নবজাতক যখন মাদকাসক্ত!

  • ডা. জাকির হোসেন
    নীলা বয়স পচিঁশের কোঠায়। পরিচয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। ব্যক্তিগত সমস্যা নিয়ে ইনবক্সে একের পর এক প্রশ্ন। তাকে এড়িয়ে গিয়ে বললাম হাসপাতালে আসেন। বললাম রোগী না দেখে কখনই চিকিৎসার মত জটিল শাস্ত্রের সিদ্ধান্ত দেয়া উচিত নয়। সে রাজি হলো না। বলল হাসপাতালে মানুষের ভীড়ে সে তার সমস্যার কথা খুলে বলতে পারবে না।

আমি তাকে বহিঃবিভাগে আসতে না বলে অন্তঃবিভাগে দেখা করতে বললাম। একদিন আসলেন নীলা। তার জীবনের গল্প শুনে রীতিমত মাথায় বাজ পড়ার মত অবস্থা হলো আমার।

নীলা গ্রামের সহজ সরল এক মেয়ে। মধ্যবিত্ত পরিবারে জম্ম। একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্মানে ভর্তির সুযোগ হওয়ার পর শহরে আসা। সে জীবনের এক নতুন যুদ্ধে অবতীর্ণ হলো সে। ঢাকায় থাকার মত কোন আত্মীয়- স্বজন না থাকায় একটি কর্মজীবী মহিলা হোস্টেলে থেকে সে পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে থাকে। কিন্তু সেখানকার খরচ চালাতে না পেরে সে ভার্সিটির ছাত্রী হোস্টেলে সিট পাওয়ার জন্য নারী নেত্রীদের সাথে সখ্যতা গড়ে তোলে। তাদের সাথে সখ্যতাই তার জীবনে আমূল পরিবর্তন এনে দেয়।

একদিকে সিট পাওয়ার মহাআনন্দ, অন্যদিকে নিজেকে হোস্টেলের মধ্যে ক্ষমতাধর হিসেবে গড়ে তোলার বাসনা। নারী নেত্রীদের সাথে ঘোরাফেরার এক পযার্য়ে সিগারেটের সাথে বেশ সখ্যতা। বাড়তে থাকে নিজের পরিচিতি পরিসর। রাজনীতির খাতিরে পরিচয় হয় ক্যাম্পসের পুরুষ রাজনৈতিক সহকর্মী এক ছাত্র নেতার সাথে। চলার পথে এক সময় তার সাথে শুরু হয় মন দেয়া-নেয়া, পরিনত হয় প্রণয়ে। বয়ফ্রেন্ডের হাত ধরে শুরু হয় মাদকের জগতে অবাধ চলাফেরা। শহরে নিজের অভিবাবক না থাকায় মাদকের জগতে বেপোরোয়া হয়ে ঊঠতে থাকে নীলা। বয়ফ্রেন্ডের চাহিদা মেটাতে প্রায় সকল ধরনের নেশার প্রতি আসক্তি বাড়তে থাকে। পরিবারকে না জানিয়ে একসময় বয়ফ্রেন্ডের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয় নীলা।

বিয়ের পরও স্বামীর সাথে মাঝে মাঝে রাতের আধারে নিজ কক্ষে নেশার জগতে হারিয়ে যায় দুজনে। ইতিমধ্যে নীলা নিজের শারীরিক পরিবর্তন লক্ষ্য করে। বুঝতে পারে সে মা হতে চলেছে। স্বাভাবিকভাবে নিজের লাগাম টেনে ধরার চেষ্টা করে নীলা। অনাগত সন্তানের চিন্তায় বিভোর হয়ে ভাবতে থাকে। স্বামী বিষয়টি জানার পর নীলাকে চাপ দিতে থাকে সন্তান নষ্ট করে ফেলার জন্য। নীলা কিছুতেই রাজি হয় না। এক পযার্য়ে অনেক কাকুতি মিনতি করে স্বামীকে সে রাজি করায়। কিন্তু নেশার জগত থেকে নীলা ফিলে আসতে পারে না। এক দিকে নেশা অন্যদিকে অনাগত সন্তানের স্বাস্থ্যঝুঁকি অধিক চিন্তিত থাকে নীলা। তার অনাগত সন্তানের স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়ে জানার জন্য ব্যকুল হয়ে থাকে। সামাজিক লোকলজ্জার ভয়ে সে চিকিৎসকেরও শরণাপন্ন হতে চায় না।

তাই সে অনলাইনে আমাকে একের পর এক প্রশ্ন করে যাচ্ছিল। সে যখন হাসপাতালে আমার কাছে সব খুলে বলল আমি তাকে বললাম অবশ্যই নেশার জগত থেকে আপনাকে ফিরে আসতে হবে। নতুবা আপনার অনাগত সন্তানও মাদকাসক্ত হয়ে পৃথিবীতে জন্মগ্রহন করতে পারে। যার ফলে জম্মের পর শিশুর ড্রাগ ওইথড্রয়াল সিন্ড্রোম চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় যাকে নিউওনাটাল অ্যাবস্টিনেন্স সিন্ড্রোম(এনএএস) বলা হয়ে থাকে।

সাধারণত পশ্চিমা বিশ্বে যেসব মায়েরা গর্ভাবস্থায় মাদক গ্রহণ করে, তাদের শিশুর মধ্যে এনএএস দেখা যায়। তারা মায়ের গর্ভে থাকা অবস্থায় মাদকাসক্ত হয়ে যায়। কিন্তু ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর শিশুরা এই ধরনের কিছু (মাদক) পায় না। তাই তারা স্বাভাবিক শিশুর মতো আচরণ করে না। তাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ থেকে থেকে কেঁপে ওঠে। তাদের মধ্যে অতিরিক্ত সক্রিয়তা এবং কান্নার লক্ষণ দেখা যায়।

বর্তমানে আমাদের দেশে যেভাবে সবর্স্তরের নারী-পুরুষের মধ্যে মাদকের ভয়াবহতা ছড়িয়ে পড়ছে,তাতে অচিররেই মাদকাসক্ত নবজাতকের সংখ্যা অতিমাত্রায় বৃদ্ধি পাবে- এ নিশ্চিত।

লেখক: চিকিৎসক ও কলামিস্ট

আজসারাবেলা/কলাম/রই/মাদক/

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.