চীনবিরোধী বিক্ষোভে উত্তাল হংকং

সারাবেলা রিপোর্ট: চীনবিরোধী অব্যাহত বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে পড়েছে হংকং। গত ৯ জুন রাতে কথিত অপরাধী প্রত্যর্পণ বিলের বিরুদ্ধে অঞ্চলটির রাজপথে নামে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ। রাজপথে বিক্ষোভকারীদের ঢল এখনও অব্যাহত আছে। বুধবারও অঞ্চলটির সরকারি অফিসে যাওয়ার প্রধান সড়কগুলো অবরোধ করে রেখেছে হাজার হাজার বিক্ষোভকারী। তবে ব্যাপক গণআন্দোলনের মধ্যেই সোমবার অঞ্চলটির শাসক বেইজিংপন্থী হিসেবে পরিচিত ক্যারি ল্যাম সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, কথিত ওই অপরাধী প্রত্যর্পণ বিলে কোনও কাটছাঁট করা হবে না। বুধবার তার কার্যালয় সংলগ্ন রাস্তায়ও বিক্ষোভ প্রদর্শন করে বিক্ষুব্ধ মানুষ। এ সময় সেখানে মোতায়েন দাঙ্গা পুলিশের শত শত সদস্য তাদের আর সামনে অগ্রসর না হওয়ার হুঁশিয়ারি দেয়।

মূলত চীন ও তাইওয়ানে অপরাধী প্রত্যর্পণ সংক্রান্ত প্রস্তাবিত একটি বিলের বিপক্ষে এই বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তবে বিক্ষোভকারীদের মূল ক্ষোভ চীনের সঙ্গে এ ধরনের সমঝোতা নিয়ে। বেইজিংয়ের দুর্বল আইন এবং মানবাধিকার রেকর্ডের কারণে সেখানে কাউকে ফেরত পাঠানো নিরাপদ মনে করছেন না হংকংয়ের সাধারণ মানুষ। তারা মনে করছেন, বিলটি পাস হলে তা হংকংয়ের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে চীনের হস্তক্ষেপের সুযোগ বাড়িয়ে দেবে।

প্রস্তাবিত বিলে সন্দেহভাজন অপরাধীকে চীন ও তাইওয়ানে ফেরত পাঠানোর পথ সুগম করা হয়েছে। কিন্তু চীন এই আইনের সুবিধা নিয়ে হংকংয়ের বাসিন্দাদের ওপর খবরদারি বাড়াতে পারে বলে আশঙ্কা থাকায় বিষয়টি সেখানে রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। ফলে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের সাধারণ বাসিন্দারা ছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্রও এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

২০১৮ সালের এক ঘটনার প্রেক্ষিতে এই বিলটি তৈরি করা হয়। তাইওয়ানে ছুটি কাটানোর সময় অন্তঃসত্ত্বা বান্ধবীকে হত্যার অভিযোগ ওঠে হংকংয়ের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। কিন্তু তাইওয়ানের সঙ্গে হংকংয়ের বন্দি বিনিময়ের কোনও চুক্তি না থাকায় সেই ব্যক্তিকে এখন তাইপেতে বিচারের জন্য পাঠানো যাচ্ছে না। কিন্তু এখন তাইওয়ানও জানিয়েছে, সন্দেহভাজন সেই খুনের মামলার আসামিকে ফেরত নিতে চায় না তারা। কেননা এটি এমন এক উদাহরণ তৈরি করবে যা চীন ভবিষ্যতে কাজে লাগাতে পারে।

হংকং চীনের বিশেষ প্রশাসনিক অঞ্চল হিসেবে বিবেচিত হলেও ২০৪৭ সাল অবধি অঞ্চলটির স্বায়ত্তশাসনের নিশ্চয়তা দিয়েছে দেশটি। ১৫০ বছর ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনে থাকার পর লিজ চুক্তির মেয়াদ শেষে ১৯৯৭ সালের ১ জুলাই অঞ্চলটি চীনের কাছে ফেরত দেওয়া হয়েছিল।

