দেশের সম্পদ বিক্রির রাজনীতি করি না: শেখ হাসিনা

সারাবেলা রিপোর্ট: গ্যাসের দাম বৃদ্ধির যৌক্তিকতা তুলে ধরে সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আমাদের খরচ পড়ছে প্রতি ঘণমিটার ৬১ দশমিক ১২ টাকা। আর ধরছি মাত্র প্রতি ঘণমিটার ৯ দশমিক ৮০ টাকা। আমি যখন ২০০০-০১ সালে প্রধানমন্ত্রী ছিলাম আমার ওপর প্রচণ্ড চাপ আসল যে, আমাদের গ্যাস রফতানি করতে হবে। এরপর জিমি কার্টার ঢাকায় আসলে সেখানেও বলেছিলাম, রাজনীতি করি দেশের জন্য দেশের মানুষের জন্য। দেশের সম্পদ বিক্রি করে মুচলেকা দিয়ে ক্ষমতায় আসতে হবে, এই রাজনীতি করি না।

বৃহস্পতিবার (১১ ‍জুলাই) রাতে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে একাদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের সমাপনী বক্তৃতায় শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, গ্যাসের চাহিদা মেটানোর জন্য আমরা এলএনজি আমদানি করছি। দেশে শিল্পায়ন হচ্ছে, শিল্পায়নের সাথে সাথে চাহিদা বাড়ছে। কিন্তু সেই পরিমাণ গ্যাস আমাদের দেশে নাই। আমরা কুপ খনন করছি। গ্যাসের জন্য পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হচ্ছে, যেটুকু পাওয়া যাচ্ছে, সেটুকু উত্তোলন করা হচ্ছে। বিশাল সমুদ্রসীমা অর্জন করেছি। সেখানেও গ্যাস উত্তলনের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছি।

সংসদ নেতা বলেন, গ্যাসের দাম নিয়ে যে কথাগুলো আসছে যে, দাম না বাড়িয়েও উন্নয়ন করা যাবে। দাম বাড়ানোর প্রয়োজনটা কেন ছিল? গ্যাসের বর্ধিত ব্যয় নির্বাহের জন্য পেট্রোবাংলা বিভিন্ন কোম্পানিসহ ১০২ শতাংশ দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছিল। এলএনজি আমদানি খুব ব্যয় সাপেক্ষ। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন মূল্যায়ন করে দেখেছে- বর্ধিত ব্যয় নির্বাহের জন্য কমপক্ষে ৭৫ শতাংশ দাম বৃদ্ধি করার প্রয়োজন ছিল। সেখানে আমরা কতটুক দাম বৃদ্ধি করেছি? গ্রাহকদের আর্থিক চাপের বিষয়টা বিবেচনা করে কমিশন মাত্র ৩২ দশমিক ৮ শতাংশ দাম বৃদ্ধি করেছে।

‘ভোক্তা পর্যায়ে প্রাকৃতিক গ্যাসের মূল্য হার বর্তমানে প্রতি ঘণমিটার ৯ দশমিক ৮০ টাকা। ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প গ্রাহকদের জন্য কোন দাম বৃদ্ধি করা হয়নি। গণপরিবহনের বিষয়টি বিবেচনায় করে সিএনজি খাতে শুধু প্রতি ঘণমিটারে তিন টাকা বৃদ্ধি করা হয়েছে। বিভিন্ন শ্রেণীর গ্রাহকদের অভিযোগের ভিত্তিতে এখন থেকে ন্যূনতম চার্জ প্রত্যাহার করা হয়েছে। এছাড়া সব শিল্প গ্রাহকদের ইবিসি মিটার দেওয়া হবে। যাতে কে কত গ্যাস ব্যবহার করে সেটা জেন নির্দিষ্ট থাকে, যাতে বিল পরিশোধ সহজ হয়।’

গ্যাসের ভর্তুকি তুলে ধরে তিনি বলেন, গ্রাহকদের আর্থিক চাপ যেন বেশি না পরে সেজন্য সরকার থেকে প্রতি বছর ৭ হাজার ৯৯০ কোটি টাকা আর্থিক সহায়তা বা ভর্তুকি দেওয়া হবে। তাছাড়া জ্বালানি নিরাপত্তা তহবিল থেকে ২ হাজার ৪২০ কোটি টাকা প্রদান করা হবে। আমরা পাইপ লাইন তৈরি করছি, গ্যাস সংরক্ষণ করতে হচ্ছে। পাইপ লাইনের মাধ্যমে সরবরাহ করছি, এরও একটা খরচ আছে। আমরা যদি খরচটা ধরি তাতে সম্পূরক শুল্কসহ এলএনজি আমদানির খরচ পড়ে প্রতি ঘণমিটার এলএনজি সরবরাহ ব্যয় ৬১ দশমিক ১২ টাকা। এলএনজি কনসেটেড গ্যাস। আমাদের দেশীয় গ্যাস মিশিয়ে তারপর সরবরাহ করা যায়। আমরা দাম ধরছি খুব কম। আসলে এর দাম পড়ে প্রতি ঘণমিটার ৬১ দশমিকি ১২ টাকা। আমরা নিচ্ছি মাত্র ৯ দশমিক ৮০। অর্থাৎ ৫১ দশমিক ৩২ টাকা সরকার সহায়তা দিচ্ছে।

