রমজানে সুস্থ্য থাকতে কেমন খাবার খাবেন…

  • ডা. মো. আব্দুল জলিল চৌধুরী
    রোজা ইসলামের ৫টি স্তম্ভের মধ্যে অন্যতম। রমজান মাসে এবাদতের সওয়াব অনেক বেশী। রোজা আমাদেরকে সংযম শিক্ষা দেয়। খাবারের ব্যাপারে সংযম পালন করে ইবাদতের জন্য শরীর সুস্থ্য রাখা জরুরী।

এবারের রোজা পড়েছে গ্রীষ্মকালে। দীর্ঘ প্রায় ১৪-১৫ ঘন্টা পানাহার থেকে বিরত থাকতে হবে। তাই খাবার দাবারের ব্যাপারে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। নতুবা অসুস্থ্য হয়ে পড়লে এবাদত করতে কষ্ট হবে। রোজার মাসে খাবার দাবারে বিশেষ কোন বিধি নিষেধ আরোপ করা হয়নি। খাদ্যের ব্যাপারে কোরআন হাদিসে যে সব সাধারণ বিধি নিষেধ আছে এখানেও সেটাই প্রযোজ্য।

একজন মানুষ যে ধরনের খাবারে অভ্যস্ত সে ধরনের খাবারই খাবেন। যেসব খাদ্য শরীরের জন্য ক্ষতিকর সেসব খাদ্য না খাওয়ার অভ্যাস এই মাসেই শুরু করা উচিত। সাথে সুষম খাদ্য খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত। এটা রমযান এবং পরবর্তী মাসগুলোতে সুস্থ্য থাকার জন্য ভাল।

চলুন জেনে নেওয়া যাক কোন খাবারগুলো আপনাকে সুস্থ্য রাখবে…
১. টাটকা শাক-সবজী, যার মধ্যে থাকে প্রচুর পরিমাণ আঁশ, ভিটামিন এবং খনিজ পদার্থ। শিম জাতীয় খাদ্য, যেমন- সীম, মটরশুটি, ডাল প্রভৃতি। বাদাম সব সময়ের জন্যই উপকারী।

২. তাজা ফল ও ফলের রস।

৩. আমিষের জন্য মাছ, মাংস, কম চর্বি যুক্ত দুধ ও দুগ্ধ জাতীয় খাদ্য। মাছ, মাংস বেশী ভাজি করে না খাওয়া ভাল। ফ্রাই করার চেয়ে বেকিং বা গ্রীল করে খাওয়া ভাল। ডিম প্রতিদিন একটি করে খাওয়া যেতে পারে।

৪. শষ্যদানার মধ্যে উত্তম হল লাল আটার রুটি, লাল চালের ভাত এবং আলু।

এবার আসুন, কোন কোন খাবার পরিহার করবেন…
১. ভাজাপোড়া খাদ্য,মাংস হউক আর অন্য কিছু হউক রোজা রেখে না খাওয়া ভাল। কলিজা, মগজ, মুরগীর চামড়া খাদ্য তালিকা থেকে বাদ থাকবে।

২. অতিরিক্ত চর্বি যুক্ত কোন খাদ্য এ সময়ে চলবে না।

৩. আইসক্রীম, পেস্ট্রি, বেশী বেশী মিষ্টি খাওয়া একদমই চলবে না। নারিকেলে ক্ষতিকর চর্বি জাতীয় তেল বেশী থাকে বলে না খাওয়া ভাল।

রমজানে দীর্ঘ উপবাসের পর ইফতার দিয়ে খাওয়া শুরু হয়ে সেহরী পর্যন্ত খাবার-দাবার চলে। এসময় অতিভোজনের ব্যাপারে সজাগ থাকতে হবে। মনে রাখা ভাল, রমজান ইবাদতের মাস, আল্লাহর সান্নিধ্যে আসার মাস। তাই এ সময় সুস্থ্য সতেজ থাকাটা অবশ্যই বাঞ্চণীয়।

রমজান মাসকে যেন আমরা খাদ্য উৎসবের মাসে পরিণত না করি। খেজুর দিয়ে ইফতার শুরু করা ভাল, প্রতিদিন ২-৩টি খাওয়া যেতেই পারে। খেজুরের অনেক উপকারিতা আছে। দীর্ঘ উপবাসের পর খেজুর শরীরে দ্রুত শক্তি যোগান দেয়। খেজুর সহজ পচ্য-বেশী আঁশ থাকার কারণে পায়খানা পরিস্কার হয়। খেজুর ভিটামিন ও খনিজ লবণ সমৃদ্ধ। খেজুর খেলে অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা কমিয়ে দিয়ে অতি ভোজন থেকে রক্ষা করে।

