বিয়ের প্রলোভনে শারীরিক সম্পর্ক মানেই ধর্ষণ নয়!

সারাবেলা রিপোর্ট: বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে কোনও নারীর সঙ্গে পুরুষের শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন কি ধর্ষণ বলে বিবেচিত হবে? এই প্রশ্নের উত্তরে ভারতের সর্বোচ্চ আদালত সম্প্রতি ‘হ্যাঁ’ বলে রায় দিয়েছে। তবে এ নিয়ে কিছু পর্যবেক্ষণও এসেছে নতুন করে।

ছত্তিশগড় রাজ্যে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে এক নারীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থান করে পরে অন্য একজনকে বিয়ে করেন এক চিকিৎসক। এ নিয়ে ধর্ষণের মামলা হয় তার বিরুদ্ধে। ওই মামলার রায় ঘোষণার সময় এমন পরিস্থিতি নিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দেন সুপ্রিমকোর্ট; যাতে উঠে এসেছে বিয়ের প্রলোভনে শারীরিক সম্পর্ক মানেই ধর্ষণ নয়।

বিচারক এল নাগেশ্বরা রাও এবং এমআর শাহ রায়ের পর্যবেক্ষণে বলেন, ডাক্তার তাকে বিয়ে করার আশ্বাস দেওয়ার পরই ওই নারী এমন সম্পর্কে যেতে রাজী হন। তিনি ভেবেছিলেন ব্যক্তিটির হয়তো তাকে বিয়ে করার ইচ্ছা রয়েছে।

এশিয়ার দেশ ভারতে বিয়ের আগেই যৌন সম্পর্ক স্থাপনের মতো বিষয়টিকে এখন পর্যন্ত স্পর্শকতার হিসেবেই দেখা হয়। এমন কোনও সম্পর্ক স্থাপনের খবর জানাজানি হলে ওই নারীর জন্য বিয়ে করা কঠিন হয়ে পড়ে। ধর্ষণের শিকার নারীদের পদে পদে হেনস্তা ও বিরুপ পরিস্থিতির শিকার হতে হয়।

ছত্তিশগড়ের ধর্ষণের ওই মামলার রায় পড়ার সময় এ নিয়ে বিস্তর পর্যবেক্ষণ দেন দুই বিচারক। তারা বলেন, ধর্ষণে অভিযুক্ত ব্যক্তির ‘স্পষ্ট ইচ্ছা’ ছিল ওই নারীকে বিয়ে না করা। শারীরিক সম্পর্ক হওয়ার অর্থ এই নয় যে- কারো এতে সম্মতি আছে। এটা পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে।

অবশ্য বিচারিক আদালতে দেওয়া ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে ১০ বছরের কারাদণ্ডের সাজা কমিয়ে ৭ বছরে আনেন সুপ্রিমকোর্ট। এর সঙ্গে সর্বোচ্চ আদালত মন্তব্য করেন, অপরাধের সাজা তাকে ভোগ করতেই হবে।

ভারতে এই ধরনের অপরাধের সংখ্যা একেবারেই কম নয়। সরকারের কাছে থাকা অপরাধ বিষয়ক তথ্যের হিসেব অনুযায়ী বিয়ের প্রলোভনে ধর্ষণের অভিযোগে দেশটিতে ২০১৬ সালে ১০ হাজার ৬৮টি এবং ২০১৫ সালে ৭ হাজার ৬৫৫টি মামলা হয়েছে।

বিয়ের প্রলোভনে ধর্ষণের মামলায় কর্ণাটক রাজ্যে চলতি মাসে এক ব্যক্তিকে জামিন দিয়েছে আদালত। আদালতের বিচারক ওই মামলার রায়ে বলেন, কোনও শিক্ষিত নারীর সঙ্গে কোনও ব্যক্তির বিয়ের আগে হওয়া শারীরিক সম্পর্ককে ধর্ষণ বলা যায় না। এমনকি পুরুষটি যদি বিয়ের প্রলোভনেও এমন সম্পর্কে জড়ান তবুও নয়।

