আজ থেকে তিনি আমাদের ‘বঙ্গবন্ধু’

সারাবেলা রিপোর্ট : ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯। বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের আপোষহীন নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে বিভিন্ন সময় বাংলার নয়নমণি, বঙ্গশার্দুল, অবিসংবাদিত নেতা, বাঙালির মুক্তিদাতাসহ বিভিন্ন নামে-উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছে। কিন্তু ২৩ ফেব্রুয়ারির তৎকালীন রেসকোর্স ময়দান বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ আয়োজিত গণসংবর্ধনা সমাবেশের ইতিহাস ভিন্ন। ওই দিনের পর শেখ মুজিবুর রহমানেকে বিশ্ববাসী চিনেছে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’ নামে।

আগরতলা মামলা থেকে মুক্তি লাভের পর রেসকোর্স ময়দানে শেখ মুজিবুর রহমানকে দেয়া ওই গণসংবর্ধনায় দশ লাখেরও বেশি মানুষের রায় নিয়ে ঐদিন তৎকালীন ডাকসুর ভিপি ও সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি তোফায়েল আহমেদ ঘোষণা করেন ‘আজ থেকে তিনি আমাদের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’।

সেদিনের স্মৃতিচারণে সেদিন সেই ছাত্র নেতা, বর্তমানে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য তোফায়েল আহমেদ বলেন, ২১ ফেব্রুয়ারি পল্টনে লাখো মানুষের সমাবেশে বক্তব্যে আমি বলেছিলাম, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্তি দিতে হবে। ঠিক তার পরদিন ২২ ফেব্রুয়ারি পাক-স্বৈরশাসক বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। তারপরের দিন ২৩ ফেব্রুয়ারি সেই ঐতিহাসিক ১০ লাখ লোকের বিশাল সমাবেশে জাতির জনককে বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ঘোষণা করি।

সেদিন রেসকোর্স ময়দান যারা দেখেননি তাদের বলে বোঝানো যাবে না, সেদিনের জনসমাবেশের কথা। আমরা যখন সেখানে পৌঁছাই তখন রেসকোর্স ময়দান কানায়-কানায় ভরা। ট্রেন-বাস-ট্রাক বোঝাই হয়ে সারা দেশ থেকে মানুষ এসেছে। ঢাকার মানুষ তো আছেই। এতো মানুষ দেখে আমি অভিভূত হয়ে পড়লাম। এত মানুষ কোনদিন একসাথে দেখিনি। আমার সঙ্গে বন্ধুরাও স্তম্ভিত। কিন্তু কত সুশৃঙ্খল তারা।এরাই তো আমাদের শক্তি…।


‘সেদিনের সমাবেশে যারা এসেছিলেন তাদের অনেকেই পত্র-পত্রিকায় আমাদের নাম শুনেছেন বা দেখেছেন। সেই ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ছাত্র নেতারা আজ লাখো জনতার সামনে। যখন আমরা মঞ্চে এসে দাঁড়ালাম সেদিনের কথা আজও আমরা মনে পড়ে। কি এক শিহরণে আমার চোখ ফেটে পানি নেমে এসেছিলো।’

এসময় মঞ্চে থাকা ছাত্র নেতাদের স্মরণ করে তৎকালীন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ সভাপতি বলেন, ওই মঞ্চে আমার সঙ্গে ছিলো ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতা আব্দুর রউফ, খালেদ মোহাম্মদ আলী, শামসুদ্দোহা, সাইফুদ্দিন আহমেদ মানিক, জামাল হায়দার, মাহবুবুল্লাহ, ফখরুল ইসলাম মুন্সী, ইব্রাহিম খলিল নাজিম, কামরান চৌধুরী। তাদের জ্বলজ্বলে মুখগুলো আজও আমার সামনে ভাসে।

ওই সমাবেশে সভাপতিত্ব করা তার জীবনের বড় পাওয়া মন্তব্য করে তোফায়েল আহমেদ বলেন, বাংলার অবিসংবাদিত শ্রেষ্ঠ নেতা, শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী- শেখ মুজিবর রহমান যে মঞ্চে উপস্থিত সে মঞ্চের সভাপতি আমি। এর চেয়ে বেশি একজন ছাত্রের জীবনে বড় পাওয়া আর কী হতে পারে? নিয়ম অনুযায়ী সবার বক্তৃতা শেষে আমার বক্তৃতা দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু নেতার বক্তৃতা দেওয়ার পর আমি বলব এবং আমার ভাষণ কেউ শুনবে এমন আশা করার দুঃসাহস আমি কেন আমার বন্ধু নেতারাও তখন করেননি। তাই শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণের আগে আমাকে দাঁড়াতে হলো। যাকে গণসংবর্ধনা দিচ্ছি তিনি ভাষণ দেবেন সবার শেষে, সেটাই হয়েছিল।