সরবত যেমন চিনি-লবন-লেবুর সরবত, ইসুপগুলের ভুষির সরবত এবং তাজা ফলের রস খাওয়া খুবই ভাল। দুধ ও ফল দিয়ে বানানো পানীয় যেমন- ব্যানানা শেক, ম্যাংগো শেক ইত্যাদিও রোজা ভাঙ্গার পর শক্তির উৎস হিসেবে ভাল কাজ করে। তারপর সবজী বা চিকেন স্যুপ খাওয়া যেতে পারে। স্বাস্থ্যসম্মত ভাবে রান্না করা হালিম খাওয়া যেতে পারে। অনেকের ইফতার করার সময় চিড়া-দই-কলা খাওয়ার অভ্যাস আছে। সেটাও চলে। অনেকে কাঁচা বুট খান সেটাও ভাল।

আমাদের দেশে বুট, মুড়ি, পিয়াজু এবং বেগুনী ইফতারের একটা অপরিহার্য অংশ। এটা যেন না হলেই চলে না। তবে এ ব্যাপারে পরিমিত হওয়া ভাল। জিলাপির ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করা ভাল। বিশেষ করে পরিমাণের ব্যাপারে, বিশেষ করে যাদের ডায়াবেটিস আছে বা শরীরের ওজন বেশী। কি তেল দিয়ে ভাজা হচ্ছে সেটাও দেখার বিষয়। মোটকথা অতিরিক্ত ভাজা পোড়া এবং বেশী মিষ্টি জাতীয় খাদ্য ইফতারের সময় পরিহার করা উচিত।

সেহরীর সময় জটিল, শর্করা জাতীয় আঁশ সমৃদ্ধ খাদ্য খাওয়া উচিত। এধরনের খাদ্য ধীরে ধীরে হজম হওয়ার কারণে দীর্ঘ সময় পর্যন্ত শরীরে শক্তি যোগান দেয়। এসময়ে লাল আটার রুটি, ভাত মুল খাদ্য হিসেবে খাওয়া যেতে পারে। সাথে শাক-সবজী, ফল-মূল আঁশযুক্ত খাদ্যের বাড়তি যোগান দেবে। সেহরীর সময় মিষ্টি না খাওয়া ভাল। তাতে খিদে বেড়ে যেতে পারে। বেশী লবণ যুক্ত খাদ্য খেলে পানির পিপাসা বেড়ে যায় বলে রোজা রাখতে কষ্ট হবে। চা-কফি পান করলে প্রস্রাবের পরিমাণ বেড়ে গিয়ে পানি শূণ্যতা দেখা দিতে পারে। বরং সেহরীর সময় তাজা ফলের রস খাওয়া যেতে পারে। সেহরীর সময় তাড়াহুড়া করে বেশী পানি পান না করা ভাল। বরং ইফতার ও সেহরীর মধ্যবর্তীকালীন সময়ে পানি বেশী পান করা শ্রেয়।

তারাবীহ নামাযের পর শোবার আগে কিছু খাওয়া ভাল। তবে এটা নির্ভর করে পূর্ববর্তী ইফতারের ধরণের উপর। ভারী ইফতার খেয়ে থাকলে এসময়ে হালকা খাবার খাওয়াই ভাল। অনেকে ইফতার কম খেয়ে তারাবীহ’র বেশী খাবার খেয়ে থাকেন। আবার এই মধ্যবর্তী সময়ে কিছু না খেয়ে সেহরীর সময় ভূড়ি ভোজন করাও ঠিক নয়। এই মধ্যবর্তী সময়কার খাবার-দাবার সেহরীর মতই হবে। যথা জটিল শর্করা জাতীয় খাদ্য, আঁশযুক্ত খাদ্য এবং আমীষ সমৃদ্ধ খাদ্য। সাথে তাজা ফল-মূল, তাজা শাক-সবজীও থাকবে। এই সময় বেশী পানি পান করা যেতে পারে। ডায়াবেটিস, কিডনী রোগ ইত্যাদি বিশেষ বিশেষ অসুখে খাবার-দাবারের ব্যাপারে অভিজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।

রমজান মাস শ্রেষ্ঠ রহমতের মাস। সংযম পালনও সংযম শিক্ষার মাস। সুষম খাদ্য খেয়ে পরিমিত ভোজন করে শরীরকে সুস্থ্য-সবল রেখে বেশী বেশী ইবাদত করতে পারাই হবে উত্তম কাজ।

লেখক: অধ্যাপক, মেডিসিন বিভাগ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

আজসারাবেলা/জীবন-যাপন/রই/স্বাস্থ্য

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.