আসন্ন বাজেট হোক শিক্ষা ও কর্মসংস্থান বান্ধব

  • অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমগীর কবীর
    “সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ” ভিশনকে সামনে রেখে এবং দুটো বিশেষ অঙ্গীকার (১) আমার গ্রাম, আমার শহর- প্রতিটি গ্রামে আধুনিক নগর সুবিধা সম্প্রসারণ (২) তারুণ্যের শক্তি-বাংলাদেশের সমৃদ্ধি: তরুণ যুব সমাজকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরিত করা এবং কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা ও আরও ১৯টি অঙ্গীকারসহ মোট ২১টি অঙ্গীকার ও বেশকিছু লক্ষ্য ও পরিকল্পনা ছিল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ২০১৮ সনের ঘোষিত নির্বাচনী ইশতেহারে।

এদেশের মানুষ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি আস্থা রেখে ৩০ ডিসেম্বর বিপুল ভোটে আওয়ামী লীগ ও তার মিত্রদের জয়যুক্ত করে আবারও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আনেন এবং তাদের বিশ্বাস বঙ্গবন্ধু কন্যা এ দেশের মানুষের আশা আকাঙ্খা পূরণ করবেন।

ঘোষিত ইশতেহারের অন্যতম অঙ্গীকার হল, সকল স্তরে শিক্ষার মান বৃদ্ধি। দলটি মনে করে আজকের বিশ্ব জ্ঞান ও বিজ্ঞানের বিশ্ব। শিক্ষার ক্ষেত্রে যে জাতি যত সাফল্য অর্জন করবে, সে জাতি জীবন-জীবিকার মানোন্নয়নে ও মানবিক গুণাবলী বিকাশে ততটাই অগ্রগতি ও সমৃদ্ধি লাভ করবে। অঙ্গীকার অনুযায়ী বর্তমান শিক্ষা বান্ধব আওয়ামীলীগ শুরু থেকেই শিক্ষার অধিকার ও মানোন্নয়নের অন্যতম অগ্রাধিকার খাত হিসেবে গুরুত্বারোপ করে আসছে।

২০২৩ সালের মধ্যে মাধ্যমিক শিক্ষা পাবে দেশের ৯৫% শিশু, এবার এমনটাই পরিকল্পনা। বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষনার চর্চা বাড়িয়ে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণাপত্র তৈরির ক্ষেত্রেও পরিকল্পনা আছে দলটির। দলটির লক্ষ্য ও পরিকল্পনায় বলা হয়েছে”

(১) শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ ও তার কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা। শিক্ষা পাঠক্রমের লক্ষ্য হচ্ছে, শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনুসিন্ধৎসা, জ্ঞান আহরণ এবং দেশ ও জাতির অবিকৃত সত্য ইতিহাস জানার অধিকতর সুযোগ সৃষ্টি করা।

(২) শিক্ষার মান উন্নয়নে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা। ভাষা জ্ঞান ও গণিত জ্ঞানের গুরুত্ব বিবেচনায় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুলের ভাষা ও গণিত শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের জন্য বৃহৎ প্রকল্প গ্রহন করা।

(৩) বাংলাদেশকে সম্পূর্ণভাবে নিরক্ষরতার অভিশাপমুক্ত করা। প্রাথমিকে ঝরে পড়ার হার শূণ্যে নামিয়ে আনা। গত এক দশকে প্রাথমিকে ঝরে পড়ার হার শতকরা ২০ ভাগের নীচে নেমে এসেছে। ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত ঝরে পড়ার হার শতকরা ৫ ভাগে নামিয়ে আনা।

(৪) স্কুল ফিডিং সকল গ্রামে, আধা মফস্বল শহরে এবং শহরের নিম্নবিত্তের স্কুলসমূহে পর্যায়ক্রমে সার্বজনীন করা।

(৫) প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত উপবৃত্তি প্রদান করা হচ্ছে, তা অব্যাহত রাখা।

(৬)শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের নিয়োগের একমাত্র মানদন্ড হবে মেধা, যোগ্যতা এবং অভিজ্ঞতা।

(৭) প্রশ্নপত্র ফাঁস ও নকল সর্বোতভাবে বন্ধ করার জন্য গৃহীত ব্যবস্থা জোরদার করা।

(৮) বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের গবেষণায় উৎসাহিত ও সহায়তা প্রদান করা এবং এজন্য বাজেট বৃদ্ধি করা। সকল জেলায় অন্তত একটি প্রাইভেট বা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা।

(৯) মাদ্রাসা শিক্ষায় ধর্মীয় শিক্ষার সাথে কর্মজীবনের প্রয়োজনীয় শিক্ষা প্রদানের জন্য কারিকুলাম যুগোপযোগী করা।