সভার পূর্বেই ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ তোফায়েল আহমেদকে বিশেষ দায়িত্ব দিয়েছিলো। ভাষণ দেয়া সে দায়িত্বের কাছে গৌণ ছিলো মন্তব্য করে তিনি বলেন, আমার জন্য অবশ্য ভাষণ দেয়া তেমন জরুরি ছিল না। এর চেয়ে অনেক বড় দায়িত্ব আমার উপর অর্পণ করা হয়েছিল। সেটা হলো ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে জাতির অনুমোদন নিয়ে আমাদের হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী শেখ মুজিবুর রহমানকে একটি উপাধি দেয়া। যে উপাধি তার নাম যা তার নামের সঙ্গে অবিনশ্বর হয়ে থাকবে।

শেখ মুজিবুর রহমানকে কী উপাধিতে ভূষিত করা হবে তা নিয়ে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিলো জানিয়ে তিনি বলেন, গণসংবর্ধনায় উপাধি প্রদান নিয়ে আমরা ছাত্র নেতৃত্ব আলোচনায় বসেছিলাম। তখন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্য সৃষ্টি হয়েছে।

সমগ্র জাতি আমাদের নেতৃত্বের প্রতি আস্থা স্থাপন করেছিলো। সুতরাং যে মানুষটি শুধুমাত্র পূর্ব বাংলার মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি এবং রাজনৈতিক স্বাধীনতা, স্বাধিকারের জন্য তার জীবনের মূল্যবান গুরুত্বপূর্ণ সময় জেলে কাটিয়েছেন; অকুতোভয় যার প্রতিটি উচ্চারণ, তাকে গণ উপাধিতে ভূষিত করার অধিকার অবশ্যই আমাদের আছে। ঐতিহাসিক কারণে এটা ছাত্র-সংগ্রাম পরিষদের কর্তব্যও ছিলো। যখন আমাদের সামনে সেই সুবর্ণ সুযোগ এসেছে আমাদের আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম সেটা আমরা করবো।

একটি কবিতা থেকে ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দটি বাঙালি ইতিহাসে অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গেছে জানিয়ে বর্তমান আওয়ামী লীগ এ নেতা বলেন, আমাদের এক ছোট ভাই নেতা শেখ মুজিবকে নিয়ে একটি কবিতা লিখেছিলো। যার নাম ছিল ‘বঙ্গবন্ধু’। কবিতার প্রতিটি লাইনে লাইনে আমাদের নেতাকে বঙ্গবন্ধু বলে সম্বোধন করেছিল। এর আগে বাংলার নয়ন মনি, বাংলার মুক্তিদাতা বিশ্লেষণে সম্মোধন করতাম।

ওই কবিতা থেকেই আমাদের আলোচনায় এসেছিলো ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিটি। আমাদের সকলের কাছেই বেশ ভালো লাগলো। আমরা সকলেই একমত হলাম। ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দটির অর্থ সে কি বিশাল! তিনিই বঙ্গবন্ধু যিনি ভালোবাসেন, শুধু ভালোবাসেন না ভালোবাসার জন্য আপোষহীন আমৃত্যু সংগ্রাম করেন, যার ভালোবাসা নির্লোভ-নিঃস্বার্থ।

শেখ মুজিবুর যখন বঙ্গবন্ধু তখন তিনি হয়ে ওঠেন বাংলার প্রকৃতির বন্ধু, বাংলার ভাষা কৃষ্টি সংস্কৃতির বন্ধু, বাঙালি জাতীয়তাবাদের বন্ধু, জাতীয়তাবোধের বন্ধু, মুক্তিসংগ্রামের বন্ধু সুতরাং একমাত্র শেখ মুজিবুর রহমানই ‘বঙ্গবন্ধু’। ওই বৈঠক থেকে আমরা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেই আমরা আমাদের নেতাকে বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত করবো।

সভাপতির বক্তব্যে ওই দিন রেসকোর্স ময়দানে মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়ানোর অনুভূতি তুলে ধরে তোফায়েল আহমেদ বলেন, সভাপতির ভাষণ দিতে দাঁড়ালাম…। জনগণের কাছে প্রশ্ন রাখলাম যে নেতা তার যৌবনের কাটিয়েছেন কারাগারে, মৃত্যু ভয় যার কাছে ছিল তুচ্ছ; যে নেতা বলেছেন, আমি ক্ষুদিরামের বাংলার মুজিব, সূর্যসেনের বাংলার মুজিব; যিনি বলেছিলেন বাংলার মানুষের জন্য আমি হাসিমুখে জীবন দিতে পারি… সেই নেতাকে কী আমরা একটি উপাধি দিয়ে বরণ করতে পারি?

সেদিন ১০ লক্ষ জনতা হাত তুলে আমাদের সমর্থন জানিয়েছিলো। সে সময়ে আমি প্রশ্ন করলাম বাঙালির শ্রেষ্ঠ সন্তান হাজার বছরের মহাপুরুষ, লাঞ্চিত-বঞ্চিত বাঙালির নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করলাম। আজ থেকে তিনি আমাদের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান…।

লক্ষ কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হলো: জয় বঙ্গবন্ধু…।

আজসারাবেলা/সংবাদ/রই/জাতীয়/রাজনীতি