সংসদ নেতা বলেন, অনেকেই প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদ করেছেন, সমালোচনা করছেন। আমাদের দেশে নিজস্ব কিছু প্রাকৃতিক গ্যাস আছে। কিন্তু সেটা আমাদের চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। চাহিদা পূরণ হচ্ছিল না। যেখানে আমাদের চাহিদা ছিল প্রায় ৩ হাজার ৭০০ এমএমসিএফডি। কিন্তু সরবরাহ করা যাচ্ছিল মাত্র ২ হাজার ৭ এমএমসিএফডি। এই ব্যাপাক চাহিদা প্রবৃদ্ধিতে আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম- এলএনজি আমদানি করব। আমরা ২০১৮ সালের ১৮ আগস্ট ৫০০ এমএমসিএফডি এবং ৩০ এপ্রিল ২০১৯ থেকে আরও ৫০০ এমএমসিএফডি অর্থাৎ ১ হাজার এমএমসিএফডি গ্যাস আমদানি শুরু করেছি। আমাদের নিজস্ব গ্যাস সেটা উৎপাদনে খরচ হয় প্রতি ঘণমিটারে ৬০ দশমিক ৫০ টাকা। সেখানে আমদানিকৃত এলএনজির খরচ পড়ে ৩৩ দশমিক ৭৫ টাকা। প্রতি বছর ৩০ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। আমাদের প্রায় ৭৫ শতাংশ বৃদ্ধির প্রয়োজন ছিল।

তিনি বলেন, আমাদের প্রতি বছরে ১৯ হাজার ৩১০ কোটি টাকা ভর্তুকি টাকা দিতে হচ্ছে। ট্যাক্স সব বাদ দিয়েছি এখনো এই টাকা ভর্তুকি দিতে হবে। প্রকৃত পক্ষে ৩০ হাজার কোটি প্রয়োজন হবে। ইআরসি ১০২ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছিল সেটা দিলে দাম আরো বাড়াতে হত। প্রতিটি ক্ষেত্রে সহনশীলতা দেখিয়েছি। সরকারিভাবে আর্থিক সহায়তা দিচ্ছি আবার জ্বালানি নিরাপত্তা তহবিল থেকেও দেওয়া হচ্ছে। সরকার থেকে ৬৯০ কোটি টাকা আর্থিক সহায়তা দিচ্ছি আবার জ্বালানি নিরাপত্তা থেকে ২ হাজার ৪২০ কোটি টাকা দেওয়া হচ্ছে।

সরকারপ্রধান বলেন, মিশ্রত গ্যাসের মূল্য সহনীয় রাখার লক্ষ্যে প্রকৃতিক গ্যাসের উপর সম্পূরক শুল্ক ৯৪ শতাংশ প্রত্যাহার করে দেই। এজন্য সরকারের প্রায় ৯ হাজার ২০০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় বন্ধ হয়ে যায়। এই টাকা রাজস্ব আয় করতে পারেল আরও উন্নত করতে পারতাম। এলএনজি আমদানির কারণে ২০১৮-১৯ অর্থ বছরে ৩ হাজার কোটি ঘাটতি ছিল। গ্যাস খাত উন্নয়নে আমরা যখন ২০০৯ সালে দায়িত্ব গ্রহণ করি তখন গ্যাসের উৎপাদন ছিল মাত্র ১ হাজার ৫০০ এমএমসি এফডি। গত দশ বছরে আরও ১ হাজার ২৫০ এমএমসিএফডি গ্যাস পাইপ লাইনে যোগ করেছি।

তিনি বলেন, ২০০০-০১ সাল পর্যন্ত আমি তখন প্রধানমন্ত্রী, আমার ওপর প্রচণ্ড চাপ আসল যে আমাদের গ্যাস রফতানি করতে হবে। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ঢাকায় এসে আমার কাছে প্রস্তাব দিলেন। এরপর আমাকে দাওয়াত দিয়ে নিয়ে গেলেন সেখানেও প্রস্তাব করলেন যে, গ্যাস বিক্রি করব ভারতের কাছে। আমেরিকার কয়েকটা কোম্পানি আমাদের এখানে গ্যাস উত্তোলন করত, এখনো করে। আমি বলেছিলাম- আমাদের কত গ্যাস আছে সেটা আগে জানতে হবে। এটা আমার দেশের সম্পদ। দেশের মানুষের চাহিদা মিটিয়ে ভবিষ্যৎ বংশধরদের জন্য অন্তত ৫০ বছরের রিজার্ভ রেখে এর অতিরিক্ত গ্যাস যদি থাকে আমি বিক্রি করতে রাজি আছি, কিন্তু তার আগে না। এরপর তত্ত্বাবধায়ক সরকার আসল, তখন জিমি কার্টার এই ব্যাপারে কথা বলতে আসেন। যমুনায় ছিলেন। আমরা দল থেকে আমি এবং সাধারণ সম্পাদক জিল্লুর রহমান এবং বিএনপির খালেদা জিয়াসহ তাদের সাধারণ সম্পাদককে ডাকা হল।

‘রাজনীতি করি দেশের জন্য দেশের মানুষের জন্য। দেশের সম্পদ বিক্রি করে মুচলেকা দিয়ে ক্ষমতায় আসতে হবে, এই রাজনীতি করি না। সে কথা আমি সেখানেও স্পষ্টভাবে জিমি কার্টারকে বলে এসেছিলাম। আমি বলেছিলাম- আমি যা বলি তাই বলেছি। এরপর চলে আসি। খালেদা জিয়া থেকে যান, সেখানে মুচলেকাও দিয়ে আসেন। যার ফলে ২০০১ সালে ভোট পেয়েও আমরা সরকার গঠন করতে পারিনি। এটাই হল বাস্তবতা। সেটা নিয়ে আমার আপসোস নেই। আমাদের তো গ্যাস নেই, থাকলে দেব। বলা হল দেশ গ্যাসে ভাসে, আমি তো দেখি না সেটা। উন্নয়নের জন্য করছি, উন্নয়ন এনার্জি ছাড়া হয় না।

আজসারাবেলা/সংবাদ/রই/জাতীয়

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.