বধিরতা থামাতে পারেনি যাদের ভালোবাসাকে

সারাবেলা রিপোর্ট: হাবিব এবং ক্যারোল দম্পতি লেবাননের নাগরিক। তারা একে অপরকে ভালোবাসে বিয়ে করেছেন। কিন্তু মজার বিষয় হলো এই দম্পতির দু’জনই বধির। সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ (ইশারা বা সাংকেতিক ভাষা) ব্যবহার করে তারা একে অন্যের সাথে ভাব আদান প্রদান করেন।

কানে না শোনার পাশাপাশি কথা বলতেও সমস্যা হয় তাদের দু’জনেরই। কিন্তু তাদের এই সমস্যার কারণে তাদের ভালোবাসা থেমে থাকেনি।

বিবিসিকে দেয়া সাক্ষাৎকারে ক্যারোল এবং হাবিব দু’জনেই জানান যে একে অপরকে আগে থেকে চিনলেও শুরুতে তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক ছিল না।

ধীরে ধীরে তাদের পরিচয় থেকে পরিণয় হয়। “ক্যারোল স্কুলে আমার নিচের ক্লাসে পড়তো। এরপর বধিরদের নিয়ে আয়োজিত নানা অনুষ্ঠানেও বেশ কয়েকবার তার সাথে আমার দেখা হয়। কিন্তু তখনও তার জন্য বিশেষ কিছু অনুভব করিনি।। একদিন এক বন্ধুর বাসায় এক অনুষ্ঠানে তাকে দেখে আমি হঠাৎই তার প্রেমে পড়ি”, বলছিলেন হাবিব।

ক্যারোলও শুরুতে হাবিবকে বন্ধুর মতোই দেখতেন। পরে ধীরে ধীরে সেই সম্পর্ক প্রেমে পরিণত হয়। ক্যারোল ক্যাথলিক খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী আর হাবিব শিয়া মুসলিম। দু’জনের সম্পর্কের বিষয়ে জানার পর তাদের পরিবার শুরুতে কিছুটা আপত্তি করলেও পরে মেনে নেয়।

কিন্তু লেবাননে ধর্মীয় স্বীকৃতি ছাড়া বিয়ে করা বৈধ নয়, তাই তারা পার্শ্ববর্তী দেশ সাইপ্রাসে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেছেন। হাবিবের জীবনের স্বপ্ন ছিল গায়ক হওয়ার। স্বপ্ন পূরণ না হওয়ায় অবশ্য খুব একটা দু:খিত নন তিনি।

“একবার টিভিতে এক গায়ককে দেখার পর থেকে আমার জীবনের স্বপ্ন গায়ক হওয়ার। কিন্তু আমি কানেও শুনতে পাই না, আর আমার কথাও অনেকেই বোঝে না। তাই দূর্ভাগ্যজনকভাবে গায়ক হওয়া আর হলো না।”

ক্যারোলও তার শারীরিক ত্রুটির বিষয়ে লজ্জিত নন। “আমার মাঝে-মাঝে প্রকৃতির শব্দ শুনতে, আশেপাশের মানুষের কথা শুনতে ইচ্ছা হয়। কারণ সবসময় তো আর অন্য কেউ তাদের কথা আমাকে বুঝিয়ে দিতে পারবে না”, বলেন ক্যারোল।

“কিন্তু এটা কোন বিষয় নয়, আমার অভ্যাস হয়ে গেছে।” ক্যারোলের ভাই-বোনদের মধ্যে একজনও বধির না হলেও হাবিবের চার ভাই-বোনের তিনজনই বধির।

ক্যারোল আর হাবিবের চাওয়া – তাদের সন্তান যেন বধির না হয়। “আমাদের সন্তান যদি কানে শুনতে পায় তাহলে তার জীবন অনেক সহজ হবে। বধিরদের জন্য লেবাননে জীবনধারণ অনেক কঠিন”, বলছিলেন হাবিব।

ক্যারোল বলেন, “একজন বধির ব্যক্তির জন্য সবচেয়ে কঠিন বিষয় হলো কাজ পাওয়া। যারা কানে শুনতে পায়, অধিকাংশ সময় তারা আমাদের কথা বুঝতে পারে না।”

“যখন তারা আমাদের কথা বুঝতে পারে না, তখন আমরা অনেকসময় হতাশ হয়ে যাই। অনেকসময় তারা আমাদের নিয়ে হাসাহাসিও করে।” ক্যারোল আর হাবিবের বিয়ের অনুষ্ঠানে স্থানীয় বধির গোষ্ঠীর সবাই আমন্ত্রিত ছিলেন।

তাদের বিয়ের প্রস্তুতির নানা কাজেও তারা তাদের এলাকার বধিরদের দায়িত্ব দিয়েছিলেন।
তারা মনে করেন, এর ফলে নিজেদের দুর্বলতাকে ছাপিয়ে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আত্মবিশ্বাস পাবেন বধিররা।

তাদের বিয়ের আংটি এবং পোশাকের ডিজাইনারও ছিলেন একজন বধির ব্যক্তি। এমনকি তাদের বিয়ের নাচের পরিচালকও ছিলেন একজন বধির ব্যক্তি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোর জনসংখ্যার সাড়ে তিন ভাগ মানুষ বধির। বিশ্ব বধির সংঘের নির্বাহী পরিচালক ইভা টুপি’র মতে বিশ্বের বধির শিশুদের আশি ভাগই কখনো পড়ালেখা করার সুযোগ পাননা। বিবিসি বাংলা।

আজসারাবেলা/সংবাদ/ইআর/ফিচার

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.