হংকংয়ের জনসংখ্যা প্রায় ৭৪ লাখ হলেও, ১২শ’ জনের একটি বিশেষ কমিটি নেতা বাছাইয়ে ভোট দেওয়ার সুযোগ পান। অঞ্চলটির নেতা বা প্রধান নির্বাহী ক্যারি ল্যামের দাবি, হংকং যে বিশেষ স্বাধীনতা উপভোগ করে, নতুন আইনের ফলে তার কোনও ক্ষতি হবে না। তবে গণতন্ত্রপন্থী বিক্ষোভকারীরা বলছেন, আইনটির মাধ্যমে অঞ্চলটির রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বীদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করবে বেইজিং। এর প্রতিবাদ জানাতেই তারা রাজপথের বিক্ষোভে শামিল হয়েছেন।

সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ক্যারি ল্যাম দাবি করেন, এই আইনের প্রয়োজন রয়েছে এবং এতে মানবাধিকারের রক্ষাকবচগুলো যুক্ত করা হয়েছে। তার দাবি, প্রস্তাবিত আইনটি বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে তোলা হয়নি। বিবেকের তাড়নায় এবং হংকংয়ের প্রতি অঙ্গীকার থেকেই এই প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছে।

হংকংয়ে পুরো পরিবার সঙ্গে নিয়ে প্রতিবাদ কর্মসূচিতে যোগ দেওয়া হেরা পুন বলেন, ‘আমি মনে করি এটা এখন পর্যন্ত প্রস্তাবিত সবচেয়ে বাজে আইন। আমরা সবাই বুঝতে পারছি, হংকংয়ের বিচার ব্যবস্থায় নাড়া দিচ্ছে চীন।’

পুন মনে করেন, চীন সরকার কারও ওপর অসন্তুষ্ট হলেই তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করে, যা সুষ্ঠু বিচার ব্যবস্থার বহিঃপ্রকাশ নয়। রবিবারের বিক্ষোভে অংশ নেওয়া আরও অনেকে তার মতো একই মনোভাব প্রকাশ করেছেন।

ক্রিস্টোফার নামের এক প্রতিবাদকারী বলেন, ‘আমি তিন সন্তানের পিতা এবং আমিও প্রস্তাবিত আইনের বিরুদ্ধে আমার মতামত জানাতে চাই। আমি মনে করি নতুন এই আইন হংকংয়ের মৌলিক স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপের শামিল।’
বিক্ষোভ ঘিরে কড়া নজরদারি পুলিশের

হংকং সরকার অবশ্য আইনটি নিয়ে জনগণের উদ্বেগের কথা বিবেচনায় এনে কোন কোন ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে বন্দি বহিঃসমর্পণ করা যাবে, তা কমিয়ে আনার কথা বলছে। তবে প্রতিবাদকারীরা সরকারের এমন কথায় সন্তুষ্ট নয়। বরং অতীতে এ ধরনের প্রতিবাদে কাজ হওয়ায় এবারও আইনটি বাতিল হবে বলে আশাবাদী তারা।

এদিকে অব্যাহত গণবিক্ষোভের মুখে সরকারি ভবনগুলোতে যাওয়ার রাস্তায় গাড়ি চালানো থেকে বিরত থাকতে কর্মীদের নির্দেশ দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। কেননা এসব সড়ক ইতোমধ্যে অবরোধ করে রাখা হয়েছে। ব্যবসায়ী নেতারা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, প্রস্তাবিত বিলটি আইনে পরিণত হলে হংকংয়ের প্রতি আস্থা হারাবেন বিনিয়োগকারীরা। সূত্র: রয়টার্স।

আজ সারাবেলা/সংবাদ/সিআ/আন্তর্জাতিক

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.