সত্যটা কারও পক্ষে বা বিপক্ষে যাবে। তখনই যার যার মতো করে দলীয় সমর্থকেরা বাধা দেবে। এটা আগে ছিল না। এখন লেখকেরা বাণিজ্যিক হয়ে উঠেছে সত্য বলার নৈতিক সাহস নেই। এখন সাহসী মানুষের অভাব সবখানেই। দীপন বা অভিজিৎ-এর কথা বলছেন, তারা সাদুবাদ পাচ্ছে কিন্তু কয়জন লোক তাদের পরিবারের খবর নিচ্ছে।

আজ সারাবেলা: টানা তৃতীয় মেয়াদে সরকার আবার ক্ষমতায়। একজন প্রকাশক হিসেবে সরকারের কাছে এই শিল্পের জন্য কি চাইবার আছে?

হাসান জায়েদী তুহিন: আমরা খুব সৌভাগ্যবান যে, আমাদের প্রধানমন্ত্রী একই সঙ্গে একজন লেখক এবং সাহিত্যপ্রেমী মানুষ। বাঙালি সংস্কৃতিকে তিনি পুরোপুরি ধারণ করেন। প্রকাশনাকে শিল্প হিসেবে ঘোষনা করা হোক। কাগজের দামে বিশেষ ছাড় দেওয়া হোক। আর সরকারি উদ্যোগে জেলায় জেলায় বছরজুড়ে বই মেলা হোক। সেই সঙ্গে সরকারি বেসরকারি গ্রন্থাগারগুলোকে সচল করার উদ্যোগ নিক সরকার। তবেই বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা সোনার মানুষে ভরে উঠবে।

আজসারাবেলা/সংবাদ/রই/সাক্ষাৎকার/বই-মেলা