(১০) নৃ-গোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষায় শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করে প্রয়োজনীয় সকল বই বিনামূল্যে বিতরণ করা। আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থায়ও তাদের শিক্ষিত করে গড়ে তোলা।

(১১) সকল দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য প্রাথমিক স্তর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা পর্যন্ত সকলস্তরের বই ছাপানোর উদ্যোগ গ্রহণ করা । প্রতিবন্ধীদেরও মানবসম্পদে পরিণত করা।

(১৩) শিক্ষকদের বেতন ও মর্যাদা বৃদ্ধিসহ সরকারের নানা কল্যাণমুখী ও যুগোপযোগী উদ্যোগ সত্ত্বেও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকগণের বেতন গ্রেডসহ শিক্ষা খাতের কিছু কিছু ক্ষেত্রে যে বৈষম্য এখনও রয়ে গেছে, আগামী মেয়াদে তা ন্যায্যতার ভিত্তিতে নিরসনের উদ্যোগ গ্রহণ করা ।

সকল স্তরে শিক্ষার মান বৃদ্ধির পাশাপাশি-শিক্ষা, দক্ষতা ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির বিষয় নিয়েও পরিকল্পনা আছে দলটির।
(১)স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষাকে একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় যুগোপযোগী করতে কারিগরি শিক্ষা, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতে অধিকতর বিনিয়োগ করা।

(২) বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে গবেষণার জন্য আর্থিক ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি করা। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি অগ্রাধিকার দেয়া।

(৩)তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচি পর্যায়ক্রমে দেশের প্রতিটি উপজেলায় প্রসারিত করা।

(৪)প্রতিটি উপজেলায় ‘যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র’ স্থাপন করা । বিভিন্ন ট্রেডে প্রশিক্ষণ দেয়ার পাশাপাশি এই কেন্দ্রগুলোকে পর্যায়ক্রমে ‘তরুণ কর্মসংস্থান কেন্দ্র’ হিসেবে গড়ে তোলা

(৫)দক্ষতা বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য দুটি নতুন প্রকল্প হাতে নেয়া । ‘কর্মঠ প্রকল্প’-এর অধীনে “স্বল্প শিক্ষিত/স্বল্প দক্ষ/অদক্ষ” শ্রেণীর তরুণদের শ্রমঘন, কৃষি, শিল্প ও বাণিজ্যের উপোযোগী জনশক্তি হিসেবে গড়ে তোলা । ‘সুদক্ষ প্রকল্প’-এর অধীনে দক্ষ শ্রমিকের চাহিদা ও যোগানের মধ্যে যে ভারসাম্যহীনতা রয়েছে তা দূর করতে নানামুখি কর্মসূচি গ্রহণ করা।

(৬) জাতীয় পর্যায়ে স্বল্প, মধ্যম ও উচ্চ শিক্ষিত তরুণদের তথ্য সম্বলিত একটি ইন্টিগ্রেটেড ডাটাবেইজ তৈরি করা যার মাধ্যমে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের প্রয়োজন ও তরুণদের যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরির জন্য আবেদন করার আহ্বান জানাতে পারবে।

(৭) বেকারত্বের হার ২০২৩ সালে ১২ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং কর্মসংস্থানে কৃষি, শিল্প ও সেবার অংশ যথাক্রমে ৩০, ২৫ ও ৪৫ শতাংশে পরিবর্তন করা । ২০২৩ সাল নাগাদ অতিরিক্ত ১ কোটি ৫০ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার পদক্ষেপ গৃহীত হয়েছে। এছাড়া উক্ত সময়ে নতুনভাবে ১ কোটি ১০ লক্ষ ৯০ হাজার মানুষ শ্রমশক্তিতে যুক্ত হবে।

আওয়ামী লীগ ঘোষিত নির্বাচনী ইশতেহারে শিক্ষা ও কর্মসংস্থান বিষয়ক অঙ্গীকার, লক্ষ্য ও পরিকল্পনাসমূহ ছিল যুগোপযোগী। ঘোষিত অঙ্গীকার, লক্ষ্য ও পরিকল্পনাসমূহ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ হবে নিরক্ষরমুক্ত, উচ্চ-প্রযুক্তি নির্ভর, দারিদ্রমুক্ত উন্নত দেশে। এদেশের মানুষ বিশ্বাস করেন বর্তমান মেয়াদে জননেত্রী শেখ হাসিনার গতিশীল নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ তার শিক্ষা ও কর্মসংস্থান বিষয়ক নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়ন করবে এবং দেশকে আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর, উন্নত রাষ্ট্রে পরিনত করবে। তাই আসন্ন বাজেট হউক শিক্ষা ও কর্মসংস্থান বান্ধব।

লেখক: অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমগীর কবীর, সাবেক প্রভোস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

আজসারাবেলা/মতামত/রই/

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.