২০১৭ সালে কেরালা রাজ্যের এক জ্যেষ্ঠ সাংবাদিককে গ্রেফতার করা হয় তারই এক সহকর্মীকে যৌন হেনস্তার মামলায়। পুলিশ জানায়, এক বছরের বেশি সময় ধরে প্রেম করার পর শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করেন তারা। ওই সাংবাদিক তাকে বিয়ের প্রতিজ্ঞাও করেছিলেন; তবে শেষ পর্যন্ত তা করেননি।

এক নারীকে যৌন হেনস্তার অভিযোগে ২০১৬ সালে দিল্লীতে স্কটল্যান্ডের এক অধিবাসীকে গ্রেফতার করে পুলিশ। বিয়ের প্রলোভনে প্রেম থেকে শারীরিক সম্পর্ক; এরপর আর বিয়ে করেননি তিনি। সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর এ নিয়ে অভিযোগ তোলেন ওই নারী।

সুপ্রিম কোর্ট তার আদেশে বিচারকি আদালতকে এমন মামলায় আরও সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দেন। আদালত বলেন, বিষয়টি খুব সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। যার বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ আনা হচ্ছে- দেখতে হবে সম্পর্কের শুরু থেকেই তিনি ওই নারীকে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন, নাকি শুধুই শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের জন্য সম্পর্কে গিয়েছিলেন।

সর্বোচ্চ আদালতের বক্তব্য অনুযায়ী যদি কোনও অভিযুক্ত পুরুষ প্রমাণ করতে পারেন- শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করা নারীটিকে তার বিয়ে করার অভিপ্রায় ছিল কিন্তু পরে কোনও পরিস্থিতিতে তার মানসিকতার পরিবর্তন হয়; তবে এটি ধর্ষণ বলে বিবেচিত হবে না।

সম্পর্কের শুরু থেকে নারীটির প্রতি পুরুষটির যদি শুধুই শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনে ইচ্ছা থাকে তবে তা ধর্ষণ বলে বিবেচিত হবে বলে মনে করেন ভারতের সুপ্রিমকোর্ট।

সুপ্রিমকোর্ট তার পর্যবেক্ষণে জানান, এমন পরিস্থিতিতে আসামির ‘মনোবাসনা’ কি ছিল তা প্রমাণ করা সহজ কিছু নয়। বিচার প্রক্রিয়া যেকোনও উপায়ে ভুলপথে যেতে পারে। এজন্য বিচারকদের সতর্ক থাকার পরামর্শও দেওয়া হয়।

ঘনিষ্ঠ কোনও সম্পর্কে জড়ানোর পর এমন পরিস্থিতির যেসব অভিযোগ আসে সেসব ক্ষেত্রে বিচারের সময় ধর্ষণ আইন প্রয়োগ করা কতটা উচিত তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেক ভারতীয়। নিজের পছন্দে সম্পর্কে যাওয়ার পর এমন কোনও অভিযোগ আনার প্রসঙ্গ নিয়েও ইতিবাচক নন তারা।

২০১৬ সালে মুম্বাই হাইকোর্ট এক আদেশে বলেন, প্রাপ্তবয়ষ্ক কোনও শিক্ষিত নারী সম্মতির ভিত্তিতে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের পর এ নিয়ে ধর্ষণের অভিযোগ করতে পারেন না।

মুম্বাইয়ের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী ফ্লাভিয়া অ্যাগনিজ বলেন, আমাদের মনে রাখতে হবে- বিয়ের প্রলোভনে যেসব ধর্ষণের অভিযোগ; তার অনেকই আসে সামাজিকভাবে পিছিয়ে পড়া দরিদ্র নারীদের পক্ষ থেকে। তাদের মিথ্যা লোভ দেখিয়ে ধর্ষণ করা হয়। অনেকেই আবার সন্তান সম্ভবাও হয়ে পড়েন। (বিবিসি থেকে অনূদিত)

আজ সারাবেলা/সংবাদ/সিআ/জীবন যাপন